সুইডেনের স্টকহোম শহরের এক কনকনে শীতের রাতে ম্যাকডোনাল্ডসের ডিউটি শেষে বাড়ি ফিরছিলেন ২০ বছর বয়সী শিক্ষার্থী মুরাদ আবদেলকাদর। পথিমধ্যে কালো পোশাক পরা এক তরুণ হঠাৎ পিস্তল উঁচিয়ে তাঁর দিকে এগিয়ে আসে এবং পরপর কয়েকটি গুলি চালায়। মাটিতে লুটিয়ে পড়া মুরাদের মাথায় শেষ গুলিটি চালিয়ে নিশ্চিন্ত মনে স্থান ত্যাগ করে আততায়ী।
পরবর্তীতে জানা যায়, ১৮ বছর বয়সী ওই আততায়ীর নাম আতিলা আজিমভ। কিন্তু সবচেয়ে ভয়ংকর বিষয় হলো, আতিলা যাকে হত্যা করেছে, সে তার প্রকৃত টার্গেটই ছিল না! ভুল মানুষকে হত্যা করে আজীবন কারাদণ্ড ভোগ করছে সে।

টাকার লোভে এই হত্যাকাণ্ড চালিয়েছিল আতিলা। আর তাকে ভাড়া করেছিল ইউরোপজুড়ে কুখ্যাত অপরাধী চক্র ‘ফক্সট্রট নেটওয়ার্ক’ । অপরাধের জগতে এটি এখন ‘ভায়োলেন্স-অ্যাজ-এ-সার্ভিস’ বা ‘ভাড়ায় সহিংসতা’ নামেই পরিচিত। আন্তর্জাতিক তদন্তকারী সংস্থাগুলোর মতে, সুইডিশ এই অপরাধী গ্যাংটির সাথে সরাসরি যোগাযোগ রয়েছে ইরানের বর্তমান শাসনব্যবস্থার।
ইউরোপোলের বিশেষ টাস্কফোর্স ‘ওটিএফ গ্রিম’ জানায়, ফক্সট্রট নেটওয়ার্ক মূলত সোশ্যাল মিডিয়ার মাধ্যমে মানসিকভাবে অস্থির ও অপরাধপ্রবণ কিশোর-তরুণদের বড় অঙ্কের অর্থের টোপ দিয়ে ভাড়া করে। হত্যার এই পুরো প্রক্রিয়াটি শেষ হয় কম্পিউটার গেমের ধাঁচে, যাকে বলা হচ্ছে ‘গেমিফিকেশন’।

ইউরোপোলের ইউরোপীয় গুরুতর ও সংগঠিত অপরাধ কেন্দ্রের প্রধান অ্যান্ডি ক্রাগ এটিকে সুনির্দিষ্ট পরিকল্পনায় অপ্রাপ্তবয়স্কদের দিয়ে আউটসোর্সিংয়ের মাধ্যমে হত্যাকাণ্ড হিসেবে ব্যাখ্যা করেছেন। যুক্তরাজ্য, জার্মানি, ফ্রান্স, নেদারল্যান্ডস, ডেনমার্ক ও সুইডেনসহ ১১টি দেশ বর্তমানে যৌথভাবে এই ভিএএএস চক্রের বিরুদ্ধে কাজ করছে।
২০২২ সাল থেকে এই ফক্সট্রট নেটওয়ার্ক প্রায় ৩৫টি হত্যাকাণ্ড এবং ইউরোপের বুকে একাধিক ইসরাইলি লক্ষ্যবস্তুতে গ্রেনেড ও বিস্ফোরক হামলার সাথে জড়িত। ডেনমার্কের কোপেনহেগেনে অবস্থিত ইসরাইলি দূতাবাসে হ্যান্ডগ্রেনেড হামলাই তার বড় প্রমাণ।
সুইডিশ অনুসন্ধানী সাংবাদিক ডায়ামান্ট সালিহুর মতে, ফক্সট্রট গ্যাংয়ের প্রধান রাওয়া মজিদ সুইডেন ও তুরস্ক থেকে পালিয়ে বর্তমানে ইরানের রাজধানী তেহরানে অবস্থান করছেন। ২০২৩ সালের অক্টোবরে তেহরানে আশ্রয় পাওয়ার পর ইরানি প্রশাসনের সাথে তার এক বিশেষ চুক্তি হয়, ইরানে অবাধে বসবাস ও নিরাপত্তার বিনিময়ে তাঁর গ্যাং নেটওয়ার্ককে ইরানের শত্রু, বিরোধী সাংবাদিক এবং ইসরাইলি লক্ষ্যবস্তুগুলোতে হামলা চালাতে ব্যবহার করতে দেয়া হবে। ২০২৫ সালের এপ্রিলে যুক্তরাজ্য সরকার রাওয়া মজিদ ও তাঁর ফক্সট্রট নেটওয়ার্ককে আনুষ্ঠানিকভাবে নিষিদ্ধ ও নিষেধাজ্ঞা প্রদান করে।

