‘সবাই দুর্নীতিগ্রস্ত! চারদিকে শুধু ঘুষ আর অনিয়ম, আর সেই কারণেই আমি আজ আমার পরিবারের প্রায় সবাইকে হারালাম’; কান্না চেপে, তীব্র ক্ষোভে কাঁপতে কাঁপতে কথাগুলো বলছিলেন বিষ্ণু কান্ত গর্গ। গত বুধবার দিল্লির হৌজ রানির ‘ফ্লরিশ স্টে’স’ নামের একটি আবাসিক হোটেল রেস্তোরাঁয় লাগা ভয়াবহ আগুনে যে ২১ জন পুড়ে মারা গেছেন, তাঁদের মধ্যে বিষ্ণু বাবুর ভাইপো বিবেক আগরওয়াল এবং তাঁর বর্ধিত পরিবারের আরও সাত সদস্য রয়েছেন।
হৃদয়বিদারক এই ঘটনার সূত্রপাত হয়েছিল এক অসুস্থ বৃদ্ধকে কেন্দ্র করে। বিবেকের বাবা, সত্তোরোর্ধ্ব রাধে শ্যাম আগরওয়াল বেশ কিছুদিন ধরে সাকেতের ম্যাক্স হাসপাতালের আইসিইউ’তে চিকিৎসাধীন। বাবাকে হাসপাতালে ভর্তি করার পর তাঁর দেখভালের সুবিধার্থেই সাকেতের কাছে হৌজ রানির ওই হোটেলটিতে কয়েকটি ঘর ভাড়া নিয়েছিলেন বিবেক। কিন্তু কে জানত, বাবার জীবন বাঁচাতে এসে নিজেই সপরিবারে চিরতরে হারিয়ে যাবেন!

একই আগুনে শেষ তিন প্রজন্ম: বুধবারের সেই লেলিহান শিখা কেড়ে নিয়েছে বিবেক (৪৫), তাঁর বৃদ্ধা মা প্রেমলতা, স্ত্রী তর্জনী এবং তাঁদের দুই ফুটফুটে কন্যাসন্তান জীবিকা ও ওয়ারিয়ার প্রাণ। শুধু তা-ই নয়, ওই হোটেলেই বিবেকের সাথে অবস্থান করছিলেন তাঁর মামা কিষাণগড়ের বাসিন্দা অশোক গোয়েল, মাসি কমলা এবং মেসো জিমরি। আগুনে পুড়ে মারা গেছেন ওরাও। অর্থাৎ, একটি মাত্র অগ্নিকাণ্ড নিমেষের মধ্যে ধ্বংস করে দিল একই পরিবারের তিনটি প্রজন্মকে।
প্রশাসনের এই চরম উদাসীনতা ও গাফিলতির বিরুদ্ধে তীব্র ক্ষোভ উগরে দিয়ে পেশায় ট্যাক্স আইনজীবী বিষ্ণু কান্ত গর্গ বলেন, আমি নিজে ২০ লক্ষ টাকা দেব, আমি দেশের প্রধানমন্ত্রী এবং দিল্লি সরকারকে চ্যালেঞ্জ করছি, হৌজ রানির ওই এলাকার সব অবৈধ সম্পত্তি বুলডোজার দিয়ে গুঁড়িয়ে দিন। আর কোনো দিন যেন কোনো পরিবারকে এভাবে অকালে প্রাণ হারাতে না হয়। কিন্তু আমার ভাইপোকে কে ফিরিয়ে দেবে?
শোকে স্তব্ধ গুরগাঁওয়ের প্রতিবেশী ও সহকর্মীরা: গুরগাঁওয়ের সেক্টর ৪৬-এ বিবেকের বিশাল দোতলা বাড়ির সামনে এখন শুধুই স্বজনদের আহাজারি আর প্রতিবেশীদের ভিড়। স্বজনেরা জানান, চার্টার্ড অ্যাকাউন্ট্যান্ট বিবেক আগরওয়াল বিখ্যাত প্রতিষ্ঠান ‘ইনস্যুরেন্সদেখো’-র ডেপুটি সিএফও হিসেবে কর্মরত ছিলেন। ২০১৯ সালে তিনি সপরিবারে গুরগাঁওয়ে চলে আসেন। বিবেকের খুড়তুতো ভাই বিজয় জানান, তাঁরা রাজস্থানে একসাথে পড়াশোনা করেছেন এবং ভাইয়ের মতোই বড় হয়েছেন। কোটলায় কর্মরত বিজয়ই আগুন লাগার পর বিবেকের সাথে শেষ কথা বলেছিলেন এবং খবর পেয়েই হাসপাতালের দিকে ছুটে যান।

বিবেকের এক প্রতিবেশী রবীন্দ্র খাত্রী অত্যন্ত আবেগপ্রবণ হয়ে বলেন, বিবেক ভীষণ প্রাণবন্ত মানুষ ছিলেন। প্রতিদিন সকালে এলাকায় ৫-৬ কিলোমিটার সাইকেল চালাতেন। ওঁর বাবা ফুসফুসের সমস্যায় ভুগছেন, মাত্র এক সপ্তাহ আগেও ওঁর সাথে পার্কে কথা হয়েছিল। পুরো পরিবারটি ভীষণ অমায়িক ছিল। এদিকে বিবেকের এক সহকর্মী আফসোসের সুরে বলেন, আমাদের কোম্পানি মানুষকে ফায়ার ইনস্যুরেন্স (অগ্নিকাণ্ডের বিমা) দেয়, আর আজ আমাদের সহকর্মীর সাথেই এমনটা ঘটে গেল..."।
স্বজনেরা জানান, বিবেকের স্ত্রী একজন ইভেন্ট প্ল্যানার ছিলেন এবং বড় মেয়ে বেঙ্গালুরুতে পড়াশোনা করছিলেন। সবচেয়ে নির্মম বাস্তব হলো, বিবেকের বাবা রাধে শ্যাম আগরওয়াল এখনও হাসপাতালের আইসিইউতে মৃত্যুর সাথে পাঞ্জা লড়ছেন। তিনি এখনও জানেন না যে, তাঁর ছেলে, স্ত্রী, পুত্রবধূ ও নাতনিরা আর কেউ বেঁচে নেই। প্রতিবেশীদের একটাই প্রশ্ন, বৃদ্ধ যখন সুস্থ হয়ে চোখ মেলবেন, তখন কোন শূন্যতার মুখোমুখি হবেন তিনি? দিল্লির এই অগ্নিকাণ্ড আবারও আঙুল তুলল শহরের হোটেলগুলোর অগ্নিনির্বাপণ ব্যবস্থা এবং প্রশাসনের নজরদারির কঙ্কালসার চেহারার দিকে।
তথ্যসূত্র: ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস
