ভোটেকোশী ও ত্রিশূলী নদীর প্রলয়ঙ্করী প্লাবনে নেপালের বিদ্যুৎ খাতে অপূরণীয় ক্ষতি সাধিত হয়েছে। নেপাল বিদ্যুৎ কর্তৃপক্ষের (এনইএ) প্রাথমিক অনুমান অনুযায়ী, ডজনখানেক জলবিদ্যুৎ প্রকল্প এবং বিদ্যুৎ সঞ্চালন অবকাঠামো ধ্বংস হয়ে ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ শত শত কোটি রুপিতে পৌঁছাতে পারে, যা বেসরকারি উদ্যোক্তাদের প্রাথমিক হিসাবকে বহু গুণ ছাড়িয়ে গেছে।
এই নজিরবিহীন ধ্বংসযজ্ঞ ক্ষতিগ্রস্ত প্রকল্পগুলো কীভাবে পুনর্নির্মিত হবে এবং এর অর্থনৈতিক দায় কে বহন করবে, তা নিয়ে এক তীব্র অনিশ্চয়তা ও বড় প্রশ্ন তুলে দিয়েছে।

নেপাল বিদ্যুৎ কর্তৃপক্ষের মুখপাত্র রাজন ধাকাল জানান, বর্তমানে তাঁদের প্রধান অগ্রাধিকার হচ্ছে উদ্ধার অভিযান, নিখোঁজদের সন্ধান এবং বিদ্যুৎ সরবরাহ পুনঃপ্রতিষ্ঠা করা। তিনি বলেন, রসুয়াগাধি জলবিদ্যুৎ প্রকল্পটি পুরোপুরি ভেসে গেছে এবং চিলিমে প্রকল্পটি মাটির নিচে চাপা পড়েছে।
তবে এনইএ’র এই বিশাল অঙ্কের প্রাক্কলনের সাথে কিছুটা দ্বিমত পোষণ করেছে ইন্ডিপেন্ডেন্ট পাওয়ার প্রডিউসার্স অ্যাসোসিয়েশন, নেপাল (আইপিপিএএন)। সংগঠনটির সিনিয়র ভাইস প্রেসিডেন্ট উত্তম ভ্লোন লামার মতে, এই খাতে গড়ে প্রায় ২৫ থেকে ৩০ বিলিয়ন রুপি ক্ষতি হতে পারে।
তিনি জানান, যেসব পুরনো বিদ্যুৎ কেন্দ্রের পাওয়ার হাউস ভূ-পৃষ্ঠে অবস্থিত ছিল, সেগুলো সম্পূর্ণ বা মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। অন্যদিকে, ভূগর্ভস্থ পাওয়ার হাউস ও ডিস্যান্ডার থাকা নতুন প্রকল্পগুলো তুলনামূলকভাবে কম ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।
রসুয়া এবং নুয়াকোট জেলায় চালু থাকা ও নির্মাণাধীন মিলিয়ে অন্তত ১৩টি জলবিদ্যুৎ প্রকল্প মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।

চালু থাকা ক্ষতিগ্রস্ত প্রকল্প: ল্যাংটাং খোলা (২০ মেগাওয়াট), মাইলুং খোলা (৫ মেগাওয়াট ও ১৪.৮ মেগাওয়াট), এনইএ পরিচালিত একটি সৌর বিদ্যুৎ প্রকল্প (২৫ মেগাওয়াট), দেবীঘাট (১৪ মেগাওয়াট), ত্রিশূলী (২৪ মেগাওয়াট), আপার ত্রিশূলী এ (৬০ মেগাওয়াট), চিলিমে (২২ মেগাওয়াট) এবং রসুয়াগাধি জলবিদ্যুৎ প্রকল্প (১১১ মেগাওয়াট)।
নির্মাণাধীন ক্ষতিগ্রস্ত প্রকল্প: আপার ত্রিশূলী ৩বি (৩৭ মেগাওয়াট), রসুয়াগাধি ভোটেকোশী (১২০ মেগাওয়াট), আপার মাইলুং এ (৬.৪২ মেগাওয়াট), আপার ত্রিশূলী ১ (২১৬ মেগাওয়াট) এবং মিডল ত্রিশূলী গঙ্গা প্রকল্প (১৫.৬ মেগাওয়াট)।
অবশ্য আইপিপিএএন-এর সভাপতি মোহন কুমার ডাঙ্গি জানিয়েছেন, দেশে বর্তমানে চাহিদার চেয়ে বেশি বিদ্যুৎ উৎপাদিত হওয়ায় এই বিপর্যয়ের কারণে তাৎক্ষণিকভাবে কোনো জাতীয় বিদ্যুৎ সংকট তৈরি হবে না।

