বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দলের (বিএনপি) অন্যতম অভিভাবক ও প্রবীণ রাজনীতিবিদ মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর বিগত কয়েক দশক ধরে বাংলাদেশের রাজনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে আসছেন। পেশাগত জীবনে একজন সফল শিক্ষক, সরকারি কর্মকর্তা এবং পরবর্তীতে জাতীয় রাজনীতির এক আপসহীন কাণ্ডারি হিসেবে তাঁর পথচলা সুদীর্ঘ ও বৈচিত্র্যময়।
মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর ১৯৪৮ সালের ২৬ জানুয়ারি ঠাকুরগাঁও জেলায় এক ঐতিহ্যবাহী রাজনৈতিক পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর পরিবার প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে বাংলাদেশের জাতীয় রাজনীতির সাথে দীর্ঘকাল যুক্ত।

তাঁর বাবা মির্জা রুহুল আমিন ছিলেন একাধারে বিশিষ্ট আইনজীবী এবং প্রখ্যাত রাজনীতিবিদ, যিনি ঠাকুরগাঁও অঞ্চল থেকে একাধিকবার সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন এবং পরবর্তীতে গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকারের কৃষিমন্ত্রীর দায়িত্ব পালন করেন।
পরিবারের অন্যান্য সদস্যরাও রাজনীতি ও দেশসেবায় স্মরণীয় অবদান রেখেছেন। তাঁর চাচা মির্জা গোলাম হাফিজ বিএনপির একজন জ্যেষ্ঠ নেতা ছিলেন, যিনি ভূমিমন্ত্রী (১৯৭৮-৭৯), আইন ও বিচার মন্ত্রী (১৯৯১-৯৬) এবং বাংলাদেশের দ্বিতীয় জাতীয় সংসদের স্পিকার হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন।
অপর চাচা উইং কমান্ডার এস আর মির্জা ১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধের সময় গঠিত ঐতিহাসিক মুজিবনগর সরকারের অধীনে যুব শিবির অধিদপ্তরের প্রধান হিসেবে মুক্তিযোদ্ধাদের প্রশিক্ষণ তদারকি করেছিলেন।
এছাড়া তাঁর ছোট ভাই মির্জা ফয়সল আমীন ঠাকুরগাঁও পৌরসভার মেয়র হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন এবং ঠাকুরগাঁও জেলা বিএনপির সাধারণ সম্পাদক পদে নিয়োজিত রয়েছেন।

শিক্ষাজীবন ও ছাত্র রাজনীতিতে পদার্পণ: মির্জা ফখরুল ইসলাম অর্থনীতি বিভাগে অধ্যয়ন করতে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হন এবং সেখান থেকেই সুনামের সাথে স্নাতক ও স্নাতকোত্তর ডিগ্রি অর্জন করেন।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যয়নকালেই ১৯৬০-এর দশকে তাঁর রাজনীতিতে হাতেখড়ি হয়। তিনি তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তান কমিউনিস্ট পার্টির ছাত্র সংগঠন 'পূর্ব পাকিস্তান ছাত্র ইউনিয়ন' (ইপিএসইউ)-এ যোগ দেন। রাজনৈতিক প্রজ্ঞা ও নেতৃত্বের গুণাবলীর কারণে তিনি ছাত্র ইউনিয়নের ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের এস এম হল ইউনিটের মহাসচিব নির্বাচিত হন।
পরবর্তীতে সংগঠনের সর্বোচ্চ স্তরে উঠে এসে ১৯৬৯ সালে স্বৈরাচারী সামরিক শাসক আইয়ুব খানের বিরুদ্ধে ঐতিহাসিক গণঅভ্যুত্থানের সময়ে ছাত্র ইউনিয়নের মর্যাদাপূর্ণ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় শাখার সভাপতির দায়িত্ব পালন করেন। সে সময় রাজনৈতিক কারণে তাঁকে গ্রেপ্তার হতে হয় এবং তিনি কারাবরণ করেন।

শিক্ষকতা ও সরকারি কর্মজীবন: পড়াশোনা শেষে মির্জা ফখরুল ১৯৭২ সালে ঢাকা কলেজে অর্থনীতি বিভাগের প্রভাষক হিসেবে যোগ দিয়ে বাংলাদেশ সিভিল সার্ভিসের (শিক্ষা ক্যাডার) সদস্য পদে কর্মজীবন শুরু করেন। দেশের বেশ কয়েকটি সরকারি কলেজে সুনামের সাথে শিক্ষকতা করেন তিনি।
শিক্ষকতার বাইরেও তিনি সরকারি বিভিন্ন পদে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন। তিনি বাংলাদেশ সরকারের পরিদর্শন ও নিরীক্ষা অধিদপ্তরের উপ-পরিচালক হিসেবে কাজ করেন এবং ইউনেস্কো জাতীয় কমিশনে দায়িত্ব পালন করেন।
১৯৭৯ সালের শেষের দিকে রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের প্রশাসনে তৎকালীন উপ-প্রধানমন্ত্রী এস এ বারীর ব্যক্তিগত সচিব হিসেবে নিযুক্ত হন এবং ১৯৮২ সালে এস এ বারীর পদত্যাগ পর্যন্ত তিনি সেখানে দক্ষতার সাথে দায়িত্ব পালন করেন।

