ভুয়া তথ্য ও সাইবার বুলিং মোকাবিলায় বাস্তবতা ও করণীয়

আপডেট : ১০ আগস্ট ২০২৬, ০১:৫৩ পিএম

ডিজিটাল যুগে তথ্য এখন মানুষের হাতের মুঠোয়। তবে তথ্যপ্রযুক্তির এই অভূতপূর্ব অগ্রগতির পাশাপাশি বৃদ্ধি পেয়েছে ভুয়া খবর (Fake News), বিভ্রান্তিমূলক তথ্য (Disinformation) এবং সাইবার বুলিংয়ের মতো উদ্বেগজনক প্রবণতা। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের মাধ্যমে কয়েক সেকেন্ডের মধ্যে একটি মিথ্যা বা বিকৃত তথ্য লাখো মানুষের কাছে পৌঁছে যেতে পারে। এর ফলে সামাজিক অস্থিরতা, রাজনৈতিক মেরুকরণ, ব্যক্তিগত ক্ষতি এবং মানসিক স্বাস্থ্যসংকট তৈরি হওয়ার ঝুঁকি বাড়ে।

ভুয়া খবর হলো এমন তথ্য, যা বাস্তবতা ও সত্যতার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়। অন্যদিকে, ডিসইনফরমেশন হলো ইচ্ছাকৃতভাবে মিথ্যা বা বিভ্রান্তিকর তথ্য প্রচার করে মানুষকে প্রতারিত করা, প্রভাবিত করা বা ক্ষতিগ্রস্ত করার প্রচেষ্টা। অস্ট্রেলিয়ার সরকারি মূল্যায়নে ডিসইনফরমেশনকে সমাজ, গণতন্ত্র, অর্থনীতি এবং জননিরাপত্তার জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ হুমকি হিসেবে বিবেচনা করা হয়। একইভাবে নির্বাচন, ধর্মীয় সংবেদনশীলতা বা সামাজিক ইস্যুকে কেন্দ্র করে ছড়ানো মিথ্যা তথ্য অনেক সময় সহিংসতা ও সামাজিক অস্থিরতার কারণ হয়ে দাঁড়ায়।


সাইবার বুলিং বলতে ইন্টারনেট, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম, ইমেইল বা মেসেজিং প্ল্যাটফর্ম ব্যবহার করে কাউকে অপমান, হুমকি, হয়রানি অথবা মানসিকভাবে আঘাত করাকে বোঝায়। এর মধ্যে গুজব ছড়ানো, অপমানজনক মন্তব্য করা, ভুয়া ছবি বা তথ্য প্রচার, পরিচয় চুরি এবং ব্যক্তিগত তথ্য প্রকাশের মতো কর্মকাণ্ড অন্তর্ভুক্ত। বিশেষ করে শিশু-কিশোর ও তরুণদের ক্ষেত্রে সাইবার বুলিং মানসিক চাপ, বিষণ্নতা, আত্মবিশ্বাসহীনতা এবং আত্মহত্যার ঝুঁকি পর্যন্ত বাড়িয়ে দিতে পারে। তাই এটি কেবল প্রযুক্তিগত নয়, বরং একটি গুরুতর সামাজিক সমস্যা।

অনলাইন নিরাপত্তা নিশ্চিত করার ক্ষেত্রে অস্ট্রেলিয়া বিশ্বের অন্যতম অগ্রণী দেশ। নাগরিকদের ডিজিটাল নিরাপত্তা সুরক্ষায় দেশটি অনলাইন নিরাপত্তা আইন (Online Safety Act 2021) প্রণয়ন করেছে, যা বিশ্বের অন্যতম আধুনিক ও বিস্তৃত অনলাইন নিরাপত্তা আইন হিসেবে স্বীকৃত। এই আইনের আওতায় ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মগুলোকে ব্যবহারকারীদের সুরক্ষা নিশ্চিত করতে, ক্ষতিকর কনটেন্ট অপসারণ করতে এবং কার্যকর অভিযোগ ব্যবস্থাপনা গড়ে তুলতে বাধ্য করা হয়েছে।

ডিসইনফরমেশন মোকাবিলায় অস্ট্রেলিয়া আইনগত ও নীতিগত উদ্যোগের পাশাপাশি সরকার, বিশ্ববিদ্যালয়, গণমাধ্যম এবং প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানের সমন্বিত অংশগ্রহণ নিশ্চিত করেছে।

ই-সেফটি কমিশনার (eSafety Commissioner) অস্ট্রেলিয়ার অনলাইন নিরাপত্তা ব্যবস্থার কেন্দ্রবিন্দু। অনলাইন নিরাপত্তা আইন এর অধীনে সংস্থাটিকে সাইবার বুলিং, অনলাইন হয়রানি এবং ক্ষতিকর ডিজিটাল কনটেন্টের বিরুদ্ধে পদক্ষেপ নেওয়ার ব্যাপক ক্ষমতা দেওয়া হয়েছে। পাশাপাশি তারা জনসচেতনতা, প্রশিক্ষণ এবং নিরাপদ ইন্টারনেট ব্যবহারে বিভিন্ন নির্দেশনা প্রদান করে।

