ভারতে প্রতি বছর দুই হাজারের বেশি চলচ্চিত্র নির্মাণ করা হয়। এরই মধ্যে দেশটি তার চলচ্চিত্র ইতিহাসের শত বছর পার করেছে। কিন্তু ২৯ বছর ধরে ‘কান চলচ্চিত্র উৎসবে’র ‘প্রতিযোগিতা বিভাগে’ ভারতের কোনো ছবি নেই! ২৮ বছর ধরে ভারতীয় ছবি মুখ দেখে না ‘গ্র্যান্ড থিয়েটার লুমিয়ের’র, বিষয়টি হতবাক করার মতোই!
অতঃপর অচলায়তন ভাঙলো। ২৯ বছর পর কান চলচ্চিত্র উৎসবের প্রতিযোগিতা বিভাগের চক্রব্যুহ ভেদ করলো সিনেমা জগতে শত বছর পার করা ভারত।
২০২১ সালে কানে ‘ডিরেক্টর ফোর্টনাইটসে’ প্রামাণ্যচিত্র ‘দ্য নাইট অব নোয়িং নাথিং’ দিয়ে ‘গোল্ডেন আই’ জেতা পায়েল কাপাডিয়াই এবার হলেন ‘অভিমন্যু’।
২৯ বছর পর কান চলচ্চিত্র উৎসবের মূল বিভাগে তার ছবি ‘অল উই ইমাজিন এজ লাইট’ দিয়ে ঠাঁই হলো ভারতীয় কোনো চলচ্চিত্রের। প্রতিযোগিতা বিভাগে নির্বাচিত ১৮টি ছবির সঙ্গে লড়বে পায়েলের ছবিটি। উৎসবের ৭৭তম আসরের পর্দা উঠবে ১৪ মে।
২৮ বছর পর গেলো বছর কান চলচ্চিত্র উৎসবের ৭৬তম আসরে ‘প্রেস্টিজিয়াস’ থিয়েটার ‘গ্র্যান্ড থিয়েটার লুম্যিয়েরে’ প্রদর্শিত হয় ভারতের কোনো ছবি! ওই বছর উৎসবের ‘মিড নাইট স্ক্রিনিং’ সেশনে দেখানো হয় অনুরাগ কাশ্যপের সিনেমা ‘কেনেডি’।
কেন গেলো ২৮ বছর ধরে ‘গ্র্যান্ড থিয়েটার লুম্যিয়েরে’ দেখানো হয়নি ভারতীয় কোনো ছবি? এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে গিয়ে জানা গেলো, এই থিয়েটারে সেই ছবিগুলোই প্রদর্শিত হয়, যে ছবিগুলো উৎসবে ‘প্রতিযোগিতা বিভাগে’ লড়াই করে। উৎসবে ২৯ বছর ধরে যেখানে ছিল না ভারতীয় কোনো ছবি!
ফিরে দেখা
১৯৯৪ সালে সাজি কারুণের ‘সৌহামই’ উৎসবে প্রতিযোগিতা বিভাগে প্রদর্শিত শেষ ভারতীয় ছবি। ‘গ্র্যান্ড থিয়েটার লুম্যিয়েরে’ মালায়লাম ছবিটি প্রদর্শনের ২৮ বছর পর অনুরাগ কাশ্যপের সিনেমা ‘কেনেডি’ দিয়ে আবারো এই থিয়েটার দেখানো হয় ভারতীয় ছবি। এটি সম্মানের। কিন্তু প্রতিযোগিতা বিভাগে ‘ডেবিট-ক্রেডিটে'র যে খেরোখাতা, তাতে ক্রেডিটই থেকে গেলো ২৯ বছর!
২৯ বছর ধরে প্রতিযোগিতায় কেন ভারতীয় ছবি নেই?
