অভাবের সংসার। কনকনে ঠাণ্ডা, কি তীব্র গরম- সব পরিস্থিতিতেই ঘর-সংসারের ঘানি টানছেন রিকশাচালক ফেরদৌস মণ্ডল। অভাবের তাড়নায় করতে পারেননি পড়াশোনা। তবে স্ত্রীকে দিয়ে পূরণ করেছেন সেই স্বপ্ন। স্ত্রীও চেয়েছিলেন পড়াশোনা করে অনেক দূরে যেতে। গল্পের শুরুটা সেখান থেকেই।
বগুড়া জেলার গাবতলী উপজেলার বাগবাড়ি গ্রামের ফেরদৌস যখন বিয়ে করেন, তার স্ত্রী সিমানুর এসএসসি পরীক্ষার্থী ছিলেন। বিয়ের পর স্ত্রীকে দেয়া কথা রাখেন ফেরদৌস। রিকশায় স্ত্রীকে কলেজে পৌঁছে দিয়ে তিনি নিজে রিকশা চালিয়ে সংসারের বোঝা টেনেছেন। রিকশা চালিয়ে সিমানুরের লেখাপড়ার খরচ জুগিয়েছেন।
বগুড়া সরকারি আজিজুল হক কলেজে ইসলামের ইতিহাস ও সাংস্কৃতিক বিভাগ থেকে দ্বিতীয় বিভাগে এমএ পাস করেছেন সীমানুর। নিজে পড়াশোনা না করতে পারলেও রিকশা চালিয়ে সংসারে খরচ মিটিয়ে স্ত্রীকে উচ্চশিক্ষিত করার স্বপ্ন পূরণ করতে গিয়ে অনেক চড়াই উৎরাই পাড়ি দিতে হয় ফেরদৌসকে।
শুরু হয় অন্য সংগ্রাম। ঘাড়ে চড়ে আছে ঋণের বোঝা। স্ত্রী দর্জির কাজ করে কিছুটা সাহায্য করলেও তাতে কতটুকুই বা চলে সংসার? শুরু হয় স্ত্রী সীমানুরের জন্য চাকরি খোঁজার কঠিন চেষ্টা। তাদের এই সংগ্রামের গল্প উঠে এসেছে গণমাধ্যমে। আর তাতেই দৃষ্টি পড়ে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার।
ভাগ্য বদলে যায় প্রত্যন্ত গ্রামের দরিদ্র পরিবারটির। প্রধানমন্ত্রী সুপারিশে রিকশাচালক ফেরদৌসের স্ত্রী এখন বগুড়ার অন্যতম শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান কালেক্টরেট স্কুল অ্যান্ড কলেজের প্রাথমিক শাখার সহকারী শিক্ষক। বগুড়া জেলা প্রশাসক সোমবার তার হাতে তুলে দেন চাকরির নিয়োগপত্র।
চাকরির সঙ্গে মিলেছে সীমানুরের স্বামী রিকশাচালক ফেরদৌসের রিকশা কেনার ঋণ পরিশোধের ২৫ হাজার টাকা, বাড়ি সংস্কারের টিন ও আউটসোর্সিংয়ের মাধ্যমে রিকশাচালকের উচ্চশিক্ষিত স্ত্রী যেন শক্তিশালী আর্থিক ভিত্তিতে পৌঁছাতে পারেন, সে জন্য একটি ল্যাপটপ।
এরিমধ্যে চাকরি যোগ দেয়া সীমানুরের কাছে এখন পুরো বিষয়টিই স্বপ্নের মতো। প্রধানমন্ত্রীর নজরে পাল্টে গেলো জীবন। তবে ভুলে যাননি স্বামীর কষ্টের কথা। তার ভাষায়, ক্লাস শেষ হওয়া পর্যন্ত অপেক্ষা করে সঙ্গে করে নিয়ে বাসায় ফিরতেন ফেরদৌস। স্বামী তার জন্য যা করেছেন এমন ঘটনা বিরল।

ফেরদৌস জানান, স্ত্রীকে উচ্চশিক্ষায় শিক্ষিত করতে পণ করেছিলেন তিনি। রিকশা চালিয়ে সংসারের খরচ জুগিয়ে স্ত্রীকে উচ্চশিক্ষিত করেছেন। এমএ পাস স্ত্রীর চাকরির জন্য ধরনা দিয়েছেন অনেকের কাছে। শেষে প্রধানমন্ত্রী, তার মতো গাঁও গ্রামের মানুষের পাশে দাঁড়িয়েছেন, এটা তার জীবনের সবচেয়ে আনন্দের।
বগুড়া জেলা প্রশাসক সাইফুল ইসলাম বলেন, প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা এই দম্পতিকে অনুপ্রেরণা দিয়েছেন, তাদের পাশে থাকার জন্য আমাদের নির্দেশনা দিয়েছেন। প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশনায় এই পরিবারসহ এমন আরও যারা সামনে এগিয়ে যেতে চায়, তাদের পাশে প্রশাসন সব সময় রয়েছে বলেও জানান তিনি।
