অনেক নাটকীয়তার পর অবশেষে মন্ত্রিসভা থেকে পদত্যাগের সিদ্ধন্ত নিয়েছেন মুক্তিযোদ্ধা মন্ত্রনালয়ের প্রতিমন্ত্রী ইশরাক হোসেন। কিছুক্ষণের মধ্যে জাতীয় প্রেসক্লাবে সংবাদ সম্মেলন করে তিনি নিজেই এই ঘোষণা দেবেন বলে এক ফেসবুক স্ট্যাটাসে জানিয়েছেন তিনি।
সম্প্রতি রাজধানীর গেন্ডারিয়ায় পিস্তল উঁচিয়ে মাদকবিরোধী অভিযানের নামে প্রকাশ্যে মহড়া এবং সাধারণ মানুষকে হুমকির অভিযোগে দেশজুড়ে তীব্র সমালোচনার মুখে পড়ার পর মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রীর পদ থেকে সরে দাঁড়ানোর সিদ্ধান্ত নেন ইশরাক হোসেন।
সোমবার দুপুর ২টায় জাতীয় প্রেসক্লাবে এক জনাকীর্ণ সংবাদ সম্মেলনে পদত্যাগের আনুষ্ঠানিক ও চূড়ান্ত ঘোষণা দেবেন বলে তিনি নিজেই নিশ্চিত করেছেন।
সোমবার সকাল সাড়ে আটটার দিকে নিজের ভেরিফায়েড ফেসবুক পেজে দেওয়া এক বিস্তারিত পোস্টে ইশরাক হোসেন এ তথ্য জানান। পোস্টে তিনি লেখেন, আজ (সোমবার) দুপুর ২টায় জাতীয় প্রেসক্লাবে মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী পদ থেকে পদত্যাগের চূড়ান্ত ঘোষণা দেব এবং সাংবাদিকদের মুখোমুখি হব, ইনশাআল্লাহ।
ফেসবুক বার্তায় সমালোচকদের তোপ দেগে তিনি আরও লেখেন, ফেসবুকে কিছু সুশীল মানুষকে উল্লাসসূচক লেখালেখি করতে দেখলাম। আশা করি, ভবিষ্যতে আন্দোলন-সংগ্রামের প্রয়োজন হলে তাঁরা জাতীয়তাবাদী আদর্শে অনুপ্রাণিত হয়ে বিদেশ থেকে দেশে এসে সেই আন্দোলনে যোগ দেবেন।

মন্ত্রিত্ব গেলেও মাঠের রাজনীতি ও সমাজসেবা চালিয়ে যাওয়ার প্রত্যয় ব্যক্ত করে তিনি লেখেন, "এবার সংসদ সদস্য বা প্রতিমন্ত্রী হিসেবে নয়, একজন বিএনপি কর্মী হিসেবে মাদকের বিরুদ্ধে শতগুণ বেশি উদ্দীপনা নিয়ে কাজ করব, ইনশাআল্লাহ। পরিচ্ছন্নতা কর্মসূচি আরও জোরদার হবে। দেশব্যাপী প্রজন্ম দলের সাংগঠনিক শক্তি বৃদ্ধির লক্ষ্যে বিভিন্ন জেলা সফর করতে পারব। মন্ত্রী নয়, মাদক নির্মূল! মাদক নির্মূল, মাদক নির্মূল!
