বাংলাদেশের রাজনীতির আকাশে ঝড়ঝাপটা এসেছে বারবার, বদলেছে স্রোত। কিন্তু প্রতিকূলতার উত্তাল সমুদ্রে যে কজন রাজনৈতিক কাণ্ডারী নিজেদের নীতি, ধৈর্য আর ত্যাগের মহিমায় অটল থেকেছেন, তাদের অগ্রভাগে মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর। পাঁচ দশকেরও বেশি সময় ধরে বিস্তৃত এক দীর্ঘ, পথবন্ধুর ও বৈচিত্র্যময় রাজনৈতিক পথচলা শেষে তিনি আজ দেশের ২৩তম রাষ্ট্রপতি হতে যাচ্ছেন।
দীর্ঘ ৩৫ বছর পর জাতীয় সংসদের সদস্যদের প্রত্যক্ষ ভোটে বাংলাদেশের রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের কার্যক্রম এরিমধ্যে শুরু হয়েছে। জাতীয় সংসদের অধিবেশন কক্ষে দুপুর ২টা থেকে বিকেল ৫টা পর্যন্ত এ নির্বাচনের ভোটগ্রহণ অনুষ্ঠিত হবে। রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে দু’জন প্রার্থী প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন। তারা হলেন- বিএনপি মনোনীত প্রার্থী দলটির সাবেক মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর এবং জামায়াতের নেতৃত্বাধীন ১১ দলীয় ঐক্যের প্রার্থী এলডিপি চেয়ারম্যান অলি আহমদ।
প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান গত ১৩ আগস্ট আনুষ্ঠানিকভাবে তাঁকেই বিএনপির রাষ্ট্রপতি প্রার্থী হিসেবে ঘোষণা করেছেন। এই মনোনয়ন শুধু একটি পদের প্রাপ্তি নয়; এটি দলের চরম সংকটকালে এক রাজপথের সৈনিকের প্রতি ইতিহাস ও গণমানুষের ভালোবাসার এক পরম স্বীকৃতি।

ছাত্রনেতা ও শিক্ষক থেকে রাজপথের নির্ভীক কাণ্ডারী
১৯৪৮ সালের ২৬ জানুয়ারি ঠাকুরগাঁওয়ের ঐতিহ্যবাহী রাজনৈতিক পরিবারে জন্ম মির্জা ফখরুলের। পিতা মির্জা রুহুল আমিন ছিলেন রাজনীতিবিদ ও সাবেক সংসদ সদস্য। তবে ফখরুলের রাজনীতি কোনো উত্তরসূরির সুসজ্জিত পথ ধরে আসেনি। ষাটের দশকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে অর্থনীতি পড়ার সময় বামপন্থী ছাত্র সংগঠন পূর্ব পাকিস্তান ছাত্র ইউনিয়নের মাধ্যমে তাঁর চেতনার বিকাশ। ১৯৬৯-এর ঐতিহাসিক গণঅভ্যুত্থানের উত্তাল দিনে তিনি ছিলেন ছাত্র ইউনিয়নের ঢাবি শাখার সভাপতি।
শিক্ষাজীবন শেষে ঢাকা কলেজে অর্থনীতির শিক্ষকতা দিয়ে শুরু হয়েছিল তাঁর পেশাগত জীবন। পরবর্তীতে সিভিল সার্ভিসে যোগ দিয়ে রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের সময় উপ-প্রধানমন্ত্রীর একান্ত সচিব হিসেবেও দায়িত্ব সামলেছেন। কিন্তু দেশের রক্তক্ষরণ এবং গণতন্ত্রের হাহাকার তাঁকে চার দেয়ালের নিরাপদ চাকরিতে আটকে রাখতে পারেনি। ১৯৮৬ সালে সরকারি চাকরি ছেড়ে তিনি ফেরেন জনতার মাঝে। ১৯৮৮ সালে স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে ঠাকুরগাঁও পৌরসভার চেয়ারম্যান নির্বাচিত হয়ে যে তৃণমূল রাজনীতির সূচনা, ৯০-এর দশকে এরশাদবিরোধী আন্দোলনের মুখে তা এসে মিশে যায় বিএনপির মূল স্রোতে।

