মামলা দিয়ে জেল খাটানোর প্রতিশোধ নিতেই গাইবান্ধার সুন্দরগঞ্জের এমপি মঞ্জুরুল ইসলাম লিটনকে হত্যা করা হয় বলে র্যাবকে জানিয়েছেন সাতক্ষীরার ভোমরা এলাকা থেকে গ্রেপ্তার হওয়া মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত আসামি চন্দন কুমার রায়।
২০১৬ সালে লিটন হত্যার পর থেকেই পালিয়ে ছিলো চন্দন। তাকে গ্রেপ্তারে রেড নোটিশ জারি করেছিলো ইন্টারপোল। লিটন হত্যাকাণ্ডের প্রধান সমন্বয়কারীও ছিলেন এই চন্দন কুমার।
২০১৬ সালে ৩১ ডিসেম্বর গাইবান্ধার সুন্দরগঞ্জে নিজ বাড়িতে গুলি করে হত্যা করা হয় গাইবান্ধা-১ আসনের সাবেক এমপি মঞ্জুরুল ইসলাম লিটকে।
এ ঘটনায় নিহতের ছোট বোন হত্যা মামলা দায়ের করেন। মামলার তদন্তে মূল পরিকল্পনাকারী আবদুল কাদের খানসহ ১৮ জনের বিরুদ্ধে চার্জশীট দাখিল করেন তদন্ত কর্মকর্তা।

হত্যাকাণ্ডের প্রধান সমন্বয়কারী চন্দন কুমার রায় ছাড়া বাকি সাতজনকে গ্রেপ্তার করে আইনশৃংখলা বাহিনীর সদস্যরা।
২০১৯ সালে পলাতক চন্দনসহ সাত জনকে মৃত্যুদণ্ডের রায় দেন আদালত। কিন্তু চন্দন ছিলো ধরাছোঁয়ার বাইরে। তাকে গ্রেফতারে ইন্টারপোলে রেড নোটিশ জারি করা হয়।
অবশেষে রোববার রাতে তাকে সাতক্ষীরার ভোমরা এলাকা থেকে তাকে গ্রেফতার করে র্যাব। পরের দিন এই নিয়ে বিস্তারিত জানান র্যাব কর্মকর্তারা।
সোমবার দুপুরে রাজধানীর কারওয়ান বাজারে র্যাব মিডিয়া সেন্টারে এক সংবাদ সম্মেলনে আসেন র্যাবের লিগ্যাল অ্যান্ড মিডিয়া উইংয়ের পরিচালক কমান্ডার খন্দকার আল মঈন।
তিনি বলেন, গ্রেপ্তার হওয়ার পর জিজ্ঞাসাবাদে চন্দন জানান, সংসদ সদস্য লিটনের প্ররোচনায় চন্দনকে একটি মামলার আসামি বানিয়ে তাকে গ্রেফতার করানো হয়।
ওই মামলায় চন্দন ১৯ দিন জেল খাটেন। তার বিরুদ্ধে থাকা চাঁদাবাজি, নারী নির্যাতনসহ সব মামলা থেকে অব্যাহতি পাওয়ার জন্য তিনি এমপি লিটনের সহযোগিতা চেয়েছিলেন।
কিন্তু এমপি লিটন তাকে আইনগত প্রক্রিয়া অনুসরণ করতে বলেন। এতে এমপি লিটনের প্রতি চন্দনের ক্ষোভের সৃষ্টি হয়। এছাড়াও ২০১৬ সালে চন্দনকে দলীয় পদ থেকে বাদ দেয়া হয়।
এরপর সাবেক সংসদ সদস্য আবদুল কাদের খানের পিএস শামসুজ্জোহার সঙ্গে পরিচয়ের সূত্র ধরে আবদুল কাদের খানের সঙ্গে চন্দনের সখ্য তৈরি হয়।
