মানবাধিকার সুরক্ষা জোরদার, জোরপূর্বক গুম প্রতিরোধ এবং সম্পত্তি হস্তান্তরে আজীবন ভোগদখলের অধিকারকে আইনি স্বীকৃতি দিতে জাতীয় সংসদে আজ রোববার তিনটি বিল পাস হয়েছে।
পাস হওয়া বিলগুলো হলো— ‘জাতীয় মানবাধিকার কমিশন বিল, ২০২৬’, ‘জোরপূর্বক গুম প্রতিরোধ ও প্রতিকার বিল, ২০২৬’ এবং ‘সম্পত্তি হস্তান্তর (সংশোধন) বিল, ২০২৬’।
‘জাতীয় মানবাধিকার কমিশন বিল, ২০২৬’-এর মাধ্যমে জাতীয় মানবাধিকার কমিশন আইন, ২০০৯ রহিত করে একটি কার্যকর ও স্বাধীন মানবাধিকার কমিশনের জন্য নতুন আইনি কাঠামো প্রতিষ্ঠা করা হয়েছে।
‘জোরপূর্বক গুম প্রতিরোধ ও প্রতিকার বিল, ২০২৬’-এ জোরপূর্বক গুমের অপরাধের সর্বোচ্চ শাস্তি যাবজ্জীবন কারাদণ্ড নির্ধারণ করা হয়েছে। গুম হওয়া কোনো ব্যক্তি মারা গেলে অথবা পাঁচ বছরের বেশি সময় নিখোঁজ থাকলে অপরাধীর মৃত্যুদণ্ড অথবা যাবজ্জীবন কারাদণ্ড এবং সর্বোচ্চ এক কোটি টাকা জরিমানার বিধান রাখা হয়েছে।
‘সম্পত্তি হস্তান্তর (সংশোধন) বিল, ২০২৬’-এ আজীবন ভোগদখলের অধিকারকে আইনি স্বীকৃতি দেওয়া হয়েছে। এর ফলে নির্দিষ্ট শর্তে সম্পত্তি দান বা হস্তান্তর করলেও দাতা তার জীবদ্দশায় ওই সম্পত্তি ব্যবহার ও ভোগ করার আইনগত অধিকার সংরক্ষণ করতে পারবেন।
আইনমন্ত্রী মো. আসাদুজ্জামান জাতীয় মানবাধিকার কমিশন বিল এবং সম্পত্তি হস্তান্তর (সংশোধন) বিল পাসের জন্য সংসদে উত্থাপন করেন। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ জোরপূর্বক গুম প্রতিরোধ ও প্রতিকার বিল পাসের জন্য সংসদে উপস্থাপন করেন।
মানবাধিকার কমিশন বিল অনুযায়ী, কমিশনে একজন চেয়ারম্যান ও চারজন কমিশনার থাকবেন। কমিশনে অন্তত একজন নারী এবং জাতীয় সংখ্যালঘু সম্প্রদায় অথবা সুবিধাবঞ্চিত জনগোষ্ঠীর অন্তত একজন সদস্য রাখার বিধান করা হয়েছে।
বাছাই কমিটির সুপারিশের ভিত্তিতে জাতীয় সংখ্যালঘু ও সুবিধাবঞ্চিত জনগোষ্ঠীর যোগ্য প্রার্থীদের অগ্রাধিকার দেওয়া হবে। বাছাই কমিটিতে বিশ্ববিদ্যালয়ের একজন অধ্যাপক, নাগরিক সমাজের একজন প্রতিনিধি এবং সংশ্লিষ্ট সম্প্রদায়ের প্রতিনিধিরা থাকবেন।

বিলে কমিশনের এখতিয়ার স্পষ্ট করা এবং অভিযোগ দায়েরের প্রক্রিয়া সহজ করার বিধান রাখা হয়েছে। তদন্ত চলাকালে ভুক্তভোগীকে তাৎক্ষণিক হুমকি থেকে সুরক্ষা এবং আরও ক্ষতি প্রতিরোধে কমিশনকে অন্তর্বর্তীকালীন আদেশ দেওয়ার ক্ষমতাও দেওয়া হয়েছে।