অশ্রু, কারা নির্যাতন ও ‘ওয়ান ম্যান আর্মি’র লড়াই
দলের জ্যেষ্ঠ যুগ্ম মহাসচিব থেকে শুরু করে কৃষক দলের রূপকার, ২০০১ সালে ঠাকুরগাঁও-১ আসন থেকে সংসদ সদস্য এবং পরবর্তী সময়ে কৃষি ও বেসামরিক বিমান পরিবহন প্রতিমন্ত্রীর দায়িত্ব- সবখানেই তিনি রেখেছিলেন দক্ষতা ও পরিচ্ছন্নতার ছাপ। তবে মির্জা ফখরুলের আসল পরীক্ষা শুরু হয় এক-এগারোর পটপরিবর্তন এবং পরবর্তী দীর্ঘ দেড় দশকেরও বেশি সময় ধরে চলা দমন-পীড়নের কঠিন সময়ে।
যখন দলের চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়া কারাগারে বন্দী এবং জ্যেষ্ঠ ভাইস চেয়ারম্যান তারেক রহমান নির্বাসনে থেকে দূর থেকে দল সামলাচ্ছেন, তখন দেশের মাটিতে সব আঘাত বুক পেতে নেওয়ার জন্য যিনি একা দাঁড়িয়েছিলেন, তিনি মির্জা ফখরুল। ফ্যাসিবাদের রক্তচক্ষু, একের পর এক মিথ্যা মামলা, বারবার রাজপথ থেকে গ্রেপ্তার হয়ে জেলখানার অন্ধকার প্রকোষ্ঠে বন্দি হওয়া, কোনো কিছুই তাঁর মনোবল ভাঙতে পারেনি। শত ঝড়ঝাপটার মধ্যেও তিনি শান্ত, ধৈর্যশীল ও ইতিবাচক গলায় গণমাধ্যমের সামনে এসে দলকে সুসংগঠিত রেখেছেন। শত শত কর্মীর মামলায় আদালতে চত্বরে ছুটে যাওয়া আর কেঁদে ফেলা সেই মির্জা ফখরুলই ছিলেন দলের প্রতিটি কর্মীর নির্ভরতার শেষ আশ্রয়স্থল।

ত্যাগের মহান প্রতিদান ও রাষ্ট্রপতির সর্বোচ্চ মর্যাদা
২০১৬ সালে দলের মহাসচিব নির্বাচিত হওয়ার পর থেকে দলের রাজনৈতিক অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখতে তিনি যে ঐতিহাসিক নেতৃত্ব দিয়েছেন, তা বাংলাদেশের রাজনীতিতে বিরল। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের নেতৃত্বাধীন নতুন সরকারের আমলে সংসদে প্রধানমন্ত্রী নিজেই নিজ আসনটি রেখেছেন এই দীর্ঘদিনের অভিভাবকের পাশে। আর আজ, জীবনের ৭৮তম বছরে দাঁড়িয়ে তৃণমূল থেকে উঠে আসা এই প্রবীণ রাজনীতিক যখন বঙ্গভবনের দিকে পা বাড়াচ্ছেন, তখন তা যেন প্রতিটি নিঃস্বার্থ রাজপথের কর্মীর বিশ্বাসের জয়।
ব্যক্তিগত জীবনে স্ত্রী রাহাত আরা বেগম এবং দুই কন্যা মির্জা শামারুহ ও মির্জা সাফারুহকে নিয়ে তাঁর ছায়া সুনিবিড় পরিবার। পারিবারিক জীবন ছেড়ে জীবনের বেশিরভাগ সময়ই তিনি বিলিয়ে দিয়েছেন দেশের মানুষের রাজনৈতিক অধিকার আদায়ের লড়াইয়ে। ছাত্র রাজনীতির মাঠ, ক্লাসরুমের ব্ল্যাকবোর্ড, পৌরসভার গলি, জাতীয় সংসদ কিংবা রাজপথের আন্দোলন, সব ধাপ পেরিয়ে মির্জা ফখরুলের এই রাষ্ট্রপতি হওয়ার অভিযাত্রা প্রমাণ করে: ধৈর্য, নিষ্ঠা আর ত্যাগের মূল্য ইতিহাস কোনোদিন ভুলিয়ে দেয় না।