এ নিয়ে ভারতীয় গণমাধ্যমে আলোচনাও খুব একটা ছিল না। উৎসব এলেই ভারতীয় গণমাধ্যম ব্যস্ত হয়ে পড়ে কোন অভিনেত্রী কিংবা অভিনেতা কোন পোশাকে ‘রেড কার্পেট’ মাতিয়েছে। তবে সিনেমার উৎসবে ‘সিনেমার আলাপ’ ছাপিয়ে পোশাকের রমরমা আলাপ উদ্বিগ্ন করেছিল নির্মাতা নন্দিতা দাশ থেকে অভিনেতা নওয়াজ উদ্দীন সিদ্দিককে।
‘শো বিজে’ গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠা এই উৎসবে রেড কার্পেটে হাঁটা অভিনতা-অভিনেত্রীদের কখনোই আপনি শুনবেন না সিনেমা দেখার বিষয়ে উৎসাহী। তারা ‘রেড কার্পেটে’ হাঁটেন। গ্র্যান্ড থিয়েটার লুম্যিয়েরের দরজা দিয়ে প্রবেশ করেন আর ‘ব্যাক ডোর’ দিয়ে বের হয়ে যান।
সিনেমা দেখা দূরে থাক, সিনেমা নিয়ে কোনো আলোচনাতেই তারা অংশ নেন না। তারা উৎসবে থাকেন ‘বিজ্ঞাপন দূত’ হয়ে। উৎসবে তারা কেউ অভিনেতা বা অভিনেত্রী হিসেবে আমন্ত্রণ পান না। অথচ সারা বিশ্ব থেকে অভিনেতা-অভিনেত্রীরা কানে তাদের সিনেমা নিয়েই আমন্ত্রিত হয়ে আসেন। ভারতীয় সিনে তারকাদের সঙ্গে বিশ্বের অন্য সব সিনে তারকাদের বড় একটা ফারাক এখানেই, যা ভারতীয় সিনেমার জন্য খুবই পীড়াদায়ক।

অন্যদিকে, পাম দ্য’রের লড়াইয়ে কেন ২৯ বছর ধরে ছিল না ভারতীয় ছবি? এর দুই-তিনটি কারণ হতে পারে।
প্রথমটি, কান উৎসব কর্তৃপক্ষ যে ধরণের সিনেমা প্রত্যাশা করে, সে ধরণের ফিচার ফিল্ম বলিউড হয়তো এখন তৈরি করতে পারছে না।
দ্বিতীয়ত, ‘ফ্রি বাউন্ডারি’, ‘ফ্রি আইডিয়া’ নিয়ে ছবি তৈরি এখন ভারতে কঠিন।
তৃতীয়ত, ‘উৎসবের প্রোগ্রামিং’। কানস প্রোগ্রামিংয়ের ‘এস্থেটিক’ ভারতীয় ছবি একদমই আলাদা। ওয়েস্টার্ন ছবির ‘এস্থেটিক’ এখন প্রভাব বিস্তার করছে কানে ছবির সিলেকশনে।
মানুষ আর গল্প মিলিয়ে জাপান, ইরান, সাউথ কোরিয়া যে ধরণের ছবি তৈরি করছে, তার ধারে কাছে সাউথ এশিয়া নেই।
এবারের উৎসবে জাপানি নির্মাতা হিরোকাজু কোরেইদার ‘মনস্টার’ ছবিটার কথাই ধরুণ। আসলে এশিয়ার এই বড় তিনটি দেশ বাদে এই মহাদেশের আর কারো প্রভাব দেখা যায় না বড় চলচ্চিত্র উৎসবে।
ভারতের সিনেমার কথা এলে দেখা যায়, বাই চান্স, দুই একটা ছবি জায়গা পায়। আরও খারাপ অবস্থা দক্ষিণ এশিয়ার। বাংলাদেশের পরে কানে অফিসিয়াল সিলেকশনে জায়গা পেয়েছে পাকিস্তান। গেলো বছর সায়েম সাদিকের ‘জয়ল্যান্ড’ পুরস্কারও জিতেছিল। কিন্তু তারপর ধারাবাহিকতা নেই।
এজন্য জরুরি, সাউথ এশিয়ার দেশগুলোকে এক সঙ্গে কাজ করতে হবে কান প্রোগ্রামিং এর সঙ্গে। বিশ্ব চলচ্চিত্রের ভাষাটা বুঝেই সামনে আগাতে হবে।
