মধ্যপ্রাচ্যের জলসীমানায় মার্কিন ব্লকেড বা নৌ-অবরোধের জবাবে এবার এক নতুন রণকৌশলগত চাল চালার কথা ভাবছে তেহরান। যুক্তরাষ্ট্রের বৈরী আচরণের প্রেক্ষিতে সম্পূর্ণ ইরানি ব্যবস্থাপনায় ‘হরমুজ প্রণালী’ পুনরায় খুলে দেওয়ার জন্য ওয়াশিংটনকে ৩০ দিনের একটি চূড়ান্ত সময়সীমা দেয়া হতে পারে।
সম্প্রতি পাকিস্তানের ইসলামাবাদে অনুষ্ঠিত শান্তি আলোচনায় ইরানের প্রতিনিধি দলের অন্যতম সদস্য মজিদ শাকেরি দেশের আধাসরকারী বার্তা সংস্থা ফারস নিউজকে দেয়া এক সাক্ষাৎকারে এই চাঞ্চল্যকর তথ্য জানিয়েছেন।
মজিদ শাকেরি বলেন, নতুন এই প্রস্তাবের আওতায় তেহরানের পক্ষ থেকে ঘোষণা করা উচিত, আমেরিকা এবং তার মিত্রদের সব সামরিক হুমকি সম্পূর্ণভাবে প্রত্যাহার করার ৩০ দিন পর শুধু ইরানি প্রশাসনের অধীনেই হরমুজ প্রণালী পুনরায় উন্মুক্ত করা সম্ভব হবে।

উল্লেখ্য, গত ২৮ ফেব্রুয়ারি মার্কিন-ইসরাইলি যৌথ বিমান হামলার পর ইরান এই কৌশলগত জলপথটি কার্যত বন্ধ করে দেয়। এর জবাবে গত এপ্রিল মাস থেকে মার্কিন নৌবাহিনী এই প্রণালীতে কঠোর নৌ-অবরোধ জারি করে রেখেছে, যার ফলে দুই পক্ষের মধ্যে শান্তি আলোচনা এখন সম্পূর্ণ স্থবির।
এদিকে, হরমুজ প্রণালী দিয়ে চলাচলকারী জাহাজগুলোর ওপর সামুদ্রিক ও পরিবেশগত সেবা ফি আরোপের একটি বড় পরিকল্পনা নিয়ে কাজ করছে ইরান। দেশটির পরিবেশ বিভাগের প্রধান শিনা আনসারি আধা সরকারী বার্তা সংস্থা তাসনিম নিউজকে জানিয়েছেন, এই সংক্রান্ত একটি প্রস্তাব বর্তমানে সরকারের উচ্চপর্যায়ে পর্যালোচনার অধীনে রয়েছে।
শিনা আনসারি এই ফি’র যৌক্তিকতা তুলে ধরে বলেন, এই আলোচনার উদ্দেশ্য শুধু কর বা ফি আদায় করা নয়; বরং এর সাথে বিভিন্ন পরিষেবার বিষয় জড়িত। এর মধ্যে রয়েছে জলপথে নৌযানগুলোকে দিকনির্দেশনা দেওয়া, অনুসন্ধান ও উদ্ধার অভিযান পরিচালনা করা, বাণিজ্যিক জাহাজের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা এবং সামগ্রিক সামুদ্রিক পরিবেশ রক্ষা করা।
তিনি আরও যোগ করেন, এই প্রস্তাবিত ফি’র একটি বড় অংশ নেওয়া হবে বাণিজ্যিক জাহাজ চলাচলের কারণে সামুদ্রিক বাস্তুতন্ত্রের যে ক্ষতি হচ্ছে এবং পরিবেশগত যে ঝুঁকি তৈরি হয়েছে, তা কাটিয়ে ওঠার তহবিল হিসেবে।

আমেরিকা ও ইরানের মধ্যকার শান্তি আলোচনা ভেস্তে যাওয়ায় বিশ্বের অন্যতম প্রধান এই বাণিজ্যিক জলপথে বর্তমানে সাধারণ বাণিজ্যিক জাহাজ চলাচল প্রায় শূন্যের কোঠায় নেমে এসেছে। ওমানের সাথে যৌথভাবে এই প্রণালীর ওপর নিজেদের সার্বভৌমত্বের দাবি পুনর্ব্যক্ত করে আসছেন ইরানি কর্মকর্তারা।
বর্তমানে ইরানের বিশেষ অনুমতি নিয়ে যে অল্পসংখ্যক জাহাজ এই প্রণালী পার হচ্ছে, তাদের কাছ থেকে গড়ে ১৫ থেকে ২০ লাখ (১.৫ থেকে ২ মিলিয়ন) মার্কিন ডলার মাশুল আদায় করা হচ্ছে বলে জানিয়েছেন ইরানের সংসদের একজন সিনিয়র সদস্য।
তবে ওয়াশিংটন ইরানের এই সার্বভৌমত্ব ও টোল আদায়ের নীতি কোনোভাবেই মেনে নিতে রাজি নয়। মার্কিন প্রশাসনের পক্ষ থেকে সাফ জানিয়ে দেওয়া হয়েছে যে, এই সংঘাত বা যুদ্ধ শেষ হওয়ার পর হরমুজ প্রণালীকে কোনো ধরনের শর্ত, কড়াকড়ি কিংবা টোল ছাড়াই আন্তর্জাতিক বাণিজ্যিক জাহাজের জন্য সম্পূর্ণ উন্মুক্ত করে দিতে হবে। ফলে, এই গুরুত্বপূর্ণ আন্তর্জাতিক জলপথটির ভবিষ্যৎ এবং বৈশ্বিক অর্থনীতিতে এর প্রভাব কোন দিকে মোড় নেয়, তা নিয়ে আন্তর্জাতিক মহলে গভীর উদ্বেগ সৃষ্টি হয়েছে।
তথ্যসূত্র: সিএনএন
