কালজয়ী চলচ্চিত্রকার ও শক্তিমান কথাশিল্পী জহির রায়হানের জন্মদিন আজ। আজ থেকে ৮৬ বছর আগে ১৯৩৫ সালের ১৯ আগস্ট ফেনীর মজুপুর গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন তিনি।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বাংলায় স্নাতক সম্পন্ন করা জহির রায়হান অল্প বয়সেই কমিউনিস্ট রাজনীতিতে জড়িয়ে পড়েন। তখন পার্টি নিষিদ্ধ থাকায় তিনি বার্তাবাহকের কাজ করতেন।
জহির রায়হান যখন ক্লাস ফোরে পড়তেন তখন তিনি কমিউনিস্ট পার্টির কুরিয়ার হিসেবে কাজ করতেন। নেতাদের চিঠিপত্র পৌঁছে দিতেন, বিক্রি করতেন কমিউনিস্ট পার্টির মুখপাত্র 'স্বাধীনতা পত্রিকা'। জহির রায়হানের আসল নাম ছিল জহির উল্লাহ। জহিরের পর রায়হান শব্দটি যুক্ত করে দিয়েছিল কমিউনিস্ট পার্টি।
কমরেড মনি সিংহ জহির রায়হানের সম্পর্কে স্মৃতিচারণ করতে গিয়ে বলেন-
'আমার জহিরের যেই স্মৃতিটা চোখে ভাসে তা হল, হাফ প্যান্ট পরা জহির... শার্টের বোতাম একটা খুলে গেছে, এক হাতে প্যান্টটা ধরে আছে এবং বগলে স্বাধীনতা পত্রিকা... এবং সেই অবস্থায় কোলকাতার রাস্তায় পার্টির জন্য স্বাধীনতা পত্রিকা বিক্রি করছে জহির।'
১৯৫২ সালের ২১ ফেব্রুয়ারি প্রথম যে ১০ জনের দলটি ১৪৪ ধারা ভেঙেছিল, জহির রায়হান তাদেরই একজন। ১৯৬৯ সালের গণ-অভ্যুত্থানের সঙ্গেও জড়িত ছিলেন সরাসরি। এ সময় তিনি ক্যামেরা হাতে সক্রিয় ছিলেন বিভিন্ন কর্মসূচিতে।
ভাষা আন্দোলন একজন জহিরকে তৈরি করতে বিশেষ ভূমিকা রেখেছিল। কথা সাহিত্যিক হুমায়ুন আজাদ জহির রায়হান সম্পর্কে লিখেছেন-
“জহির রায়হান সম্ভবত বাংলাদেশের একমাত্র কথা সাহিত্যিক যার উদ্ভবের পেছনে আছে ভাষা আন্দোলন, যদি বায়ান্ন’র একুশ না ঘটতো তবে জহির রায়হান হয়তো কথাশিল্পী হতেন না।”
ছাত্রজীবন থেকেই লেখালেখির শুরু জহির রায়হানের। চলচ্চিত্রেও তার আগ্রহ সে সময় থেকেই। ১৯৫৭ সালে প্রথম কাজ করেন পাকিস্তানি চিত্রপরিচালক জারদারির সঙ্গে। তার প্রথম ছবি উর্দু ভাষার ‘জাগো হুয়া সাবেরা’। ১৯৬১ সালে তার পরিচালিত প্রথম চলচ্চিত্র ‘কখনও আসেনি’ মুক্তি পায়। ১৯৬৪ সালে পাকিস্তানের প্রথম রঙিন ছবি ‘সঙ্গম’ নির্মাণ করেন তিনি। ১৯৬৫ সালে মুক্তি পায় তার প্রথম সিনেমাস্কোপ ছবি ‘বাহানা’। ‘জীবন থেকে নেয়া’ সিনেমাতে প্রতীকী কাহিনীর মধ্য দিয়ে পাকিস্তানের স্বৈরাচারী শাসনকে চিত্রিত করেন তিনি। এর মাধ্যমে জনগণকে পাকিস্তানি স্বৈরশাসকের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ গড়ে তুলতে উদ্বুদ্ধ করেন তিনি।
১৯৭১ সালের এপ্রিলে জহির রায়হান চলে যান কলকাতায়। শুরু করেন তার অন্য রকম মুক্তিযুদ্ধ। ক্যামেরা হাতে তিনি ঘুরে বেড়িয়েছেন বিভিন্ন সীমান্তে এবং এক শরণার্থী শিবির থেকে আরেক শরণার্থী শিবিরে। নিপীড়িত মানুষের মুক্তির বিষয়টি তিনি চলচ্চিত্রে ব্যবহার করতে চাইতেন প্রথম থেকেই।
লাতিন আমেরিকার বিপ্লবী ধারার ছবিগুলোই ছিল তার মূল প্রেরণা। সবচেয়ে বেশি প্রভাবিত করেছিল কিউবান চিত্রপরিচালক আল ভারেজ। মূলত তার প্রেরণায় তিনি নির্মাণ করেন ‘স্টপ জেনোসাইড’।
কোলকাতায় 'স্টপ জেনোসাইড'-এর প্রিমিয়ার দেখার পর মুগ্ধ সত্যজিৎ রায় জহির রায়হানকে জড়িয়ে ধরেছিলেন। সত্যজিৎ রায় ভূয়সী প্রসংসা করে বলেছিলেন-শুধুমাত্র 'স্টপ'এই কথাটি দিয়েই সে পুরো ব্যাপারটা থামাতে প্রয়াস নিয়েছিল এবং সেটা সে খুব ভালভাবে করতে পেরেছিল।

মুক্তিযুদ্ধে শিল্পীরাও যে তাদের শিল্প দিয়ে প্রথমসারির যোদ্ধা হয়ে উঠেছিলেন তার অনন্য উদাহরণ জহির। চলচ্চিত্র পরিচালক আলমগীর কবির একাত্তরে তার কর্মকাণ্ড নিয়ে লিখতে গিয়ে বলেছেন-
"যখন কিছু কিছু লোককে দেখেছি নিজেদের ফিল্মের প্রিন্ট বিক্রি করে আর্থিক সাচ্ছল্য বাগাতে সচেষ্ট, ঠিক তখনি মুক্তিযুদ্ধের ভেতর দেখেছি জহিরকে তার ‘জীবন থেকে নেয়া’র ভারতে বিক্রয়লব্ধ সমুদয় অর্থ বাংলাদেশ সরকারকে দান করতে, স্বীয় অর্থকষ্ট থাকা সত্ত্বেও। ঘরে স্ত্রী সুচন্দা জ্বরে অজ্ঞান, বড় ছেলে অপুও অসুস্থ। জহির ঘরে নেই। স্টুডিওতে। রাত নেই, দিন নেই, ঘুম নেই- ‘স্টপ জেনোসাইড’ তৈরি করছে। ও জানতো বাঙলার স্বাধীনতা যুদ্ধের প্রচারই যথেষ্ট নয়। বিশ্বের সকল পরাধীন শোষিত মানুষের সংগ্রামের সাথে বাঙালীর স্বাধীনতা আন্দোলনের একাত্মতা বোঝাতে হবে এই ছবির মাধ্যমে।'
জহির রায়হানের অন্য ছবিগুলো হচ্ছে- ‘সোনার কাজল’, ‘কাঁচের দেয়াল’, ‘আনোয়ারা’, ‘বেহুলা’, ‘জ্বলতে সুরুজ নিচে’। নির্মাণ শেষ করতে পারেননি ‘লেট দেয়ার বি লাইট’-এর কাজ। তার প্রকাশিত উপন্যাসগুলোর মধ্যে রয়েছে ‘শেষ বিকেলের মেয়ে’, ‘হাজার বছর ধরে’, ‘আরেক ফাল্কগ্দুন’, ‘বরফ গলা নদী’ এবং ‘আর কত দিন’।
এসব ক্ষেত্রে অসামান্য অবদানের স্বীকৃতিস্বরূপ ‘নিগার’ চলচ্চিত্র পুরস্কার, আদমজী সাহিত্য পুরস্কার এবং বাংলা একাডেমির মরণোত্তর সাহিত্য পুরস্কারসহ অসংখ্য পুরস্কার ও সম্মাননায় ভূষিত হয়েছেন তিনি।
১৯৭২ সালের ৩০ জানুয়ারি বড় ভাই শহীদ বুদ্ধিজীবী শহীদুল্লা কায়সারের সন্ধানে বেরিয়ে আর ফিরে আসেননি এই নন্দিত চলচ্চিত্র পরিচালক। তার মৃতদেহটিও পাওয়া যায়নি। ওই দিনটি জহির রায়হানের অন্তর্ধান দিবস হিসেবে পালিত হয়।
একাত্তর/এআর
