ডিজিটাল ক্যামেরার একটা মাত্র ক্লিকেই এখন বন্দি হয়ে যায় হাজারো দৃশ্য। মেমোরি কার্ডের ছোট্ট একটা চিপে জমা থাকে আস্ত সিনেমা। কিন্তু এইতো সেদিনও এমন ছিেলা না। সিনেমার সেট মানেই ছিেরা যেন এক কুরুক্ষেত্রের ময়দান! বিশাল আকৃতির অ্যানালগ ক্যামেরা, চড়া আলোর লাইট আর মাইলের পর মাইল সেলুলয়েড ফিতা। সেই ফিতার বুকেই জীবন্ত হয়ে উঠত রূপালি পর্দার সব জাদুকরী গল্প।

সময় বদলেছে, অ্যানালগ যুগ পেরিয়ে সিনেমা এখন পুরোপুরি ডিজিটাল। তবে কলকাতার ‘সত্যজিৎ রায় ফিল্ম অ্যান্ড টেলিভিশন ইনস্টিটিউট’ -এর প্রাঙ্গণে পা রাখলে মনে হবে, বদলে যাওয়া সময়টা যেন হঠাৎ থমকে দাঁড়িয়েছে। ২০২৪ সালের মার্চ মাসে ভারত সরকারের তথ্য ও সম্প্রচার মন্ত্রণালয়ের উদ্যোগে সেখানে গড়ে তোলা হয়েছে এক অনন্য সংগ্রহশালা— ‘প্রমোদ পাটি সিনেমা আর্ট অ্যান্ড টেকনোলজি মিউজিয়াম’। উদ্বোধনের পর থেকেই এটি চলচ্চিত্রপ্রেমী ও গবেষকদের জন্য এক পরম তীর্থভূমিতে পরিণত হয়েছে।
এই জাদুঘরটির নামকরণ করা হয়েছে ভারতীয় অ্যানিমেশন এবং পরীক্ষামূলক চলচ্চিত্রের মহানায়ক প্রমোদ পাটির স্মরণে। ১৯৬০ ও ৭০-এর দশকে ভারতের ফিল্মস ডিভিশনের প্রধান থাকাকালীন তিনি প্রামাণ্যচিত্র এবং পরীক্ষামূলক অ্যানিমেশনের মাধ্যমে ভারতীয় ভিজ্যুয়াল স্টোরিটেলিংয়ে এক বৈপ্লবিক ও যুগান্তকারী পরিবর্তন এনেছিলেন। চলচ্চিত্র নির্মাণকে একটি বিকাশমান শিল্প হিসেবে দেখা এবং অ্যানালগ যুগের যন্ত্রপাতি সংরক্ষণের দূরদর্শী ভাবনাটি প্রথম তারই ছিলো। তার সেই স্বপ্নকে সম্মান জানাতেই এই উদ্যোগ।

মিউজিয়ামের ভেতরে সিনেমার জাদুকরী টাইম মেশিন
জাদুঘরের ভেতরে পা রাখলেই মনে হবে আপনি সিনেমার কোনো জাদুকরী টাইম মেশিনে চড়ে বসেছেন। চারপাশের চকচকে লেন্সগুলো যেন হাতছানি দিয়ে বলছে, ‘আয়, অতীতের পানে তাকাই...।’ পরতে পরতে সাজানো রয়েছে ইতিহাস আর নস্টালজিয়া।

ভিন্টেজ সরঞ্জামের সমাহার
এখানে সাজানো রয়েছে অ্যানালগ যুগের দুর্লভ সব ক্যামেরা, আদিম লেন্স, বিশাল আকৃতির প্রজেক্টর এবং সাউন্ড রেকর্ডিং ডিভাইস। এর কোনোটিতে হয়তো সত্যজিৎ রায় বুনেছেন তার কালজয়ী ‘পথের পাঁচালী’, কোনোটিতে মৃণাল সেন হয়ে উঠেছেন ‘পদাতিক’। আবার এই ক্যামেরাগুলোর কোনো একটির সাহায্যেই হয়তো রমেশ সিপ্পি তৈরি করেছিলেন ভারতীয় সিনেমার অন্যতম ব্লকব্লাস্টার অ্যাকশন থ্রিলার ‘শোলে’।

