পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় বৃহস্পতিবার অসুস্থ সংগীতকার কবীর সুমনকে দেখতে হাসপাতালে গিয়েছিলেন। মমতাকে পেয়ে সুমনের দুই আবদার। প্রথম আবদার, চকলেট খাবেন। আর দ্বিতীয়, বাড়ি ফিরতে চান। তবে মমতা সুমনকে আরও ১০দিন হাসপাতালে থাকতে বলেছেন।
আনন্দবাজার পত্রিকা জানিয়েছে, বৃহস্পতিবার বিকেলে মেডিকেল কলেজে যান তৃণমূলের সাবেক এমপি সুমনকে দেখতে যান দলীয় প্রধান মমতা। মিনিট দশেক ছিলেন সেখানে।
সুমনের সঙ্গে দেখা করে বেরিয়ে আসার সময় সাংবাদিকরা মুখ্যমন্ত্রীর কাছে জানতে চান, কেমন আছেন ‘গানওয়ালা’।
মমতা বলেন, আগের চেয়ে ভালো আছেন। কথা বলেছেন। বাড়ি যাব, বাড়ি যাব করছেন। কিন্তু আমি বলেছি, এখন বাড়ি যাওয়া যাবে না। এক বার এমন হয়েছে। আবার যখন-তখন এমন হতে পারে। তাই আমি বললাম, এখনও ১০ দিন থাকতে হবে। সুস্থ হয়ে ফিরবেন।’
মুখ্যমন্ত্রী মমতা জানা, সুমন যেহেতু এখন কথা বলতে পারছেন, তাই অন্য গল্পও হয়েছে। বাংলা খেয়াল নিয়ে কথা বলেছেন সুমন।
মমতা বলেন, ‘সুমনের সঙ্গে যেখানেই দেখা হোক, গান নিয়ে কথা হয়। আজও হয়েছে। খেয়াল নিয়ে কথা হল। ও আমাকে দেখে ‘জয় বাংলা’ বলল, আমিও বললাম।
মুখ্যমন্ত্রীকে সামনে পেয়ে কবীর সুমন তার কাছে চকোলেট খাওয়ার আবদার করেন। যাওয়ার সময় মুখ্যমন্ত্রী সুমনের সেই আবদার পূরণও করেছেন। তবে গায়কের যেহেতু ডায়াবেটিস আছে, তাই চিকিৎসকেরা চকোলেটটা বাদ দিয়ে বিস্কুটের অংশটা খাওয়ার অনুমতি দিয়েছেন।
হাসপাতাল সূত্রের বরাত দিয়ে আনন্তবাজার জানিয়েছে, আগের চেয়ে সুমনের শারীরিক অবস্থার উন্নতি হয়েছে। অক্সিজেন নির্ভরতাও কমেছে। সারাক্ষণ অক্সিজেন সাপোর্টের দরকার পড়ছে না। চিকিৎসকেরা জানিয়েছেন, প্রয়োজন হলে তবেই অক্সিজেন দেওয়া হবে। যদিও গায়কের ফুসফুস এবং হার্টের সমস্যা রয়েছে। তবে সেই সংক্রান্ত উপসর্গগুলি এখন আর ততটা সক্রিয় নয়। উঠে বসতে পারছেন। মাঝেমাঝে হাঁটাচলাও করছেন তিনি।
তবে হাসপাতাল থেকে কবে ছাড়া পাবেন, সে বিষয়ে এখনও নিশ্চিত করে কিছু জানা যায়নি। যেহেতু, হাসপাতালে থাকলে আরও অনেক সংক্রমণে আক্রান্ত হওয়ার আশঙ্কা থাকে, সে কারণে গায়ককে বাড়ি পাঠানো যায় কি না, তা নিয়েও ভাবনাচিন্তা করছেন চিকিৎসকেরা। তবে পুরোটাই নির্ভর করছে সুমনের শারীরিক অবস্থার উপর। তিনি শারীরিক ভাবে কেমন থাকেন, সেটা বিশ্লেষণ করেই বাকি সিদ্ধান্ত নেবে মেডিক্যাল বোর্ড।
সোমবার শ্বাসকষ্ট নিয়ে হাসপাতালে ভর্তি হন বাংলা আধুনিক গানকে নতুন এক দিশা দেখানো ৭৫ বছর বয়সী কবীর সুমন।