কম্পিউটার গেমের চরিত্র থেকে হিটম্যান: এই গ্যাংয়ের কাজের নির্মম কৌশল ফুটে ওঠে নরওয়েজীয় ১৮ বছর বয়সী তরুণ জোহানেস নাটল্যান্ডের মামলায়। একজন স্বনামধন্য সাংবাদিক দম্পতির সন্তান হয়েও মাদকের নেশায় জড়িয়ে মানসিক রোগে আক্রান্ত হন নাটল্যান্ড। এরপর চাইল্ড কেয়ার হোমে তাঁর পরিচয় হয় অনলাইন আইডি ‘UnknownHustler’-এর সাথে।
সেখান থেকে সে আরেক কিশোর (অনলাইন নাম ‘Generalen’) এবং ফক্সট্রটের অন্যতম প্রধান সমন্বয়কারী এজেন্ট-৪৭ এর সংস্পর্শে আসে। উল্লেখ্য, এজেন্ট ৪৭ নামটি নেয়া হয়েছে বিখ্যাত কম্পিউটার গেম ‘হিটম্যান’ থেকে। সুইডিশ পুলিশের দাবি, মজিদের অত্যন্ত ঘনিষ্ঠ সহযোগী আলী শেহাদ আহমেদই মূল ‘এজেন্ট ৪৭’।
নাটল্যান্ডকে ইংল্যান্ডের হডার্সফিল্ডে পাঠিয়ে অনলাইন ম্যাপ ও ভিডিও বার্তা পাঠিয়ে ঝোপঝাড়ের নিচে লুকানো অস্ত্র ও ক্যাশ টাকা উদ্ধারের নির্দেশনা দেওয়া হয়। তবে চূড়ান্ত মিশন শুরুর আগেই ব্রিটিশ কাউন্টার টেররিজম পুলিশ তাকে গ্রেপ্তার করে। তাকে কত টাকা দেওয়ার কথা ছিল? প্রায় ২৭০,০০০ নরওয়েজীয় ক্রোন (প্রায় ২১,০০০ পাউন্ড)। কিন্তু ফক্সট্রটের নীতিই হলো, কাজ শেষে কোনো কিশোর আততায়ীকে টাকা দেয়া হয় না; কারণ তারা বেশিরভাগ ক্ষেত্রে ধরা পড়ে যায় বা তাদের ধরিয়ে দেওয়া হয়!
আন্তর্জাতিক অভিযান ও বর্তমান অবস্থা: ‘জেনারালেন’ নামের যে ১৬ বছর বয়সী কিশোর নাটল্যান্ডকে হায়ার করেছিল, সে একই সাথে একাধিক হত্যা মিশন পরিচালনা করত। পরবর্তীতে নরওয়ের এক পুলিশ কর্মকর্তার ১৪ বছর বয়সী ছেলেকে হত্যার পরিকল্পনা করতে গিয়ে সে পুলিশের জালে ধরা পড়ে এবং বর্তমানে ১৪ বছরের কারাদণ্ড ভোগ করছে।

গত ১৫ মাসে ইউরোপোল ও আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলোর যৌথ অভিযানে প্রায় ২৮০ জনেরও বেশি সন্দেহভাজনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। এর মধ্যে ‘এজেন্ট ৪৭’ খ্যাত আলী শেহাদ আহমেদকে ইরাকের সুলাইমানিয়া শহর থেকে গ্রেপ্তার করে সুইডেনে হস্তান্তরের প্রক্রিয়া চলছে। তিউনিসিয়া থেকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে এই গ্যাংয়ের অন্যতম মূল চালিকাশক্তি মোহমেদ ‘মোগলি’ মেহদিকে।
তবে মূল খলনায়ক রাওয়া মজিদ এখনও তেহরানে নিরাপদ থাকায় এবং অন্যান্য প্রতিদ্বন্দ্বী গ্যাংগুলোও কিশোরদের দিয়ে একই ভিএএএসমডেল অনুকরণ করতে শুরু করায় ইউরোপের ওপর এই গ্যাংস্টার নেটওয়ার্কের হুমকি দিন দিন আরও জটিলাকার ধারণ করছে।
তথ্যসূত্র: বিবিসি