দুর্লভ স্মারক ও পোস্টার
ভারতীয় সিনেমার স্বর্ণযুগের বিভিন্ন ঐতিহাসিক নথিপত্র, দুর্লভ আলোকচিত্র, সিনেমার পোস্টার এবং কিংবদন্তি পরিচালকদের হাতে লেখা মূল চিত্রনাট্যের কপি এখানে যত্ন সহকারে সংরক্ষিত রয়েছে।
ইন্টারেক্টিভ গ্যালারি ও স্ক্রিনিং
দর্শকদের জন্য রয়েছে আধুনিক ও ইন্টারেক্টিভ প্রদর্শনী ব্যবস্থা। যেখানে বিশেষ স্ক্রিনিংয়ের মাধ্যমে প্রমোদ পাটির তৈরি করা বিখ্যাত সব শর্ট ফিল্ম ও অ্যানিমেশন ডিজিটাল মাধ্যমে দেখার সুযোগ মেলে।

শুধু জাদুঘর নয়, একটি জীবন্ত গবেষণাগার
চলচ্চিত্র শিল্পের শিক্ষার্থী এবং গবেষকদের জন্য এই মিউজিয়াম এক অপার সম্ভাবনার দুয়ার। এক লহমায় এখানে জানা যায়, কেমন করে সীমিত প্রযুক্তির যুগেও ক্যামেরার পেছনের কারিগরেরা চমৎকার সব মাস্টারপিস তৈরি করেছিলেন।
এসআরএফটিআই-এর সিনেমাটোগ্রাফি বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক ইন্দ্রনীল মুখার্জী বলেন, এই মিউজিয়ামটি কেবল প্রাচীন জিনিসপত্র সাজিয়ে রাখার জায়গা নয়। এটি চলচ্চিত্র শিল্পের শিক্ষার্থী ও গবেষকদের জন্য একটি জীবন্ত শিক্ষাকেন্দ্র। সিনেমার বিবর্তনের ইতিহাস বুঝতে এটি দারুণ সাহায্য করবে।
সিনেমার ইতিহাসকে তরুণ প্রজন্মের কাছে জনপ্রিয় করতে এখানে নিয়মিত বিভিন্ন ওয়ার্কশপ ও সেমিনারের আয়োজনও করা হয়।
এক নজরে পরিদর্শনের তথ্য
- ঠিকানা: সত্যজিৎ রায় ফিল্ম অ্যান্ড টেলিভিশন ইনস্টিটিউট (SRFTI), ই. এম. বাইপাস, পঞ্চসায়র, কলকাতা, পশ্চিমবঙ্গ।
- সময়সূচী: সোমবার থেকে শুক্রবার, সকাল ৯:৩০ থেকে বিকেল ৫:০০ টা পর্যন্ত (শনিবার ও রবিবার সাপ্তাহিক বন্ধ)।
- প্রবেশাধিকারের নিয়ম: যেহেতু মিউজিয়ামটি একটি জাতীয় উচ্চতর শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের ভেতরে অবস্থিত, তাই সাধারণ দর্শনার্থী, গবেষক বা অন্য কোনো প্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থীদের পরিদর্শনের জন্য আগে থেকেই কর্তৃপক্ষের পূর্ব অনুমতি নিতে হয়।

সিনেমা তো শুধু বিনোদন নয়, সিনেমা হচ্ছে একটি বিশাল বিজ্ঞান এবং আমাদের সংস্কৃতির দর্পণ। সেই সংস্কৃতির ভবিষ্যতের ভিত শক্ত করতে অতীতের পথটা জানা বড্ড প্রয়োজন। সেলুলয়েডের এই নস্টালজিয়া আপনাকে নিমেষেই ফিরিয়ে নিয়ে যাবে অতীতে— চাইলে আপনিও গিয়ে ছুঁয়ে দেখতে পারেন সিনেমার সেই রূপালী ইতিহাসকে!