অস্ট্রেলিয়ান কমিউনিকেশনস অ্যান্ড মিডিয়া অথরিটি (Australian Communications and Media Authority - ACMA) দেশটির ডিজিটাল যোগাযোগ খাতের নিয়ন্ত্রক সংস্থা। এটি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ও ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মগুলোর কার্যক্রম পর্যবেক্ষণ করে এবং Australian Code of Practice on Disinformation and Misinformation বাস্তবায়নে নজরদারি করে। এএপি ফ্যাক্টচেক (AAP FactCheck) স্ট্রেলিয়ার অন্যতম প্রধান স্বাধীন তথ্য যাচাইকারী প্রতিষ্ঠান। এর সাংবাদিক ও গবেষকরা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রচারিত ভাইরাল দাবি, রাজনৈতিক বক্তব্য এবং জনস্বার্থসংশ্লিষ্ট তথ্য যাচাই করে জনগণের সামনে নির্ভরযোগ্য তথ্য উপস্থাপন করেন।


আরএমআইটি ফ্যাক্টল্যাব (RMIT FactLab) গবেষণা ও তথ্য যাচাই কার্যক্রম পরিচালনা করে। Meta-এর সঙ্গে অংশীদারত্বের ভিত্তিতে তারা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া সন্দেহজনক তথ্য যাচাই করে এবং বিভ্রান্তিকর কনটেন্টের বিস্তার কমাতে সহায়তা করে।

ডিজিটাল ইন্ডাস্ট্রি গ্রুপ ইনকরপোরেটেড (DIGI) হলো অস্ট্রেলিয়ার ডিজিটাল শিল্পখাতের একটি গুরুত্বপূর্ণ সংগঠন। Google, Meta, Microsoft, TikTok এবং X-এর মতো আন্তর্জাতিক প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠান এর সদস্য। সংস্থাটি ডিসইনফরমেশন মোকাবিলায় শিল্পখাতভিত্তিক আচরণবিধি প্রণয়ন ও বাস্তবায়নে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।

গুগল (Google) ও মেটা (Meta) বিভিন্ন স্বাধীন ফ্যাক্ট-চেকিং প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে কাজ করে ভুয়া ও বিভ্রান্তিকর তথ্য শনাক্ত এবং নিয়ন্ত্রণে উদ্যোগ গ্রহণ করেছে। তথ্য মিথ্যা প্রমাণিত হলে সেসব কনটেন্টের দৃশ্যমানতা কমিয়ে দেওয়া হয় এবং সতর্কতামূলক বার্তা যুক্ত করা হয়।

বাংলাদেশে ইন্টারনেট ব্যবহারকারীর সংখ্যা দ্রুত বৃদ্ধি পাচ্ছে। এর সঙ্গে পাল্লা দিয়ে বাড়ছে ভুয়া খবর, অনলাইন প্রতারণা এবং সাইবার হয়রানির ঘটনা। এ প্রেক্ষাপটে সরকার সাইবার সিকিউরিটি অ্যাক্ট ২০২৩ প্রণয়ন করেছে, যার লক্ষ্য সাইবার অপরাধ, তথ্য বিকৃতি এবং ডিজিটাল প্রতারণা প্রতিরোধ করা।

তবে কেবল আইন প্রণয়ন করলেই সমস্যার সমাধান সম্ভব নয়। তথ্য যাচাইয়ের সংস্কৃতি এখনও সমাজে ব্যাপকভাবে গড়ে ওঠেনি। একই সঙ্গে শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোতে ডিজিটাল সাক্ষরতা ও মিডিয়া লিটারেসির ঘাটতি থাকায় গুজব এবং বিভ্রান্তিকর তথ্য দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে।

বাংলাদেশ নিম্নোক্ত পদক্ষেপগুলো বিবেচনা করতে পারে:

জাতীয় সাইবার নিরাপত্তা ও সাইবার বুলিং রিপোর্টিং সেল গঠন: অস্ট্রেলিয়ার eSafety Commission-এর আদলে একটি জাতীয় অনলাইন নিরাপত্তা কেন্দ্র প্রতিষ্ঠা করা যেতে পারে, যেখানে নাগরিকরা সহজে অভিযোগ জানাতে পারবেন এবং দ্রুত সহায়তা পাবেন।

স্বাধীন ও শক্তিশালী ফ্যাক্ট-চেকিং নেটওয়ার্ক গড়ে তোলা: গণমাধ্যম, বিশ্ববিদ্যালয়, গবেষণা প্রতিষ্ঠান ও প্রযুক্তি খাতের সমন্বয়ে একটি শক্তিশালী তথ্য যাচাই অবকাঠামো গড়ে তোলা প্রয়োজন।

বিশ্ববিদ্যালয়ভিত্তিক গবেষণা ও তথ্য যাচাই কেন্দ্র প্রতিষ্ঠা: বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে ফ্যাক্ট-চেকিং ও ডিসইনফরমেশন গবেষণাকেন্দ্র গড়ে তোলা হলে তথ্যভিত্তিক নীতি প্রণয়ন এবং জনসচেতনতা বৃদ্ধিতে সহায়ক হবে।

