অদম্য মেধা, কঠোর পরিশ্রম আর অভাবের সঙ্গে নিরন্তর লড়াই করে ২০২৬ সালের এসএসসি পরীক্ষায় জিপিএ-৫ পেয়েছে ফারজানা আক্তার। ইচ্ছে ছিল ভবিষ্যতে চিকিৎসক হয়ে দেশের মানুষের সেবা করার। কিন্তু দারিদ্র্যের কঠিন বাস্তবতায় অকালেই থমকে যেতে বসেছে এই মেধাবী ছাত্রীর চিকিৎসক হওয়ার স্বপ্ন। পটুয়াখালীর গলাচিপা উপজেলার আমখোলা ইউনিয়নের রামানন্দ গ্রামের দিনমজুর মজিবুর রহমানের কনিষ্ঠ মেয়ে ফারজানা এবার পশ্চিম তাফালবাড়িয়া মাধ্যমিক বিদ্যালয় থেকে এই উজ্জ্বল সাফল্য অর্জন করেছে।
চার সদস্যের পরিবারে ফারজানার বাবা মজিবুর রহমানই একমাত্র উপার্জনক্ষম ব্যক্তি। দিনমজুরি করে যা আয় হয়, তা দিয়ে নুন আনতে পান্তা ফুরায় দশা। ফারজানার একমাত্র ভাই শারীরিকভাবে প্রতিবন্ধী, আর বড় বোনও এইচএসসিতে ভালো ফলাফল করার পর কেবল টাকার অভাবে পড়ালেখা ছেড়ে দিতে বাধ্য হয়েছেন। ফারজানার পরিবারের আর্থিক অবস্থা এতটাই করুণ যে, কলেজ পর্যায়ের উচ্চশিক্ষার খরচ চালানো তাদের পক্ষে একপ্রকার অসম্ভব।
পটুয়াখালীর দুর্গম এলাকায় পর্যাপ্ত সুযোগ-সুবিধার অভাব থাকা সত্ত্বেও ফারজানা কোনো দিন কোচিং কিংবা প্রাইভেটের মুখ দেখেনি। ঝড়-বৃষ্টি ও ক্ষুধার যন্ত্রণা উপেক্ষা করে নিয়মিত স্কুলে যাওয়া এবং শিক্ষকদের আন্তরিক সহযোগিতাকে সম্বল করেই অর্জিত হয়েছে তার এই সাফল্য।

ফারজানার এই অসাধারণ সাফল্যে আবেগাপ্লুত তার বিদ্যালয়ের শিক্ষকেরা। ৩০ বছরের অভিজ্ঞতা টেনে বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক মো. মজিবুর রহমান বলেন, আমার শিক্ষকতা জীবনে এত পরিশ্রমী ও মেধাবী শিক্ষার্থী খুব কমই দেখেছি। স্কুলের বাইরে কোনো প্রাইভেট না পড়েও শুধু নিজের চেষ্টায় সে এই ফল করেছে। ফারজানার বড় ভাই-বোনের শিক্ষাজীবন অর্থের অভাবে থমকে গেছে। আমরা চাই না ফারজানার ক্ষেত্রেও সেই করুণ পুনরাবৃত্তি ঘটুক।
একই কথা ব্যক্ত করেন বিদ্যালয়ের সিনিয়র সহকারী শিক্ষক মো. জাহাঙ্গীর হোসেন। তিনি জানান, ফারজানাকে কোনো পড়া একবার বুঝিয়ে দিলেই সে তা আয়ত্ত করে ফেলত। সরকারি বা বেসরকারি কোনো সহযোগিতা পেলে মেয়েটি ভবিষ্যতে দেশের এক আদর্শ নাগরিক হয়ে উঠবে।
নিজের ভবিষ্যৎ ও অধরা স্বপ্নের কথা বলতে গিয়ে কান্না ধরে রাখতে পারেনি ফারজানা আক্তার। ছলছল চোখে সে বলে, ছোটবেলা থেকেই আমার স্বপ্ন আমি ডাক্তার হব। কখনো খেয়ে, আবার কখনো না খেয়ে স্কুলে গেছি। আজ জিপিএ-৫ পেয়েছি ঠিকই, কিন্তু টাকার অভাবে আমার পড়াশোনা বন্ধ হওয়ার উপক্রম হয়েছে। সমাজের বিত্তবানরা এগিয়ে না এলে হয়তো আমার ডাক্তার হওয়ার স্বপ্ন স্বপ্নই থেকে যাবে।
ফারজানার অসহায় বাবা মজিবুর রহমান আক্ষেপ করে বলেন, মেয়েটা এত ভালো ফল করল, অথচ টাকার অভাবে পড়ালেখা বন্ধ হয়ে যাবে, একজন বাবার জন্য এর চেয়ে কষ্টের আর কী হতে পারে?
অভাবের কাছে যেন ফারজানার মতো এক অদম্য মেধাবীর স্বপ্ন হেরে না যায়, সেজন্য সরকার, স্থানীয় প্রশাসন এবং সমাজের সহৃদয় বিত্তবান মানুষের আশু হস্তক্ষেপ ও সহযোগিতার হাত বাড়িয়ে দেওয়ার বিনীত আকুতি জানিয়েছেন ফারজানার পরিবার ও স্থানীয় এলাকাবাসী।
মাকে ধর্ষণের পর হত্যা, কোলের শিশুকে ফেলা হয় নদীতে