জাতীয় রাজনীতিতে আগমন ও জনপ্রতিনিধিত্ব: ১৯৮৬ সালে তিনি সরকারি চাকরি থেকে ইস্তফা দিয়ে পুরোদমে সক্রিয় রাজনীতিতে আত্মনিয়োগ করেন। ১৯৮৮ সালে নিরপেক্ষ প্রার্থী হিসেবে নির্বাচনে অংশ নিয়ে ঠাকুরগাঁও পৌরসভার চেয়ারম্যান নির্বাচিত হন।
১৯৯০-এর দশকের শুরুতে স্বৈরাচার এরশাদবিরোধী আন্দোলনের উত্তাল সময়ে তিনি বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল-বিএনপিতে যোগ দেন। তাঁর রাজনৈতিক দক্ষতার পরিচয় পেয়ে দল তাঁকে ১৯৯২ সালে ঠাকুরগাঁও জেলা বিএনপির সভাপতি মনোনীত করে।
২০০১ সালের অষ্টম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বিএনপি মনোনীত প্রার্থী হিসেবে ঠাকুরগাঁও-১ আসন থেকে প্রথমবারের মতো সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন।

বিএনপি সরকার গঠন করলে তিনি ২০০১ থেকে ২০০৬ সাল পর্যন্ত সততার সাথে কৃষি মন্ত্রণালয় এবং পরবর্তীতে বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটন মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। পরবর্তী সময়ে ২০০৮ সালের নবম সংসদ নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করলেও তিনি জয়লাভ করতে পারেননি।
বিএনপি এবং দলের শীর্ষ নেতৃত্ব: বিএনপির কেন্দ্রীয় রাজনীতিতেও তিনি ধাপে ধাপে গুরুত্বপূর্ণ স্থান দখল করেন। ২০০৯ সালের ৮ ডিসেম্বর অনুষ্ঠিত দলের ৫ম জাতীয় কাউন্সিলে তাঁকে সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব মনোনীত করা হয়।
২০১১ সালের ২০ মার্চ থেকে তিনি টানা পাঁচ বছর দলের ভারপ্রাপ্ত মহাসচিবের দায়িত্ব সফলতার সাথে পালন করেন। পরবর্তীতে ২০১৬ সালের ৩০ মার্চ মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরকে বিএনপি’র পূর্ণাঙ্গ মহাসচিব ঘোষণা করা হয় এবং ১৩ আগস্ট পর্যন্ত তিনি নিষ্ঠার সাথে এই পদে দায়িত্ব পালন করে গেছেন।

ব্যক্তিগত ও পারিবারিক জীবন: ব্যক্তিগত জীবনে মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর রাহাত আরা বেগমের সাথে বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হন। রাহাত আরা বেগম কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পড়াশোনা শেষ করেছেন এবং বর্তমানে ঢাকার একটি বীমা কোম্পানিতে উচ্চপদে কর্মরত আছেন।
এই দম্পতির দুই কন্যা সন্তান রয়েছেন, মির্জা শামারুহ ও মির্জা সাফারুহ। বড় মেয়ে মির্জা শামারুহ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াশোনা শেষে সেখানেই শিক্ষকতা করেছেন এবং বর্তমানে অস্ট্রেলিয়ায় পোস্ট-ডক্টরাল ফেলো হিসেবে গবেষণারত। ছোট মেয়ে মির্জা সাফারুহও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাক্তন শিক্ষার্থী এবং বর্তমানে ঢাকার একটি স্বনামধন্য শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে শিক্ষকতা করছেন।
ছাত্রনেতা ও শিক্ষক থেকে শুরু করে তৃণমূলের রাজনীতিবিদ, সংসদ সদস্য, প্রতিমন্ত্রী, মন্ত্রী ও বিএনপি মহাসচিব পাঁচ দশকেরও বেশি সময় ধরে বিস্তৃত মির্জা ফখরুলের রাজনৈতিক পথচলা বাংলাদেশের রাজনীতির ইতিহাসের সাথে নিবিড়ভাবে জড়িত। রাষ্ট্রপতি পদে তাঁর এই মনোনয়ন দীর্ঘ রাজনৈতিক জীবনের নতুন এক গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়ের সূচনা করতে যাচ্ছে।
