অপরিকল্পিত ইট-কংক্রিটের নগরে গাছপালা ও জলাধার কমে যাওয়ায় গরম দিনদিন তীব্র হচ্ছে। দিনের তাপ দ্রুত বের না হওয়ায় রাতেও থাকছে ভ্যাপসা গরম থাকছে। আবহাওয়া ও পরিবেশ বিশেষজ্ঞরা বলছেন, জলাভূমি কিংবা সবুজ কমে যাওয়ায় ঢাকার কিছু এলাকা স্বাভাবিকের চেয়ে বেশি উত্তপ্ত হয়ে পড়ছে। অথচ পাশের জেলাতেই গড় তাপমাত্রা দুই ডিগ্রি কম।
চলছে গ্রীষ্মকাল। আর এই ঋতুতে গরম পড়বে এটাই স্বাভাবিক। তবে বৈশাখের শুরুতে এতোটা গরম পড়ে না, যা পড়ছে গেলো দুই সপ্তাহের বেশি সময় ধরে। ঢাকায় এপ্রিলে ৪০ ডিগ্রির বেশি উত্তাপ গত ছয় দশকেরও বেশি সময়ে দেখা গেছে কেবল দুই বার। অথচ গেলো এক সপ্তাহের মধ্যে কয়েকবারই তাপমাত্রার পারদ ছাড়িয়েছে ৪০ ডিগ্রির ঘর।
এপ্রিল-মে, এই দুই মাস বছরের উষ্ণতম মাস। এ সময় বাংলাদেশে সূর্য তাপ দেয় খাড়াভাবে। ফলে গরম থাকে বেশি। তবে এই সময়টায় তাপমাত্রা ৪০ ডিগ্রি সেলসিয়াস ছাড়িয়ে যাবে, তা দেখা যায় না সচরাচর। আর এবার সেটিই হচ্ছে। চুয়াডাঙ্গার সাথে পাল্লা দিয়ে ঢাকাও তাতাচ্ছে সূর্যের প্রখর তাপে। ঘরে থেকে বের হলেই তীব্র গরমে হাঁসফাঁস, ঘরের ভেতরও গুমোট অবস্থা।
তাপের রেকর্ড ভাঙছে রাজধানী ঢাকাও। তবে রাজধানীতে তাপদাহের চিত্রটা একটু অন্যরকম। কংক্রিটের শহরে ৩৭-৩৮ তাপমাত্রা থাকলেও অনুভূত হচ্ছে ৪২ থেকে ৪৫ ডিগ্রি সেলসিয়াস। অ্যাকু ওয়েদারসহ বিভিন্ন ধরনের আবহাওয়া অ্যাপে প্রবেশ করলে এমন বার্তা শুনিয়ে দিচ্ছে ব্যবহারকারীকে। কিন্তু ঢাকায় এমনটা কেন হচ্ছে, তা জানার চেষ্টা করেছে একাত্তর টিভি।
সেই জন্য গাছে ঘেরা শেরে বাংলা নগরের কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের দুই নম্বর গেটের কাছে তাপমাত্রা পরিমাপ করা হয়। সেখানে তাপমাত্রা যখন ৩৫ দশমিক পাঁচ ডিগ্রি সেলসিয়াস, ওই একই সময়ে আগাঁরগায়ে ৩৯ আর তেজগাঁওতে তাপমাত্রা ছিলো ৪০ ডিগ্রি সেলসিয়াস। অর্থাৎ, ঢাকার একেক এলাকায় একেক রকম তাপমাত্রা বিরাজ করছে। আর সেটি শুধুমাত্র গাছের কারণে।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, মূলত ঢাকায় জলাভূমি কমে যাওয়া এবং গাছপালা কম থাকায় গরমের অনুভূতি প্রকৃত তাপমাত্রার চেয়ে বেশি। রাজধানীতে সবুজ কমে গিয়ে এখন কংক্রিট বেশি। দিনের বেলা সূর্য কিরণ কংক্রিটের জঞ্জালে শোষিত হয়ে পুরো এলাকা উত্তপ্ত হয়ে ওঠে। একই সাথে এ বছর দখিনা বাতাস কম। সব মিলিয়ে এতো তীব্র গরম অনুভূত হচ্ছে।
বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব প্ল্যানার্সের (বিআইপি) সমীক্ষা অনুযায়ী, ১৯৯৯ সালে ঢাকা শহরের ৬৫ শতাংশ কংক্রিট বা অবকাঠামোতে আচ্ছাদিত ছিল। ২০১৯ সালে তা বেড়ে হয় প্রায় ৮২ শতাংশ। এই সময়ে জলাশয় ও খোলা জায়গা প্রায় ১৪ শতাংশ থেকে কমে ৫ শতাংশের নিচে নেমেছে। যে কারণে ঢাকার তাপমাত্রা দেশের অন্যান্য অঞ্চলের তুলনায় বেশি থাকছে।
