একটুখানি খাবারের আকুতি নিয়ে স্ত্রীকে জড়িয়ে ধরে কাঁদছিলেন ৮০ বছরের বৃদ্ধ সাজু শেখ। বয়স আর দারিদ্র্যের ভারে কুপোকাত শরীর, অথচ চোখের সামনে শয্যাশায়ী স্ত্রীর চিকিৎসা তো দূরের কথা, দুবেলা দুটো অন্ন তুলে দেওয়ার সামর্থ্যও ছিলো না। কোলে অসুস্থ স্ত্রী আর চোখে জল নিয়ে সাজু শেখের সেই আর্তনাদের ভিডিও সম্প্রতি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়লে নাড়া দেয় হাজারো মানুষের হৃদয়। অবশেষে জীবনের শেষ অপরাহ্নে এসে মানবিক আশ্রয়ের সন্ধান পেলেন শেরপুরের এই প্রবীণ দম্পতি।
শেরপুর সদর উপজেলার খুনুয়া চরপাড়া গ্রামের বাসিন্দা সাজু শেখ ও নূরজাহান বেগম। প্রায় ৬০ বছর ধরে এক ছাদের নিচে সুখ-দুঃখ ভাগ করে সংসার করছেন তারা। একসময় কাঁচামালের ব্যবসা করে ছয় সন্তানের মুখ সামলেছেন সাজু শেখ। তবে বয়সের কাছে হার মেনে আজ তিনি নিঃস্ব। তার স্ত্রী নূরজাহান এখন পুরোপুরি শয্যাশায়ী, হাঁটাচলার শক্তিটুকুও নেই। নিজে অসুস্থ হলেও স্ত্রীকে পরম মমতায় কোলে তুলে নেওয়া, খাইয়ে দেওয়া থেকে শুরু করে সব সেবা-যত্ন একাই সামলে আসছিলেন এই বৃদ্ধ।

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তাদের দুঃখ-কষ্টের ভিডিও ভাইরাল হওয়ার পর প্রথমে শেরপুর সদর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা এবং পরবর্তীতে স্থানীয় স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন, রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দ ও বিত্তবানরা তাদের সহায়তায় এগিয়ে আসেন। সদর উপজেলা বিএনপির সভাপতি হযরত আলী ও সংরক্ষিত নারী আসনের সংসদ সদস্য ডা. সানসিলা জেবরিন প্রিয়াংকার বাবা বৃদ্ধ দম্পতির বাড়ি গিয়ে খোঁজখবর নেন এবং পরম মমতায় নিজের হাতে তাদের খাবার খাইয়ে দেন।
অবশেষে সোমবার (১৪ সেপ্টেম্বর) তাদের গ্রামে গিয়ে উপস্থিত হন শেরপুরের জেলা প্রশাসক ফরিদা ইয়াসমিন। তিনি সাজু-নূরজাহান দম্পতির সার্বিক খোঁজখবর নেন এবং শুকনো খাবার ও নগদ অর্থ সহায়তা দেন। নূরজাহানের শারীরিক অবস্থা আশঙ্কাজনক দেখে রাতেই তাকে জেলা শহরের একটি হাসপাতালে ভর্তি করিয়ে চিকিৎসার ব্যবস্থা করা হয়। এ সময় জেলা প্রশাসক ঘোষণা দেন, জীবনাবসান পর্যন্ত এই দম্পতির যাবতীয় খাবারের দায়িত্ব বহন করবে জেলা প্রশাসন। একই সঙ্গে দ্রুত সময়ের মধ্যে তাদের জন্য একটি নতুন ঘর নির্মাণেরও আশ্বাস দেন তিনি।

জেলা প্রশাসক ফরিদা ইয়াসমিন বলেন, কয়েক দিন আগেও এই দম্পতির ঘরে ছিলো অভাব আর অনিশ্চয়তা। আজ তাদের জীবনে ফিরেছে নতুন আশার আলো। আমরা তাদের চিকিৎসা, খাবার ও বাসস্থানের দায়িত্ব নিয়েছি। আশা করছি, তারা জীবনের শেষ সময়টুকু শান্তিতে কাটাতে পারবেন।
অন্যদিকে, হাসপাতালে গিয়ে অসুস্থ নূরজাহানের খোঁজ নেন সংরক্ষিত নারী আসনের সংসদ সদস্য ডা. সানসিলা জেবরিন প্রিয়াংকা। তিনি নূরজাহানের চলাচলের সুবিধার্থে একটি হুইলচেয়ার ও নগদ অর্থ দেন। সেই সঙ্গে সরকারি ঘর নির্মিত হলে সেখানে বিদ্যুৎ সংযোগ, লাইট ও ফ্যানের ব্যবস্থা নিশ্চিতসহ সব ধরনের সহযোগিতা অব্যাহত রাখার প্রতিশ্রুতি দেন।

সংসদ সদস্য ডা. সানসিলা জেবরিন প্রিয়াংকা বলেন, সাজু শেখ ও নূরজাহানের এই পথচলা কেবল একটি দরিদ্র পরিবারের গল্প নয়, এটি মানবিকতার শক্তির গল্প। ষাট বছর ধরে তাদের অনন্য ভালোবাসার এই টান সমাজের জন্য শিক্ষণীয়।
দারিদ্র্য ও ব্যাধির নির্মম কষাঘাতে যখন জীবনের প্রদীপ নিভু নিভু অবস্থা, ঠিক তখনই প্রশাসন ও সমাজের মানুষের ভালোবাসায় ঘুরে দাঁড়ানোর নতুন স্বপ্ন দেখছেন সাজু শেখ ও নূরজাহান। জীবনের শেষ প্রান্তে এসে এই অমলিন ভালোবাসা ও মানবিকতাই যেন হয়ে উঠেছে তাদের বেঁচে থাকার নতুন শক্ত খুঁটি।