জাতিসংঘের নির্যাতনবিরোধী কনভেনশনের ঐচ্ছিক প্রটোকলের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে একটি ‘ন্যাশনাল প্রিভেন্টিভ মেকানিজম’ ইউনিট প্রতিষ্ঠার বিধানও রাখা হয়েছে। এই ইউনিট নির্যাতন, হেফাজতে মৃত্যু ও জোরপূর্বক গুম প্রতিরোধে কাজ করবে।
জোরপূর্বক গুম প্রতিরোধ ও প্রতিকার বিলে জোরপূর্বক গুমকে আমলযোগ্য, অজামিনযোগ্য ও আপস-অযোগ্য অপরাধ হিসেবে সংজ্ঞায়িত করা হয়েছে। অপরাধ প্রতিরোধ, বিচার, নিখোঁজ ব্যক্তিদের সন্ধান এবং ভুক্তভোগী ও তাদের পরিবারের সুরক্ষার জন্য এতে একটি পূর্ণাঙ্গ আইনি কাঠামো রাখা হয়েছে।
বিল অনুযায়ী, কোনো সরকারি কর্মচারী বা আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্য সরকারি কর্তৃপক্ষ বা বাহিনীর অনুমোদন, সহায়তা বা সম্মতিতে কোনো ব্যক্তিকে গ্রেপ্তার, আটক, অপহরণ বা অন্য কোনোভাবে তার স্বাধীনতা হরণ করার পর তা অস্বীকার করলে অথবা ওই ব্যক্তির অবস্থান, অবস্থা বা পরিণতি গোপন করলে এবং এর মাধ্যমে তাকে আইনি সুরক্ষা থেকে বঞ্চিত করলে তা জোরপূর্বক গুম হিসেবে গণ্য হবে।
নিখোঁজ ব্যক্তিদের সন্ধানে আদালত তল্লাশি পরোয়ানা জারি করতে পারবেন। অনুপস্থিতিতে বিচার, ডিজিটাল প্রমাণ গ্রহণ এবং সাক্ষী, অভিযোগকারী, হুইসেলব্লোয়ার ও ভুক্তভোগীদের সুরক্ষার বিধানও রাখা হয়েছে।
ভুক্তভোগী ও তার পরিবারের তদন্তের অগ্রগতি সম্পর্কে তথ্য পাওয়ার, ঘটনার সত্যতা জানার এবং নিখোঁজ ব্যক্তির অবস্থান বা পরিণতি সম্পর্কে জানার অধিকার থাকবে।
বিলে একটি বিশেষ তহবিলের মাধ্যমে রাষ্ট্রীয় অর্থায়নে আইনি সহায়তা, চিকিৎসা, পুনর্বাসন ও ক্ষতিপূরণের ব্যবস্থা রাখা হয়েছে। দোষী সাব্যস্ত ব্যক্তির সম্পদ থেকে ক্ষতিপূরণের অর্থ আদায় করা হবে। তা সম্ভব না হলে রাষ্ট্র ওই ব্যয় বহন করবে।
নিখোঁজ ব্যক্তির স্বামী বা স্ত্রী এবং নির্ভরশীল পরিবারের সদস্যদের জীবনধারণ ও প্রয়োজনীয় ব্যয় নির্বাহের জন্য তার সম্পত্তি ব্যবহারের সুযোগ দেওয়া হয়েছে। পাঁচ বছর পর উত্তরাধিকার সংক্রান্ত বিষয় নিষ্পত্তির সুবিধার্থে নিখোঁজ সনদ দেওয়ার বিধান রয়েছে।
এছাড়া জোরপূর্বক গুমের ঘটনায় একটি কেন্দ্রীয় তথ্যভান্ডার প্রতিষ্ঠা এবং আন্তর্জাতিক সহযোগিতার ব্যবস্থাও রাখা হয়েছে। তদন্ত ও বিচার—উভয় কার্যক্রমই সর্বোচ্চ ১২০ দিনের মধ্যে সম্পন্ন করার বিধান করা হয়েছে।