একটা সময় ঢাকায় প্রাকৃতিক উপায়ে তাপমাত্রা নিয়ন্ত্রিত হতো। চারদিক ঘিরে ছিলো ছয় নদীসহ অসংখ্য খাল ও জলাশয়। কিন্তু সব জলাভূমি ধ্বংস হয়ে যাওয়ায় এখন শহরে ভবনের ভেতর শীতাতপনিয়ন্ত্রণ যন্ত্র বা এসি ছাড়া অন্য কোনো উপায়ে তাপমাত্রা কমানো যাচ্ছে না। এসি ব্যবহারের ফলে তাপমাত্রা আরও বাড়ছে। বেড়েছে যানবাহনের সংখ্যাও।
ফলে তাপমাত্রা শোষিত না হয়ে প্রতিফলিত হচ্ছে বেশি। এতে রাজধানীর বাতাস উষ্ণই থেকে যাচ্ছে। আবহাওয়াবিদরা বলছেন, রাজধানীতে পুকুর-জলাশয় ভরাট করে, গাছ কেটে ভবন ও অবকাঠামো নির্মাণ করায় গরম বেড়েই চলেছে। এর সাথে যুক্ত হয়েছে জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব। এর থেকে বাঁচতে জলাশয়, গাছপালা রক্ষার বিকল্প নেই।
কংক্রিটের ভবন থেকে তাপ দ্রুত বের না হওয়ায় রাতের বেলাতেও গরমের অনুভূতি থাকছে দিনের মতোই। তাই ঘরের মধ্যে থাকলেও অস্বস্তি থেকেই যাচ্ছে। ভ্যাপসা গরমের অনুভূতি আরও বেশি অসহনীয়। চির চির করে ঘাম বের হতেই থাকে। সারাক্ষণ ফ্যানের নিচে বা এসির ভেতরে থাকতে হচ্ছে। সব মিলিয়ে হাঁসফাঁস অবস্থা।
জলবায়ু পরিবর্তনও গড় তাপমাত্রা বাড়ার অন্যতম একটি কারণ। আবহাওয়াবিদরা বলছেন, তিন কারণে এবারের তাপপ্রবাহের মাত্রা অন্যান্য বছরের চেয়ে বেশি। যার একটি হলো জলীয় বাষ্প অস্বাভাবিক থাকা, দক্ষিণ-পূর্ব মৌসুমি বায়ু কম আসা ও সাগরে কোনো ঘূর্ণিঝড়ের প্রক্রিয়া সৃষ্টি না হওয়া। এসব কারণে জলীয় বাষ্পও খুব কম। ফলে গরম বেশি অনুভূত হবে।
আরও পড়ুন: ঢাকায় তাপমাত্রা ৪৫ ডিগ্রি পর্যন্ত অনুভূত
পশ্চিমা মৌসুমি বায়ু হচ্ছে শুকনো। এটার সঙ্গে দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চলীয় বায়ু যেখানে যেখানে মেশে সেখানে কালবৈশাখীর সৃষ্টি হয়। সেটা হচ্ছে না। কেননা, জলীয় বাষ্প কম। ফলে শুকনো বায়ু প্রবেশ করছে দেশে আর তাপমাত্রা বেড়ে যাচ্ছে। আবার সাগরেও সাইক্লোন ফরম করে, সে প্রক্রিয়াটাও নেই। তাই কোনো দিক থেকেই আবহাওয়া বৃষ্টিপাতের অনুকূলে নয়।
দক্ষিণ-পূর্ব মৌসুমি বায়ু প্রায় নেই বললেই চলে। যার সঙ্গে বঙ্গোপসাগর থেকে জলীয় বাষ্পও আসছে না। তবে আশার কথা ধীরে ধীরে জলীয় বাষ্পের পরিমাণ বাড়ছে। এক্ষেত্রে আগামী কয়েকদিনে বৃষ্টিপাতের দেখা মিলতে পারে। ২৪ এপ্রিলের দিকে সারাদেশেই কালবৈশাখী ঝড় হবে। তেমনটা হলে তীব্র তাপদাহ থেকে কিছুটা হলেও মুক্তি পাবে রাজধানীবাসী।
একাত্তর/এসজে