এখন নতুন গানের অ্যালবাম বের না করলেও বাংলা খেয়াল গান নিয়ে মেতে আছেন। যাকে শিল্পী নিজেই বলেছেন তার জীবনের ‘শ্রেষ্ঠ কাজ’। সাড়া জাগানো অ্যালবাম ‘তোমাকে চাই’ ছাড়াও, ‘বসে আঁকো’, ‘ইচ্ছে হল’, ‘গানওয়ালা’, ‘ঘুমাও বাউন্ডুলে, ‘চাইছি তোমার বন্ধুতা’, ‘জাতিস্মর’, ‘পাগলা সানাই’, ‘যাব অচেনায়’, ‘নাগরিক কবিয়াল’, ‘আদাব’সহ আরও কিছু অ্যালবাম সুমন প্রকাশ করেছেন গত তিন দশক ধরে।
শৈশবে বাবা সুধীন্দ্রনাথ চট্টোপাধ্যায় এবং মা উমা চট্টোপাধ্যায়ের কাছে সংগীতের হাতেখড়ি সুমনের। খেয়ালের তালিম নেন সংগীত শিক্ষক কালীপদ দাসের কাছে। শাস্ত্রীয় সংগীতের তালিম নেওয়া সুমন একসময়ে রবীন্দ্রসংগীত ও আধুনিক বাংলা গান গাইতেন রেডিওতে। যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ে ইংরেজি সাহিত্যে পড়ালেখা করা এই শিল্পী জীবনের শুরুর দিকে কাজ করেন অল ইন্ডিয়া রেডিওতে এবং পরে ভয়েস অব আমেরিকা এবং ডয়চে ভেলেতে।
গানের অ্যালবাম ছাড়াও সুমন বেশি পরিচিত হন তার কনসার্টগুলোয়। গিটার, পিয়ানো, মাউথঅর্গান বাজিয়ে গান গাওয়ার ফাঁকে ফাঁকে দর্শকদের সঙ্গে কথোপকথনে সুমনের জুড়ি মেলা ভার।
সুমন চলচ্চিত্রে সংগীত পরিচালনাও। কলকাতার নির্মাতা সৃজিত মুখার্জির পরিচালনায় ‘জাতিস্মর’ সিনেমায় সংগীত পরিচালনার জন্য সুমন পান জাতীয় পুরস্কার।
একসময় স্থানীয় রাজনীতিতে সক্রিয় হয়েছিলেন তিনি। নন্দীগ্রাম আর সিঙ্গুর আন্দোলনে দাঁড়িয়েছিলেন পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দোপাধ্যায়ের পাশে। তারপর যাদবপুর কেন্দ্র থেকে তৃণমূলের টিকিটে এমপি হন। কিন্তু বনিবনা না হওয়ায় পরে তৃণমূল ছাড়েন সুমন। পরে সেই দূরত্ব কমেও যায়। নিজেকে মমতার সমর্থক হিসেবে পরিচয় দেন তিনি।
গত বছরের নভেম্বরে সর্বশেষ ঢাকায় আসেন কবীর সুমন। তখন চার দিনের বাংলা খেয়াল কর্মশালার জন্য ঢাকায় আসেন তিনি।
এর আগে ২০২২ সালের অক্টোবরে ঢাকায় এসেছিলেন তিনি। তার প্রথম আধুনিক গানের অ্যালবাম ‘তোমাকে চাই’ প্রকাশ হয় ১৯৯২ সালে। বাংলা গানের গতিপথ বদলে দেওয়া এ অ্যালবাম প্রকাশের ৩০ বছর পূর্ণ হয় ২০২২ সালে। এ উপলক্ষে ঢাকায় ‘তোমাকে চাই-এর ৩০ বছর উদ্যাপন’ শিরোনামে গানের অনুষ্ঠানে অংশ নেন এই সংগীতকার। বাংলা খেয়াল নিয়ে আলাদা একটি অনুষ্ঠানও করেন তিনি।
ওই অনুষ্ঠানে নিজের অসুস্থতার কথা জানিয়ে কবীর সুমন বলেছিলেন, ‘আমার একটা অসুখ হয়েছে, এই অসুখের কারণে আমি যেমন হাতে লিখতে পারি না, তেমনই গিটারও বাজাতে পারি না। আর কোনো দিন পারবো না। একটানা বসে থাকলেও সমস্যা হয়। মাঝে মাঝে মনে হয় শুয়ে শুয়ে গান গাই! তবে এ জন্য আমার আলাদা কোনো দুঃখ নেই। গুরুদের কৃপায় আমি এখনো একটু একটু গান গাইতে পারি, এটাই আনন্দ।’
১৯৯৬ সালে মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘর তৈরিতে তহবিল সংগ্রহের জন্য আয়োজিত কনসার্টে প্রথম ঢাকায় আসেন সুমন। এরপর বিভিন্ন সময়ে ঢাকায় এসে অনুষ্ঠান করে গেছেন এই শিল্পী।
