ভয়াবহ আর্থিক বিপর্যয়, রাজনৈতিক অচলাবস্থা এবং ধারাবাহিক সংঘাতের মধ্য দিয়ে যাওয়া লেবাননে এখন আলোচনার মূল কেন্দ্রবিন্দু হয়ে উঠেছে সাধারণ একটি চিকেন স্যান্ডউইচ! বৈরুতের একটি ট্রেন্ডি হেলথ রেস্তোরাঁর ১৩ ডলার দামের (প্রায় ১,৫০০ টাকা) একটি স্যান্ডউইচকে কেন্দ্র করে পুরো দেশজুড়ে শুরু হয়েছে তীব্র বিতর্ক, যা লেবাননের সমাজে ধনী ও দরিদ্রের মধ্যবর্তী বিশাল ফাঁক এবং মধ্যবিত্ত শ্রেণীর বিলুপ্তিকে নতুন করে সামনে এনে দিয়েছে।
ঘটনার সূত্রপাত 'দ্য গ্লো প্যারাডাইস' নামের একটি রেস্তোরাঁ থেকে। স্বাস্থ্য সচেতন গ্রাহকদের জন্য লেবাননের ঐতিহ্যবাহী ও অত্যন্ত জনপ্রিয় খাবার ‘শিশ তাউক’-এর একটি হেলদি ভার্সন বাজারে নিয়ে আসে তারা, যার নাম দেওয়া হয় ‘চিক তাউক’ । কিন্তু সাধারণ একটি চিকেন স্যান্ডউইচের দাম যেখানে বৈরুতে সর্বোচ্চ ৬ থেকে ৭ ডলার, সেখানে এই বিশেষ স্যান্ডউইচটির দাম নির্ধারণ করা হয় ১৩ ডলার।
দেশের সাধারণ মানুষ যেখানে জীবনধারণের মৌলিক উপাদান জোগাতেই হিমশিম খাচ্ছে, সেখানে এমন আকাশছোঁয়া দাম নিয়ে নেটিজেন ও ক্ষুব্ধ সমালোচকরা রেস্তোরাঁটির বিরুদ্ধে ‘অতিরিক্ত দাম হাঁকানো’ ও ‘ডাকাতির’ অভিযোগ তোলেন।

তবে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে সাধারণ মানুষের এই প্রচণ্ড ক্ষোভ ও সমালোচনার মধ্যেও থেমে থাকেনি বিক্রি। উল্টো বিতর্কের সুযোগে রেস্তোরাঁটির স্যান্ডউইচ বিক্রি হয়েছে হু হু করে। 'দ্য গ্লো প্যারাডাইস'-এর ম্যানেজিং পার্টনার হ্রাগ জেঘালিয়ান জানান, তীব্র বিতর্কের মধ্যেও মাত্র ১১ দিনে তাঁরা ২০ হাজারেরও বেশি 'চিক তাউক' স্যান্ডউইচ বিক্রি করেছেন! অনলাইনের এই তীব্র প্রতিক্রিয়াকে তিনি তাদের ব্যবসায়িক সফলতার জন্য ‘প্রাকৃতিক বিপণন’ হিসেবেই দেখছেন।
লেবাননের এই বৈপরীত চিত্র নতুন করে ঘা দিয়েছে দেশটির ক্ষতস্থানে। বৈরুতের সেন্ট জোসেফ বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতিবিদ সামি নাদের এ বিষয়ে বলেন, রেস্তোরাঁটিতে ভিড় দেখে পুরো দেশের বাস্তবতা বোঝা যাবে না। মানুষ হয়তো রেস্তোরাঁয় ভিড় করছে, কিন্তু এর অন্তরালে কেবল গত মাসেই যে ২২টি রেস্তোরাঁ চিরতরে বন্ধ হয়ে গেছে, তা চোখের আড়ালেই থেকে যাচ্ছে।
তিনি আরও বলেন, সংঘাত, ২০২০ সালের বৈরুত বন্দর বিস্ফোরণ এবং অর্থনৈতিক ধসের কারণে লেবাননের ঐতিহ্যবাহী বিশাল ‘মধ্যবিত্ত শ্রেণী’ আজ পুরোপুরি বিলুপ্ত হয়ে গেছে। এখন সমাজে দুটি স্পষ্ট অংশ রয়েছে, একদিকে হাতে গোনা কিছু ধনী মানুষ যারা অবাধে বিলাসিতা করতে পারছেন, অন্যদিকে বিশাল জনগোষ্ঠী যারা জীবন বাঁচাতে প্রতিদিন সংগ্রাম করছেন।

বিশ্বব্যাংকের তথ্যমতে, ২০১৯ সালের আর্থিক ধসের পর থেকে লেবাননের মোট দেশজ উৎপাদন (জিডিপি) প্রায় ৪০ শতাংশ হ্রাস পেয়েছে। বিশ্বব্যাপী জ্বালানি ও পরিবহন খরচ বৃদ্ধির ফলে মুদ্রাস্ফীতি ১৭.৫ শতাংশে গিয়ে ঠেকবে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে, যা আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (আইএমএফ) বৈশ্বিক গড়ের চেয়ে চারগুণ বেশি। এমনকি জাতিসংঘ শিশু তহবিলের (ইউনিসেফ) সেপ্টেম্বর মাসের পরিসংখ্যান বলছে, লেবাননের প্রতি পাঁচটি পরিবারের চারটিই এখন তাদের মৌলিক চাহিদা মেটাতে চরম সংকটে ভুগছে।
দেশটিতে বিদ্যুতের জাতীয় গ্রিড অচল হয়ে পড়ায় মানুষকে বেসরকারি জেনারেটরের ওপর নির্ভর করতে হচ্ছে। ২০২৬ সালের আগস্ট মাসেই এর বিল এক লাফে প্রায় ২০ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়েছিল, যা ফেব্রুয়ারির তুলনায় প্রায় ৬০ শতাংশ বেশি। যেখানে দেশের সর্বনিম্ন মজুরি নির্ধারণ করা রয়েছে মাত্র ৪০০ ডলার, সেখানে কেবল ২৪ ঘণ্টার বিদ্যুৎ বিল জোগাতেই সাধারণ মানুষকে মাসে কয়েকশ ডলার গুনতে হচ্ছে।
হামরা এলাকার এক রেস্তোরাঁ কর্মী ফুয়াদ ফাখরেদিন ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, "সবকিছুর দাম এতটা বেড়েছে যে মানুষ আর কুলিয়ে উঠতে পারছে না। বেতন যা পাই, তা দিয়ে চলতে গিয়ে উল্টো ঋণের জালে জড়িয়ে পড়তে হয়। বছরের পর বছর ধরে চলা এই সংকটে দেশে এখন দুটি শ্রেণী তৈরি হয়েছে, এক শ্রেণী রাজার মতো বাঁচছে, আর অন্য শ্রেণীটি জীবিত থাকার ভান করে অমানবিক পরিস্থিতি সহ্য করতে করতে মৃত্যুর প্রহর গুনছে।
তথ্যসূত্র: রয়টার্স