ডিজিটাল সাক্ষরতা ও মিডিয়া লিটারেসি শিক্ষা: স্কুল, কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয়ের পাঠ্যক্রমে তথ্য যাচাই, অনলাইন নিরাপত্তা এবং দায়িত্বশীল ডিজিটাল নাগরিকত্বের বিষয় অন্তর্ভুক্ত করা জরুরি।


অভিভাবক ও শিক্ষকদের সক্ষমতা বৃদ্ধি:অভিভাবক ও শিক্ষকদের জন্য নিয়মিত প্রশিক্ষণ আয়োজনের মাধ্যমে শিশু ও কিশোরদের অনলাইন ঝুঁকি সম্পর্কে সচেতনতা বৃদ্ধি করা প্রয়োজন।

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের জবাবদিহিতা নিশ্চিত করা: Facebook, YouTube, TikTok এবং অন্যান্য প্ল্যাটফর্মকে স্থানীয় ভাষায় দ্রুত অভিযোগ নিষ্পত্তি, ক্ষতিকর কনটেন্ট অপসারণ এবং ব্যবহারকারী সুরক্ষায় আরও কার্যকর ভূমিকা নিতে হবে।

জাতীয় পর্যায়ে জনসচেতনতামূলক প্রচারণা: টেলিভিশন, রেডিও, সংবাদমাধ্যম এবং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ভুয়া খবর শনাক্তকরণ ও সাইবার বুলিং প্রতিরোধে ধারাবাহিক প্রচারণা পরিচালনা করা উচিত।

সমন্বিত বহুপক্ষীয় উদ্যোগ: সরকার, প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠান, গণমাধ্যম, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান এবং সুশীল সমাজের সমন্বিত অংশগ্রহণ ছাড়া এই চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা সম্ভব নয়।

ভুয়া খবর, ডিসইনফরমেশন এবং সাইবার বুলিং কেবল প্রযুক্তিগত সমস্যা নয়; এগুলো সামাজিক স্থিতিশীলতা, গণতান্ত্রিক মূল্যবোধ এবং মানুষের মানসিক সুস্থতার জন্য গুরুতর হুমকি। অস্ট্রেলিয়া আইন, শিক্ষা, প্রযুক্তি, গবেষণা এবং জনসচেতনতার সমন্বিত প্রয়োগের মাধ্যমে এই চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় একটি কার্যকর মডেল তৈরি করেছে।

বাংলাদেশও যদি আইন প্রয়োগের পাশাপাশি ডিজিটাল সাক্ষরতা, তথ্য যাচাই সংস্কৃতি, প্রযুক্তি প্ল্যাটফর্মের জবাবদিহিতা এবং জনসচেতনতা বৃদ্ধিতে গুরুত্ব দেয়, তবে একটি নিরাপদ, দায়িত্বশীল ও তথ্যসমৃদ্ধ ডিজিটাল সমাজ গড়ে তোলা সম্ভব হবে। ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য নিরাপদ সাইবার পরিবেশ নিশ্চিত করা এখন সময়ের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ দাবি।

লেখক ড. নার্গিস বানু অস্ট্রেলিয়া প্রবাসী পরিবেশ বিষয়ক পেশাজীবী, গণমাধ্যমকর্মী, লেখক, মানবাধিকারকর্মী ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক।

 

একাত্তর/এআরএস
হজরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের বাইরের গোলচত্বর এলাকা থেকে গাড়ি ভর্তি ১৪টি স্বর্ণের বার এবং ১২টি স্বর্ণের পাত উদ্ধার করেছে কাস্টমস গোয়েন্দা ও তদন্ত অধিদপ্তর। উদ্ধার করা এই এক হাজার ৮১২...
বিগত ১৭ বছরের অপশাসন ও ফ্যাসিবাদী শাসন দেশকে ঋণ ও আমদানিনির্ভর করে রেখে গেছে বলে মন্তব্য করেছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। তিনি বলেছেন, কোনো একক মন্ত্রণালয় বা বিভাগের পক্ষে টেকসই উন্নয়ন...
ফরাসি ফুটবলের অবিসংবাদিত কিংবদন্তি জিনেদিন জিদান, যার নাম শুনলেই ভেসে ওঠে ১৯৯৮ বিশ্বকাপ জয় থেকে শুরু করে রিয়াল মাদ্রিদের ঐতিহাসিক হ্যাটট্রিক চ্যাম্পিয়ন্স লিগ জয়! কিন্তু সেই কিংবদন্তি বাবার নাম পিঠে...
খেলার মাঠের পারফর্ম্যান্সের পাশাপাশি ব্র্যাণ্ড ভ্যালু দিয়ে বিশ্ব ফুটবলে রাজত্ব করা কিলিয়ান এমবাপে এবার বুট স্পন্সরশিপে এক নজিরবিহীন ও চটকদার পদক্ষেপ নিতে যাচ্ছেন! রিয়াল মাদ্রিদ ও ফরাসি ফরোয়ার্ড...
লোডিং...
সর্বশেষপঠিত

এলাকার খবর