অদম্য শিক্ষার্থী সামিয়া আক্তার ২০২৪ সালের এসএসসিতে মানবিক বিভাগ থেকে জিপিএ-৫ পেয়েছে। সামিয়ার এই সফলতা সবাইকে চমক লাগিয়েছে দিয়েছে। সামিয়ার জিপিএ-৫ পাওয়াতে খুশি স্কুলের শিক্ষকরা। মাদারীপুর জেলার শিবচরের পাঁচ্চর বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়ের ছাত্রী সামিয়ার সফলতায় খুশি পরিবারও, তবে আছে সংশয়ও। দারিদ্রের কষাঘাতে জর্জরিত পরিবারের শঙ্কা, মেয়েকে কলেজে ভর্তি করাতে পারবেন তো?
এলাকাবাসী জানান, সামিয়া'র বাবা আব্দুল লতিফ ভূঁইয়া (৫৫) পদ্মা নদী ভাঙ্গনে ক্ষতিগ্রস্ত। প্রায় ৩০ বছর আগে মাদবরচর এলাকার পদ্মা নদী ভাঙ্গনের শিকার হন তিনি। নিজের পৈতৃক জমিজমা যতটুকু ছিল সবই গেছে নদী গর্ভে। ওই নদী ভাঙ্গনের পর আব্দুল লতিফ ভুইয়া নিঃস্ব হয়ে যান। সেখান থেকে চলে আসেন পাঁচ্চর এলাকায়। এখানে এসে বাস করেন অন্যের বাড়িতে।
সামিয়ার বাবা আব্দুল লতিফ ভূইয়া ঢাকার প্যানপ্যাসিফিক হাসপাতালের এক চিকিৎসকের বাড়ির কেয়ারটেকারের কাজ নেন । ওই চিকিৎসকের বাড়িটি দেখাশোনা করেন। অনেক কষ্ট চলে সংসার চালান। কয়েক বছর আগে অন্যের কাছ থেকে ধার করে একটি ভ্যান কেনেন তিনি। বর্তমানে সেই ভ্যানটি চালিয়ে সংসার চালান। তার স্ত্রী বর্তমানে অসুস্থ। স্ত্রী ও তার পাঁচ মেয়ে, এই নিয়ে তার সংসার। বড় দুই মেয়ের বিয়ে দিয়েছেন। তারা এখন স্বামীর বাড়ি।

ছোট তিনজন লেখাপড়া করেছে। অদম্য মেধাবী সামিয়ার বড় খাদিজা আহমেদ শিবচর সরকারি বরমগঞ্জ কলেজের দ্বিতীয় বর্ষের ছাত্রী। ছোট বোন ফারিয়া পাঁচ্চর গোয়ালকান্দা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের তৃতীয় শ্রেণীতে পড়ে।
প্রতিবেশীরা বলেন, মা রওশনারা আরা অন্যের বাড়িতে কাজ করেন। বাড়ি থেকে প্রায় তিন কিলোমিটার দূরে বাখরের কান্দি গিয়ে অন্যের বাড়ি গৃহকর্মী কাজ করেন সামিয়ার মা রওশন আরা। তিন হাজার টাকা পারিশ্রমিক পান তিনি। ভ্যানচালক বাবা ও গৃহকর্মীর মায়ের আয়েই চলে সামিয়াদের সংসার আর মেয়েদের লেখাপড়া। তাদের দুজনের কোন ছেলে সন্তান নেই। তাদের উপার্জনেই একমাত্র ভরসা।

অদম্য মেধাবী সামিয়া বলেন, আমি ছোটবেলা থেকেই বাবা-মার অভাবের মধ্য থেকেও কষ্ট করে লেখাপড়া চালিয়ে মানবিক বিভাগ থেকে জিপিএ- ৫ পেয়েছি। আমার বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক শামসুল হক স্যার ও অন্যান্য শিক্ষকদের প্রতি অনেক কৃতজ্ঞ।
সামিয়ার মা রওশন আরা বলেন, আমি এখন মাঝে মধ্যে অসুস্থ হয়ে পড়ি। তখন সামিয়াকেই সংসারের কাজ করতে হয়। অভাব অনটনের সংসার। আমার মেয়ে সামিয়া লক্ষীমেয়ে। সে চায় লেখাপড়া করে একজন পদস্থ সরকারি কর্মকর্তা হতে। কিন্তু আমি ওর লেখাপড়া কিভাবে চালাবো।
সামিয়ার বাবা আব্দুল লতিফ ভুঁইয়া বলেন, আগামীতে কোন সাহায্য সহযোগিতা না পেলে আমার পক্ষে কলেজে ভর্তি করানোর সম্ভব নয়। আমার স্ত্রী রওশন আরা অনেক অসুস্থ। আমি তার চিকিৎসাও চালাতে পারছিনা। এরপরে আবার তিন মেয়ের লেখাপড়ার খরচ বহন করা আমার পক্ষে খুবই অসম্ভব। একজন ভ্যান চালক বাবার পক্ষে তিন মেয়ের লেখাপড়া করানো খুবই কষ্টসাধ্য বলে তিনি জানান । তাই তাঁর কপালে এখন চিন্তার ভাঁজ।

সামিয়া মানবিক বিভাগ থেকে জিপিএ-৫ পেয়েছে। এতো ভাল ফলাফল করার পরও মেয়েকে মিষ্টিমুখ করাতে পারেনি বাবা, সেই দুঃখ কোথায় রাখবেন তিনি। এমনকি এত সুন্দর ফল করেও সামিয়ার চোখে মুখেও চিন্তার ভাঁজ। এত ভাল ফলাফল করেও আগামীতে কলেজে ভর্তি হতে পারবে কিনা এই নিয়ে শঙ্কা তার মধ্যেও বিরাজ করছে।
বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক সামসুল হক জানান, সামিয়া আক্তার ষষ্ঠ শ্রেণি থেকেই একজন মেধাবী শিক্ষার্থী। বিভিন্ন শ্রেণির পরীক্ষা সে মেধার পরিচয় দিয়েছে। তাই এসএসসি পরীক্ষা অংশগ্রহণ করার আগে কোন প্রাইভেট কিংবা কোচিংয়ে অতিরিক্ত টাকা দিতে হয় নাই সামিয়াকে । অদম্য মেধাবী সামিয়ার বাবা আব্দুল লতিফ ভূঁইয়া মাদবর চর এলাকার প্রকৃত বাসিন্দা। সে পদ্মা নদী ভাঙ্গনে ক্ষতিগ্রস্ত।
