এখনও ন্যায্য মজুরির নামে বঞ্চনাই যেন শ্রমিকের নিয়তি। যেমন জাহাজ থেকে কয়লা নামালে প্রতি টুকরি কয়লার জন্য মজুরি মাত্র ৩ টাকা ২৫ পয়সা। সারাদিনে একজন শ্রমিক ৭০ টুকরি কয়লা নামালে, দিন শেষে আয় দাঁড়ায় ২২৫ টাকা। অবিশ্বাস্য হলেও গাবতলীর কয়লাটানা শ্রমিকদের জীবনে এটাই সত্য।
রাজধানীর গাবতলী-আমিনবাজার সেতুর নিচেই রয়েছে বেশ কয়েকটি কয়লাঘাট। এসব ঘাটে ভারত, ইন্দোনেশিয়া, আফ্রিকার কয়লাভর্তি কার্গো ভেড়ে। এরপর সেই সব কয়লা নদীর পাড়ে নামানোর কাজ করেন সেখানকার প্রায় সাত হাজার শ্রমিক। এঁদের বেশিরভাগই এসেছেন ঢাকার বাইরে থেকে। অনেকে আবার মৌসুমী শ্রমিকও। কিছুদিন কাজ করে ফিরে যান গ্রামে।
সেখানেই এই প্রতিবেদকের সঙ্গে দেখা হয় বয়স প্রায় ৫০ ছুঁইছুঁই এক বৃদ্ধার। এই বয়সেও প্রখর রোদে জাহাজ থেকে কয়লা নামানোর মতো কঠিন পরিশ্রমের কাজ করতে হয় তাকে। প্রতি টুকরি কয়লা নামানোর জন্য তিনি পান মাত্র ৩ টাকা ২৫ পয়সা। সারাদিনে যদি ৭০ ঝুড়ি কয়লা ট্রাকে তুলে দিতে পারেন; তাহলে তার ভাগ্যে মেলে মাত্র ২২৫ টাকা। জলে ভাষা কচুরিপানার চাইতেও এই শ্রমিকদের শ্রমের মূল্যটা কম।
ছোট ঝুড়িতে করে তাঁরা দিনরাত কয়লা নামান। কার্গো থেকে কয়লা নামানোর স্থানের মধ্যকার দূরত্বের ওপর মজুরি ওঠা–নামা করে। সে সঙ্গে জাহাজের পাটাতনে নেমে ২৫ থেকে ৩০ কেজির কয়লার ঝুড়ি মাথায় নিয়ে সরু কাঠের ওপর দিয়ে তারপর ট্রাক পর্যন্ত পৌছে দেয়া। কার্গো থেকে নদীর পাড়ে যাওয়ার জন্য থাকা কাঠের তক্তাটিও ঝুঁকিপূর্ণ। পদে পদে বিপদের হাতছানি।

শ্রমিকদের মুখে নেই কোনো মাস্ক, পায়ে নেই বিশেষ জুতা এবং হাতে নেই গ্লাভস। ফলে কয়লা থেকে শরীর দূষণের সঙ্গেই বসবাস তাদের। কয়লার বিষাক্ত বিষ ঢুকছে তাদের শরীরে। এমনই এক ঘেরাটোপের মধ্যে জীবন কাটাচ্ছেন বৌদ্ধনাথ ও আনোয়ারের মতো শ্রমিকরা।
দুর্মূলের বাজারে সামান্য এই রোজগারে তাদের জীবন চলে না। তবু টেনে টুনে চালাতে হয়। হয়তো দু’বেলা কোন মতে ভাত জোটে। কিন্তু ওষুধপত্র জামা-কাপড় সন্তানের পড়াশুনা? সেসব এই শ্রমিকদের জীবনে যেনো কেবলই বিলাসিতা।
দুপুরে খাবারের বিরতি। নদীর ঘাটেই খুপড়ি ঘরে তীব্র গরমে খাওয়া দাওয়া সারেন কয়লা টানা শ্রমিকরা। ভাতের বাটিতে শুধু এক টুকরা ভাজা মাছ। কঠিন পরিশ্রম তাই ক্ষুধা মেটাতে সাথে চিড়া ভিজিয়ে লবন দিয়ে পেট ভরার চেষ্টা শ্রমিকদের। শ্রমিকের সংখ্যা বাড়লে সুযোগ বুঝে মজুরী কমিয়ে দেয় আমদানীকারকরা।
একাত্তর/আরবিএস
