ব্রাজিলের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের লড়াইয়ে অবশেষে শেষ হাসি হাসলেন দেশটির প্রবীণ বামপন্থী নেতা সাবেক প্রেসিডেন্ট লুইজ ইনাসিও লুলা দা সিলভা। সব কিছু ঠিকঠাক থাকলে আগামী জানুয়ারিতে বিশ্বের চতুর্থ বৃহত্তম গণতান্ত্রিক দেশ ব্রাজিলের রাষ্ট্রপ্রধানের দায়িত্ব নেবেন লুলা।
ক্ষমতাসীন প্রেসিডেন্ট জায়ের বলসোনারোকে অল্প ব্যবধানে পরাজিত করে ৭৭ বছর বয়সী লুলা আবার ক্ষমতায় ফিরে চমক দেখালেন। লুলা পেয়েছেন ৫০ দশমিক ৯ শতাংশ এবং তার প্রতিদ্বন্দ্বী জায়ের পেয়েছেন ৪৯ দশমিক ১ শতাংশ ভোট।

লুলা ২০০৩ সাল থেকে ২০১১ সাল পর্যন্ত ব্রাজিলের প্রেসিডেন্ট ছিলেন। এতে ব্রাসিলিয়ার কুর্সিতে দুরন্ত প্রত্যাবর্তন হলো মাঝখানে জেলে কাটানো লুলা দা সিলভার। হলুদ ব্রাজিল আবারও ফিরলো লাল ঝাণ্ডায়। ব্রাজিল ফিরলো শ্রমিকের শাসনে।
ব্রাজিলের এই নির্বাচনের দিকে নজর ছিলো গোটা দুনিয়ার। বলসোনারোর হার ধরলে সাম্প্রতিক সময়ে তৃতীয় উগ্র দক্ষিণপন্থী শাসক গদিচ্যুত হলেন। এর আগে ইসরাইলে শাসকের আসন গিয়েছিলো বেঞ্জামিন নেতানিয়াহুর। আমেরিকান নির্বাচনে হারতে হয়েছে ডোনাল্ড ট্রাম্পকেও।

বিশ্ব রাজনীতির খোঁজ রাখা অনেক বিশ্লেষকরই লুলার জয়কে ‘মোস্ট পাওয়ারফুল কামব্যাক’ বলে অভিহিত করেছেন। ২০১০ সালে লুলা সরে গিয়েছিলেন প্রেসিডেন্ট পদ থেকে। তারপর তাঁকে দুর্নীতির অভিযোগে জেলে যেতে হয়।
বিশ্বের চতুর্থ বৃহত্তম গণতান্ত্রিক দেশ ব্রাজিলের প্রেসিডেন্ট হিসাবে আবারও দায়িত্ব নেয়ার পর লুলাকে কিছু চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করতে হবে। তাঁর সামনে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ করোনা-পরবর্তী সময়ে বিপর্যস্ত অর্থনীতির গতি ফেরানো, নিম্ন আয়ের মানুষের কষ্ট লাঘব করা।

২২ বছর কারাদণ্ড দেয় সাও পাওলোর আদালত। ব্রাজিলের সুপ্রিমকোর্টে চ্যালেঞ্জ করেন লুলা।সে দেশের শীর্ষ আদালত ১৮ মাসের মাথায় লুলাকে মুক্ত করার নির্দেশ দেয়। সেদিন জেল থেকে বেরিয়ে লুলা বলেছিলেন, ইতিহাস নতুন করে লেখা হবে। শেষ পর্যন্ত জিতলেন লুলা।
২০০৩ সালে লুলা ডি সিলভা যখন প্রথমবারের মতো ব্রাজিলের প্রেসিডেন্ট হন, তখন দেশের অর্থনীতি প্রবৃদ্ধির পথে ছিলো। এমনকি অর্থনীতিকে ভালো অবস্থানে রেখেই বিদায় নিয়েছিলেন তিনি। তাঁর উদারনীতি সমাজ ব্যবস্থাকেও প্রভাবিত করেছিলো।

বিশ্বের সবচেয়ে বড় আমদানি বাজার চীন। আর সেই বাজারের অন্যতম শীর্ষ সরবরাহকারী ব্রাজিল। আকরিক লোহা থেকে শুরু করে মুরগি—সবকিছুই ব্রাজিল থেকে চীনে রপ্তানি হয়। এ রপ্তানি লভ্যাংশের বড় অংশ সামাজিক উন্নয়ন কার্যক্রমে ব্যয় করেছিল লুলা প্রশাসন।
তাঁর আট বছরের শাসনামলে ব্রাজিলের অর্থনীতিতে ৪ দশমিক ৫ শতাংশ প্রবৃদ্ধি অর্জিত হয়েছিল। প্রায় চার কোটি মানুষ দারিদ্র্যের কশাঘাত থেকে বেরিয়ে এসেছিল। তবে লুলার ইমেজও যে একেবারে পরিচ্ছন্ন তা নয়।

