ইরান-ইসরাইল ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যকার চলমান যুদ্ধ চতুর্থ সপ্তাহে পদার্পণ করার সঙ্গে সঙ্গে কূটনৈতিক অঙ্গনে তৈরি হয়েছে চরম ধোঁয়াশা। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প দাবি করেছেন, যুদ্ধ থামাতে একটি চুক্তির জন্য মরিয়া হয়ে আছে ইরান। তবে, ট্রাম্পের এই দাবিকে নাকচ করে দিয়েছেন ইরানি পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাগচি। তিনি স্পষ্ট জানিয়েছেন, তেহরান মার্কিন প্রস্তাব পর্যালোচনা করলেও সরাসরি কোনো আলোচনায় বসার পরিকল্পনা তাদের নেই। এর আগে মার্কিন প্রস্তাব প্রত্যাখানের খবর দিয়েছিলো তেহরান।
বুধবার ওয়াশিংটনে এক অনুষ্ঠানে ট্রাম্প বলেন, ইরানি নেতারা চুক্তির জন্য ছটফট করছেন, কিন্তু নিজেদের জনগণের হাতে বা আমাদের হাতে মারা পড়ার ভয়ে তা প্রকাশ করতে পারছেন না। এর বিপরীতে আরাগচি এক টেলিভিশন সাক্ষাৎকারে বলেন, মধ্যস্থতাকারীদের মাধ্যমে বার্তা আদান-প্রদান কোনো আলোচনা নয়, বরং এটি শুধু নিজেদের অবস্থান জানানোর একটি প্রক্রিয়া।

যুদ্ধের মানবিক ও অর্থনৈতিক ক্ষত: গত ২৮ ফেব্রুয়ারি যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর থেকে মধ্যপ্রাচ্যসহ বিশ্বজুড়ে এক ভয়াবহ মানবিক বিপর্যয় নেমে এসেছে। হরমুজ প্রণালি কার্যত বন্ধ হয়ে যাওয়ায় বিশ্বের এক-পঞ্চমাংশ জ্বালানি সরবরাহ ব্যাহত হচ্ছে, যাকে এডনক-এর সিইও সুলতান আল জাবের অর্থনৈতিক সন্ত্রাসবাদ বলে অভিহিত করেছেন। জ্বালানি সংকটের ফলে বিমান চলাচল থেকে শুরু করে সাধারণ মুদি দোকান- সবখানেই খরচ বেড়েছে আকাশচুম্বী। বিশ্ব খাদ্য কর্মসূচি সতর্ক করেছে, যুদ্ধ জুন পর্যন্ত গড়ালে কোটি কোটি মানুষ তীব্র ক্ষুধার মুখে পড়বে।
কূটনৈতিক তৎপরতা ও প্রাণের ঝুঁকি: যুদ্ধের শুরুতেই ইসরায়েলি হামলায় ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলি খামেনি নিহত হন। তাঁর স্থলাভিষিক্ত হওয়া পুত্র মোজতবা খামেনিও হামলায় আহত হয়েছেন বলে ধারণা করা হচ্ছে। রয়টার্সের এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, পাকিস্তানের অনুরোধে ওয়াশিংটন হস্তক্ষেপ না করলে হয়তো পররাষ্ট্রমন্ত্রী আরাগচি এবং স্পিকার কালিবাফকেও ইসরাইল তাদের ‘হিট-লিস্ট’ থেকে বাদ দিত না। পাকিস্তান বর্তমানে এই আলোচনার প্রধান ভেন্যু হওয়ার দৌড়ে এগিয়ে আছে।

মার্কিন প্রস্তাব ও ইসরাইলের শর্ত: পাকিস্তানের মাধ্যমে পাঠানো যুক্তরাষ্ট্রের ১৫-দফার প্রস্তাবে ইরানকে তাদের ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণ বন্ধ করা, মিসাইল কর্মসূচি সীমিত করা এবং আঞ্চলিক মিত্রদের অর্থায়ন বন্ধের শর্ত দেয়া হয়েছে। তবে ইসরাইল এই প্রস্তাবে সন্দিহান; তারা চায় যে কোনো চুক্তিতে যেন তাদের 'প্রি-এমপ্টিভ স্ট্রাইক' বা আগাম হামলার অধিকার বজায় থাকে। অন্যদিকে, ইরান সোজা জানিয়েছে যে, লেবাননকেও যে কোনো যুদ্ধবিরতি চুক্তির অন্তর্ভুক্ত করতে হবে।
মাঠের পরিস্থিতি ও সামরিক শক্তি: কূটনৈতিক আলোচনার গুঞ্জনের মধ্যেই পাল্টাপাল্টি ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলা অব্যাহত রয়েছে। মার্কিন সেন্ট্রাল কমান্ডের প্রধান অ্যাডমিরাল ব্র্যাড কুপার দাবি করেছেন, তারা ইরানের ১০ হাজারেরও বেশি লক্ষ্যবস্তুতে আঘাত হেনেছেন এবং দেশটির বড় নৌযানগুলোর ৯২ শতাংশ ধ্বংস করা হয়েছে। পেন্টাগন এখন উপসাগরীয় অঞ্চলে হাজার হাজার ছত্রীসেনা পাঠানোর পরিকল্পনা করছে যাতে ট্রাম্প প্রয়োজনে স্থল অভিযানের নির্দেশ দিতে পারেন।

ট্রাম্পের ওপর অভ্যন্তরীণ চাপ: আগামী নভেম্বরের কংগ্রেস নির্বাচনের আগে ট্রাম্পের ওপর জনমতের চাপ বাড়ছে। রয়টার্স/ইপসোসের সাম্প্রতিক জরিপে দেখা গেছে, ৬১ শতাংশ আমেরিকান ইরানে এই সামরিক হামলার বিপক্ষে। জাতিসংঘ মহাসচিব আন্তোনিও গুতেরেসও সতর্ক করে বলেছেন, বিশ্ব এখন একটি বৃহত্তর যুদ্ধের মুখে দাঁড়িয়ে আছে। তাই সংঘাতের সিঁড়ি বেয়ে না উঠে, কূটনীতির সিঁড়ি বেয়ে নামার সময় এসেছে।
তথ্যসূত্র: রয়টার্স ও আল জাজিরা