বীমা দাবি ও সরকারের প্রস্তুতিতে জটিলতা: ক্ষতিগ্রস্ত প্রকল্পগুলো কতটা দ্রুত পুনর্নির্মাণ করা সম্ভব হবে, তা নির্ভর করছে বীমা দাবির নিষ্পত্তির ওপর। বেসরকারি খাতের সমস্ত জলবিদ্যুৎ প্রকল্প বীমাকৃত হলেও, সরকারি মালিকানাধীন অনেক অবকাঠামোর ক্ষেত্রে ব্যাপক বীমা কভারেজ নেই বলে খাত সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞরা উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন।
নেপাল ইন্স্যুরেন্স অথরিটির সাবেক নির্বাহী পরিচালক রাজু রমন পৌডেল জানান, জলবায়ু ঝুঁকি বৃদ্ধি পাওয়া সত্ত্বেও নেপালের অনেক সরকারি কাঠামো বীমাহীন রয়ে গেছে, যা এনইএ’র প্রকল্প পুনর্নির্মাণে বড় ধরনের জটিলতা তৈরি করতে পারে। তবে কর্তৃপক্ষের বর্তমান নির্বাহী পরিচালক সুশীল দেব সুবেদি জানিয়েছেন, ধ্বংসপ্রাপ্ত স্থানগুলোতে ত্রাণ ও উদ্ধার কাজ শেষ হওয়ার পর লাইসেন্সপ্রাপ্ত সার্ভেয়ারদের মাধ্যমে ক্ষতি নিরূপণ করে বীমা দাবি পূরণ করা হবে।

শেয়ার বাজারে বড় ধাক্কা: এই প্রলয়ঙ্করী দুর্যোগের প্রভাবে নেপালের শেয়ার বাজারো তীব্র অস্থিরতা দেখা দিয়েছে। জলবিদ্যুৎ এবং অ-জীবন বীমা খাতের শেয়ারে বড় ধরণের পতন ঘটেছে।
গত সপ্তাহের লেনদেনে দেখা যায়, জলবিদ্যুৎ খাতের সূচক অনেক নেমে গেছে। বিশেষ করে রসুয়াগাধি হাইড্রো বিদ্যুতের শেয়ার দর সর্বোচ্চ ১৫ শতাংশ পর্যন্ত পড়ে যায়। এছাড়া মাইলুং খোলা, ত্রিশূলী জলবিদ্যুৎ, আপার মাইলুং এবং চিলিমে হাইড্রোবিদ্যুতের শেয়ার মূল্যে ১০ থেকে ১৫ শতাংশ পর্যন্ত বড় পতন ঘটে।ৱ
বীমা খাতের শেয়ার দরও হু-হু করে কমেছে। ক্ষতিগ্রস্ত বিশাল অবকাঠামোর জন্য বীমা কোম্পানিগুলোকে মোটা অঙ্কের ক্ষতিপূরণ গুনতে হবে, এমন আশঙ্কায় বিনিয়োগকারীরা আতঙ্কিত হয়ে নন-লাইফ ইন্স্যুরেন্স শেয়ার বিক্রি করে দেন।

অন্যদিকে, উল্টো চিত্র দেখা গেছে আবাসন ও নির্মাণ সামগ্রী প্রস্তুতকারক কোম্পানিগুলোর শেয়ারে। দুর্যোগ পরবর্তী পুনর্নির্মাণ কাজ শুরু হলে সিমেন্ট ও রঙের চাহিদা চরম বৃদ্ধি পাবে, এমন প্রত্যাশায় সর্বোত্তম পেইন্টস, ঘোরাহি সিমেন্ট, সোনাপুর মিনারেলস এবং শিবম সিমেন্টের শেয়ার দর লাফিয়ে বেড়েছে।
শেয়ার বাজার ব্রোকার নরেন্দ্র সিজাপতি জানান, ২০১৫ সালের প্রলয়ঙ্করী ভূমিকম্পের পরেও শেয়ার বাজারে ঠিক একই ধরনের আচরণ দেখা গিয়েছিল। তবে কেবল দুর্যোগ কবলিত অঞ্চলের বাইরের বিদ্যুৎ কোম্পানিগুলো ঝুঁকিমুক্ত থাকায় সার্বিক শেয়ার বাজারে এর নেতিবাচক প্রভাব দীর্ঘস্থায়ী নাও হতে পারে। তবে বহু তীর্থযাত্রীর প্রাণহানির কারণে জীবন বীমা খাতও একটি বড় চাপের মুখে পড়তে যাচ্ছে।
তথ্যসূত্র: কাঠমান্ডু পোস্ট
