ঐতিহাসিক জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের বীর শহীদদের অমর স্মৃতি সংরক্ষণ এবং স্বৈরাচারবিরোধী সংগ্রামের চেতনাকে চির অম্লান করে রাখতে রাজধানীর ওসমানী উদ্যানে নির্মিত দৃষ্টিনন্দন ‘জুলাই স্মৃতিস্তম্ভ’ উদ্বোধন করেছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। একই সাথে তিনি আধুনিক নাগরিক বিনোদনকেন্দ্র হিসেবে নতুন রূপ পাওয়া পুরো ওসমানী উদ্যানের নতুন রূপের আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন করেন।
সোমবার সকাল ১০টায় প্রধানমন্ত্রী অনুষ্ঠানস্থলে পৌঁছান। উদ্বোধনের এই বিশেষ মুহূর্তে প্রধানমন্ত্রী কোনো প্রথাগত আনুষ্ঠানিকতায় সীমাবদ্ধ না থেকে জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের আত্মদানকারী শহীদদের পরিবারের সদস্যদের সরাসরি পাশে টেনে নেন।

শহীদ আবু সাঈদের বাবা মো. মকবুল হোসেন, মীর মাহফুজুর রহমান মুগ্ধের বাবা মোস্তাফিজুর রহমান, শাহারিয়ার খাঁন আনাসের মা সানজিদা খান দীপ্তি এবং ওয়াসিম আকরামের বাবা মোহাম্মদ শফিউল আলমকে সঙ্গে নিয়ে তিনি স্মারক স্তম্ভের ফলক উন্মোচন করেন। উদ্বোধন শেষে স্মৃতিস্তম্ভ প্রাঙ্গণে প্রধানমন্ত্রী একটি বৃক্ষরোপণ করেন এবং নবসজ্জিত উদ্যান ও সেখানে নবস্থাপিত গ্রন্থাগার ঘুরে দেখেন।
অনুষ্ঠানে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ, স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায়মন্ত্রী আবদুল মঈন খান, প্রতিমন্ত্রী মীর শাহে আলম, প্রধানমন্ত্রীর মুখ্য সচিব এ বি এম আব্দুস সাত্তার, ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের প্রশাসক আবদুস সালাম এবং ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের প্রশাসক শফিকুল ইসলাম খান মিল্টনসহ গণ্যমান্য ব্যক্তিরা উপস্থিত ছিলেন।

স্মৃতিস্তম্ভের বিশেষত্ব ও স্থাপত্যশৈলী: প্রায় এক একর চত্বরজুড়ে মাথা তুলে দাঁড়িয়েছে ৯০ ফুট উঁচু এই ‘জুলাই স্মৃতিস্তম্ভ’। সর্বাধুনিক লেজার কাটিং প্রযুক্তির মাধ্যমে স্তম্ভের গায়ে খোদাই করে তুলে ধরা হয়েছে গণ-অভ্যুত্থানের ৮৩৪ জন বীর শহীদের নাম।
আর মূল স্তম্ভের ঠিক সামনেই তৈরি করা হয়েছে ২০টি শুভ্র প্রতীকী সমাধিফলক। স্তম্ভটির বাইরের অংশে ১৬৩ ফুট দীর্ঘ ও সাড়ে ৪ ফুট উঁচু এবং ভেতরের অংশে ১৭১ ফুট দীর্ঘ ও সাড়ে ৭ ফুট উঁচু বিশাল রিলিফ ভাস্কর্য খোদাই করা রয়েছে।

এই ভাস্কর্যের শিল্পরূপ ধরে ফুটিয়ে তোলা হয়েছে বাঙালির স্বাধীনতা ও স্বাধিকারের দীর্ঘ ইতিহাস। এতে ১৯৫২ সালের মহান ভাষা আন্দোলন, ১৯৬৯-এর গণ-অভ্যুত্থান, ১৯৭১ সালের রক্তক্ষয়ী মুক্তিযুদ্ধ এবং ১৯৯০-এর স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলনের ধারাবাহিকতায় ২০২৪ সালের জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের বীরত্বগাথা স্থান পেয়েছে।
সবুজ ও আধুনিক রূপে ঐতিহাসিক ওসমানী উদ্যান: পুরান ও নতুন ঢাকার মিলনস্থলে অবস্থিত ২৩ একরের বিশাল ওসমানী উদ্যানটিকে এক সুসংহত সবুজ ও পরিবেশবান্ধব নাগরিক প্রাঙ্গণ হিসেবে রূপ দেওয়া হয়েছে। পুরোনো দীঘি বা জলাশয়টি সংস্কারের পাশাপাশি নতুন করে আরও পাঁচটি নান্দনিক জলাশয় যুক্ত করা হয়েছে।

পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষায় উদ্যানের পুরোনো গাছপালা অক্ষুণ্ণ রেখেই চার পাশে সবুজ দ্বীপ সাজানো হয়েছে। দর্শনার্থীদের সুবিধার্থে তৈরি করা হয়েছে ৩.১ কিলোমিটার দীর্ঘ ওয়াকওয়ে বা হাঁটার পথ, খোলামেলা ব্যায়ামাগার, বিশ্রামাগার, সুন্দর প্যাগোডা, গণ-শৌচাগার ও গাড়ি পার্কিংয়ের সুব্যবস্থা।
এর পাশাপাশি দুই স্তরে সাজানো উদ্যানটিতে সড়ক থেকে দুই মিটার উঁচুতে একটি বিশেষ ওভারপাস ওয়াকওয়ে তৈরি করা হয়েছে। ওয়াটার হারভেস্টিং প্রযুক্তিতে এখানে যুক্ত করা হয়েছে ৫০ হাজার লিটার ধারণক্ষমতার বিশালাকার বৃষ্টির পানি সংরক্ষণ ব্যবস্থা, যা পরিবেশবান্ধব নগর ব্যবস্থার এক উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত।