ক্ষমতায় থাকাকালে তাঁর বিরুদ্ধে দুর্নীতি–অনিয়মের অভিযোগ উঠেছে। ছিল বিতর্ক–সমালোচনা। এমনকি দুর্নীতি–অনিয়মের অভিযোগে বিচার হয়েছে তাঁর। সাজা ভোগ করেছেন। তবে তাঁর আমলে দেশজুড়ে সামাজিক কর্মসূচি আজও ব্রাজিলবাসীর মনে লুলার প্রতি সম্মান ধরে রেখেছে।
উল্লেখ্য, ২০১৮ সালে নির্বাচনে জয়ী হয়ে প্রেসিডেন্ট হয়েছিলেন জাইর বলসোনারো। তবে অ্যামাজনে নির্বিচারে গাছ কাটা থেকে শুরু করে ইচ্ছাকৃত দাবানল সৃষ্টি, জনবিরোধী বিভিন্ন নীতিসহ একাধিক অভিযোগে ধীরে ধীরে জনপ্রিয়তা হারান কট্টরপন্থী এই প্রেসিডেন্ট।

লুইজ ইনাসিও লুলা দা সিলভা ১৯৪৫ সালের ২৭শে অক্টোবর ব্রাজিলের এক দরিদ্র পরিবারে জন্ম নেন। তিনি ব্রাজিলের শ্রমিক দলের প্রতিষ্ঠাতা সদস্যদের একজন। তিনবার প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে অংশ নিয়ে ব্যর্থ হবার পরে শেষ পর্যন্ত ২০০২ সালে তিনি জয়লাভ করেন।
প্রেসিডেন্ট থাকার সময় লুলা ব্রাজিলে ব্যাপক আকারে সমাজ সংস্কারমূলক কর্মসূচি চালু করেন। এসব কর্মসূচির লক্ষ্য ছিল দারিদ্র্য দূরীকরণ এবং ব্রাজিলের নিম্নবিত্ত শ্রমিক শ্রেণীর জীবনযাত্রার মান উন্নয়ন। এ কারণে দেশটির শ্রমজীবী মানুষদের কাছে জনপ্রিয় হয়ে ওঠেন তিনি।
আন্তর্জাতিক পর্যায়ে লুলা জলবায়ু পরিবর্তন এবং ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচিসহ বিভিন্ন আন্তর্জাতিক বিষয়ে বড় ভূমিকা পালন করেন। লুলাকে বিশ্ব পর্যায়ে বিভিন্ন জাতির মধ্যে ক্ষমতার ভারসাম্য পরিবর্তনে উচ্চাভিলাষী ব্যক্তিত্ব হিসেবে বর্ণনা করা হয়েছে।

লুলার পরে তাঁর প্রধান কর্মকর্তা দিলমা রুসেফ প্রেসিডেন্ট হন। লুলা ব্রাজিলের রাজনীতিতে এক স্থায়ী পরিবর্তন সাধন করেন। তার নীতিগুলিকে একত্রে লুলাবাদ নাম দেয়া হয়েছে। তিনি ব্রাজিলের ইতিহাসে সবচেয়ে জনপ্রিয় রাজনীতিবিদদের একজন।
ক্ষমতায় থাকাকালীন সময়ে তিনি সারা বিশ্বের অন্যতম জনপ্রিয় নেতা ছিলেন। ২০১১ সালে ৪০ বছরের ধূমপায়ী লুলার গলায় ক্যান্সার ধরা পড়ে; তবে, কেমোথেরাপি চিকিৎসা গ্রহণের পরে তিনি সুস্থ হয়ে ওঠেন।
আরও পড়ুন: রেভল্যুশনারি গার্ডকে ‘সন্ত্রাসী’ তকমা দেবে ইউরোপ
২০১৬ সালের শুরুতে তৎকালীন প্রেসিডেন্ট দিলমা রুসেফ লুলাকে তার অধীনস্থ নির্বাহী বিভাগের প্রধান কর্মকর্তা হিসেবে নিয়োগ দেন, কিন্তু সর্বোচ্চ কেন্দ্রীয় আদালতের বিচারপতি গিলমার মেন্দেস লুলার উপরে অসমাপ্ত তদন্তের প্রেক্ষিতে এই নিয়োগে বাধা দেন।
২০১৭ সালের জুলাইয়ে লুলাকে হুন্ডি ও দুর্নীতির দায়ে দোষী সাব্যস্ত করে সাজা দেয়া হয়। লুলা রায়ের বিরুদ্ধে আপিল করে ব্যর্থ হলে ২০১৮ সালের এপ্রিলে তাকে গ্রেপ্তার করা হয়। এরপর লুলা ২০১৮ সালের রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে অংশ নেবার চেষ্টা করলে আদালত দেয়।
একাত্তর/এসজে