তবে বিলে কোনো স্বাধীন তদন্তকারী সংস্থা প্রতিষ্ঠা করা হয়নি। জোরপূর্বক গুমের মামলার তদন্তের দায়িত্ব পুলিশের কাছেই রাখা হয়েছে।
অন্যদিকে, সম্পত্তি হস্তান্তর (সংশোধন) বিলের মাধ্যমে ১৮৮২ সালের সম্পত্তি হস্তান্তর আইন সংশোধন করে আজীবন ভোগদখলের অধিকারকে আইনি স্বীকৃতি দেওয়া হয়েছে। সংশোধিত আইনে বাবা-মা, দাদা-দাদি, নানা-নানি এবং অন্যান্য যোগ্য দাতারা নির্দিষ্ট রক্তসম্পর্কীয় ব্যক্তি বা স্বামী-স্ত্রীর কাছে সম্পত্তি হস্তান্তর করেও জীবদ্দশায় তা ব্যবহার ও ভোগ করার আইনগত অধিকার রাখতে পারবেন।
এ জন্য নতুন ১২২এ ও ১২২বি ধারা সংযোজন করা হয়েছে। এসব ধারার মাধ্যমে আজীবন ভোগদখলের অধিকার সংরক্ষণ করে সম্পত্তি দানকে পৃথক ধরনের সম্পত্তি হস্তান্তর হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়া হয়েছে। বিধানটি সব ধর্মের মানুষের ক্ষেত্রে সমভাবে প্রযোজ্য হবে।
নতুন এই ব্যবস্থা প্রচলিত দান, মুসলিম আইনের অধীনে হেবা বা সম্পত্তি হস্তান্তরের অন্যান্য স্বীকৃত আইনগত পদ্ধতিকে প্রভাবিত করবে না এবং বিদ্যমান ব্যবস্থার সঙ্গেও সাংঘর্ষিক হবে না।
বিল তিনটি গত ২৭ আগস্ট জাতীয় সংসদে উত্থাপন করা হয়। পরে সংশ্লিষ্ট সংসদীয় স্থায়ী কমিটিতে পাঠিয়ে দুই কার্যদিবসের মধ্যে প্রতিবেদন দেওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়। পরবর্তীতে আইন ও স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত সংসদীয় স্থায়ী কমিটি দুটি বিলের কিছু বিষয়ে পরিবর্তনের সুপারিশ করে।
অন্তর্বর্তী সরকারের জারি করা বেশ কয়েকটি অধ্যাদেশের মেয়াদ শেষ হওয়ার প্রেক্ষাপটে বিল তিনটি পাস করা হলো। সংবিধান নির্ধারিত সময়ের মধ্যে সংসদের অনুমোদন না পাওয়ায় মানবাধিকার, গণভোট ও জোরপূর্বক গুমসহ বিভিন্ন বিষয়ে জারি করা ২০টি অধ্যাদেশের আইনগত কার্যকারিতা ইতোমধ্যে শেষ হয়েছে।
উত্তরাধিকারসূত্রে পাওয়া ১৩০০ প্রকল্পে অনিয়ম খতিয়ে দেখছে সরকার
মাটিতে মিশে গেছে চীন-নেপাল সীমান্তে সেই স্থলবন্দর!
জার্মানি আবার যুদ্ধের প্রস্তুতি নিচ্ছে, সতর্ক করলেন লাভরভ
হানাহানি নয়, রাজনীতিতে শান্তি-সমঝোতার পরিবেশ চান রাষ্ট্রপতি
বাংলাদেশ ২০১০ থেকে ২০২৪ পর্যন্ত ৮১.৮৩ বিলিয়ন ডলার ঋণ নিয়েছে: অর্থমন্ত্রী