এদিকে চন্দনের ভগ্নিপতি সুবল রায় এমপি লিটনের বাড়ির দারোয়ান হিসেবে কাজ করতেন। সেই সুবাদে লিটনের চলাফেরার বিষয়ে তথ্য জানা সহজ ছিল চন্দনের।
এমপি লিটনকে হত্যাকাণ্ডের কয়েকটি পরিকল্পনা ভেস্তে যাওয়ায় আবদুল কাদের খান চন্দনের সহযোগিতা চান। নতুন পরিকল্পনার মাধ্যমে লিটনকে হত্যা করা সম্ভব হয় তাদের।
র্যাব কর্মকর্তা আরও বলেন, লিটন হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় চন্দন ছিলেন প্রধান সমন্বয়কারী। তিনি লিটনের গতিবিধি ও অবস্থান সম্পর্কে আবদুল কাদের খান ও তার সহযোগীদের তথ্য দিতেন।
পরিকল্পনা অনুযায়ী, হত্যাকাণ্ডে তাদের সহযোগী মেহেদী, শাহীন, রানা, শামসুজ্জোহা ও ড্রাইভার হান্নান অস্ত্র চালানো ও হত্যাকাণ্ডের পর দ্রুত পালানোর প্রশিক্ষণ নেন।
২০১৬ সালের অক্টোবরে এমপি লিটনের ঢাকা থেকে গাইবান্ধা যাওয়ার তথ্য দেন চন্দন। মাঝ পথে হত্যার পরিকল্পনা নিলেও লিটন গাবতলী এসে ফিরে যাওয়ায় ওই পরিকল্পনা ভেস্তে যায়।
পরে ২০১৬ সালের ডিসেম্বরে তারা লিটনকে তাঁর নিজ বাড়িতেই হত্যার পরিকল্পনা করেন। সেই মোতাবেক ঘটনার দিন চন্দন ও তার চাচাতো ভাই সুবল লিটনের বাড়িতে অবস্থান করেন।
এমপি লিটন কখন কী অবস্থায় থাকেন সেই সংক্রান্ত খবর অন্যান্যদের দিতে থাকেন। ওই দিন বিকেলে লিটন নিজ বাড়িতে একা অবস্থান করছেন, এমন তথ্য হত্যাকারীদের জানান চন্দন।
পরিকল্পনা মোতাবেক হত্যাকারী শাহীন, রানা ও মেহেদী মোটরসাইকেলযোগে এমপি লিটনের বাড়িতে যান এবং নৃশংসভাবে গুলি করে কিলিং মিশন শেষ করেন।
গ্রেপ্তার আসামি চন্দন কুমার রায় ২০১০ সালে ঢাকায় আসেন। রাজধানীর একটি একটি অনলাইন পত্রিকায় সাংবাদিকতা শুরু করেন তিনি।
দুই বছর সাংবাদিকতা করে পুনরায় গাইবান্ধা ফিরে যান এবং সেখানে স্থানীয় রাজনীতিতে যোগ দেন। গাইবান্ধার সুন্দরগঞ্জ থানায় তার বিরুদ্ধে বেশ কয়েকটি মামলা রয়েছে।
এমপি লিটন হত্যাকাণ্ডের পর চন্দন ভারতে পালিয়ে যান। ভারতে তার কাছের আত্মীয়ের মাধ্যমে ‘শাওন রায়’ নামে ভুয়া নাগরিকত্ব বানিয়ে সেদেশেই অবস্থান করতে থাকেন। জড়িয়ে পড়েন মাদক চোরাচালানে। সম্প্রতি মাদক চোরাচালানের কাজে তিনি কিছুদিন ধরেই সাতক্ষীরার সীমান্তবর্তী এলাকা ভোমরায় অবস্থান করছিলেন।
সুনির্দিষ্ট তথ্যের ভিত্তিতে অভিযান চালিয়ে রোববার রাতে ভোমরা এলাকা থেকে চন্দন কুমার রায়কে গ্রেপ্তার করে র্যাব।
একাত্তর/এআর