এর আগে রোববার সরকার ও বিএনপির উচ্চপর্যায়ের একাধিক নির্ভরযোগ্য সূত্র নিশ্চিত করে, প্রকাশ্যে অস্ত্র উঁচিয়ে বিতর্কের জন্ম দেওয়ায় মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক প্রতিমন্ত্রী ইশরাক হোসেনকে মন্ত্রিসভা থেকে পদত্যাগের স্পষ্ট নির্দেশ দেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান।
রোববার বিকেলে সচিবালয়ে মন্ত্রিসভার বৈঠক শেষে ইশরাককে ডেকে পাঠিয়ে প্রধানমন্ত্রী সরাসরি এই নির্দেশ দেন। যদিও ওই দিন রাতেই প্রতিমন্ত্রীর প্রেস কর্মকর্তা মাহফুজ কবির মুক্তা সংবাদ বিজ্ঞপ্তির মাধ্যমে পদত্যাগের খবরটিকে ‘গুজব ও বিভ্রান্তিকর’ বলে দাবি করেছিলেন, তবে সোমবার সকালে ইশরাকের নিজস্ব ঘোষণার মাধ্যমে সরকারের কঠোর অবস্থানের বিষয়টি স্পষ্ট হয়।
ঘটনার পেছনের চিত্র: ঘটনার সূত্রপাত গত শনিবার (১৭ অক্টোবর) বিকেলে। ঢাকা-৬ আসনের সংসদ সদস্য ও তৎকালীন প্রতিমন্ত্রী ইশরাক হোসেন গেন্ডারিয়া রেলস্টেশনসংলগ্ন দয়াগঞ্জ গুন্টিঘর রেলগেট এলাকায় নিজস্ব অনুসারীদের নিয়ে একটি ‘মাদকবিরোধী অভিযান’ চালাতে যান।
ইশরাকের নিজস্ব ফেসবুক পেজে প্রচারিত ফুটেজে দেখা যায়, গাড়ি থেকে নেমেই তিনি প্রকাশ্যে হাতে লাইসেন্সকৃত পিস্তল উঁচিয়ে বিকট শব্দে ‘এই ধর ধর ধর...’ বলে চিৎকার করছেন। তাঁর সঙ্গে থাকা সশস্ত্র দেহরক্ষী ও অনুসারীদের একজনকে বলতে শোনা যায়, ‘একেবারে গুলি করে দেব।’ এ সময় আতঙ্কিত মানুষকে আকুতি জানিয়ে বলতে শোনা যায়, ‘স্যার, আমি কিছু করিনি। আমি গরিব মানুষ, স্যার।
ভিডিওটি সামাজিক মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ার পর নাগরিক সমাজ, আইনজীবী ও প্রশাসনের মধ্যে ব্যাপক তোলপাড় ও ক্ষোভের সৃষ্টি হয়। স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের আগ্নেয়াস্ত্র নীতিমালার স্পষ্ট লঙ্ঘন করে জনমনে আতঙ্ক ছড়ানোর অভিযোগ ওঠে। পরবর্তীতে ডিএমপির গোয়েন্দা বিভাগ (ডিবি) ঘটনাটি তদন্তের নির্দেশ দেয়। ওয়ারী বিভাগের উপকমিশনারকে আইনি ব্যত্যয় খতিয়ে দেখার দায়িত্ব দেওয়া হয়।
সরকার ও দলে অস্বস্তি: সরকারের মাত্র কয়েক মাসের মাথায় একজন প্রতিমন্ত্রীর এমন অসংবেদনশীল ও আইন হাতে তুলে নেওয়ার আচরণে চরম বিব্রতকর পরিস্থিতিতে পড়ে ক্ষমতাসীন দল বিএনপি ও সরকার। এর আগে গত ২৫ সেপ্টেম্বর মিরপুরে রাড্ডা স্বাস্থ্যসেবা কেন্দ্রে হামলার ঘটনায় নাম আসায় বিএনপির সংরক্ষিত নারী আসনের সংসদ সদস্য ফেরদৌসী আহমেদ মিষ্টিকে পদত্যাগের নির্দেশ দিয়েছিলেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান; ১ অক্টোবর মিষ্টি স্পিকারের কাছে পদত্যাগপত্র জমা দেন।
মিষ্টির পদত্যাগের আড়াই সপ্তাহের মাথায় এবার প্রকাশ্যে অস্ত্র প্রদর্শনের অভিযোগে প্রতিমন্ত্রী ইশরাক হোসেনকেও মন্ত্রিসভা ছাড়ার নির্দেশ দিলেন প্রধানমন্ত্রী, যা সরকারের ভেতরে অপরাধ ও শৃঙ্খলাভঙ্গের বিরুদ্ধে কঠোর বার্তারই ইঙ্গিত দেয়।
পদত্যাগের গুঞ্জন নিয়ে যা বললেন ইশরাক হোসেন
ইশরাকের পদত্যাগের খবর সম্পূর্ণ ভিত্তিহীন-গুজব