ফুটবল মাঠে হ্যান্ডবল, অফসাইড কিংবা ভিএআর নিয়ে বিতর্কের শেষ নেই। কিন্তু এখন কি সময় এসেছে এই তালিকায় ‘চুল টানাটানি’ বা হেয়ার পুলিং যোগ করার? গত শনিবার উলভসের বিপক্ষে সান্ডারল্যান্ডের ম্যাচটি ১-১ গোলে ড্র হলেও, আলোচনার কেন্দ্রে এখন ডিফেন্ডার ড্যান ব্যালার্ড। প্রতিপক্ষের ফুটবলারের চুল টেনে মাঠ ছাড়তে হয়েছে তাকে, যা চলতি মৌসুমে এই ধরণের তৃতীয় ঘটনা!
ম্যাচের ২৪তম মিনিটে উলভসের নাইজেরিয়ান ফরোয়ার্ড তোলু আরোকোদারের সঙ্গে বল দখলের লড়াইয়ে নামেন ব্যালার্ড। শুরুতে রেফারি পল টিয়ারনি তেমন কিছুই দেখেননি, কিন্তু ভিএআর-এর ইশারায় সাইড মনিটর চেক করতেই পাল্টে যায় দৃশ্যপট। ব্যালার্ডকে সরাসরি লাল কার্ড দেখান তিনি। গ্যালারিতে তখন সান্ডারল্যান্ড ভক্তদের চিৎকার, এটা ফুটবল নয়! মজার ব্যাপার হলো, এই মৌসুমে আরোকোদারে নিজেই দুইবার চুল টানার শিকার হলেন। এর আগে এভারটনের মাইকেল কিন এবং ম্যানচেস্টার ইউনাইটেডের লিসান্দ্রো মার্টিনেজও একই অপরাধে লাল কার্ড দেখে তিন ম্যাচের নিষেধাজ্ঞায় পড়েছেন।

নিয়মের মারপ্যাঁচ: অনিচ্ছাকৃত নাকি সহিংস?
ফুটবলের আইনে চুল টানার জন্য আলাদা কোনো ধারা নেই। বর্তমানে একে ‘ভায়োলেন্ট কন্ডাক্ট’ বা সহিংস আচরণের কাতারে ফেলা হয়, ঠিক যেমনটা মুখমণ্ডলে ঘুষি মারা বা কনুই দিয়ে আঘাত করার ক্ষেত্রে করা হয়। সিজনের শুরুতে রেফারিরা ক্লাবগুলোকে স্পষ্ট জানিয়ে দেন, চুল টানা মানেই সরাসরি লাল কার্ড।
তবে সান্ডারল্যান্ড বস রেজিস লে ব্রিস ক্ষোভ উগরে দিয়ে বলেছেন, লম্বা চুলের ফরোয়ার্ডদের বিপক্ষে ডিফেন্ড করা কি তবে এখন অপরাধ? বাতাসে যখন বল দখলের লড়াই হয়, তখন হাত কোথায় যাচ্ছে তার ওপর সবসময় নিয়ন্ত্রণ থাকে না। এটা কোনোভাবেই ইচ্ছাকৃত সহিংসতা ছিল না।

লিঙ্গ বৈষম্যহীন বিতর্ক: নারীদের বিশ্বকাপেও একই চিত্র
চুল টানার এই বালাই শুধু পুরুষদের ফুটবলে সীমাবদ্ধ নেই। এপ্রিলে ওমেন্স চ্যাম্পিয়ন্স লিগে আর্সেনালের কেটি ম্যাককাবে চেলসির অ্যালিসা থম্পসনের চুল টেনেও পার পেয়ে যান, যা নিয়ে বিতর্কের ঝড় ওঠে। সাবেক ম্যান সিটি গোলরক্ষক জো হার্ট এবং ম্যানচেস্টার ইউনাইটেড কিংবদন্তি ওয়েইন রুনিও এই নিয়মের কড়া সমালোচনা করেছেন। রুনির ভাষায়, "আমি বিশ্বাসই করতে পারছি না যে ম্যাচ অফ দ্য ডে-তে বসে আমাকে খেলোয়াড়দের চুল টানা নিয়ে কথা বলতে হচ্ছে। এটা হাস্যকর! নিয়ম বদলানো জরুরি।"
ভিএআর-এর নজরদারি: সমাধান নাকি সমস্যা?
ভিএআর বিশেষজ্ঞ ডেল জনসনের মতে, ভিএআর আসার আগে এসব তুচ্ছ ঘটনা রেফারিদের চোখ এড়িয়ে যেত। কিন্তু এখন ক্যামেরার জুম লেন্সে চুলের মুঠি ধরা পড়লেই তা লাল কার্ডের দণ্ড দিচ্ছে। সাবেক রেফারি ড্যারেন ক্যান একটি বুদ্ধিদীপ্ত সমাধান দিয়েছেন। তিনি মনে করেন, ‘হেয়ার পুলিং’-কে একটি আলাদা ক্যাটাগরিতে ফেলা উচিত, যেখানে অপরাধের গুরুত্ব বুঝে এক থেকে তিন ম্যাচের নিষেধাজ্ঞার বিধান থাকবে। সব চুল টানাকে ‘ভায়োলেন্ট কন্ডাক্ট’ বলাটা যুক্তিসঙ্গত নয়।

মাঠে পেশি শক্তির লড়াই থাকবেই, কিন্তু সেই লড়াই যখন আক্ষরিক অর্থেই ‘চুলোচুলি’তে রূপ নেয় এবং তার জন্য কঠোর শাস্তি পেতে হয়, তখন ফুটবলের চিরাচরিত সৌন্দর্য নিয়েই প্রশ্ন ওঠে। ফুটবল কি তবে সামনের দিনে লম্বা চুলের খেলোয়াড়দের জন্য বাড়তি ভীতির কারণ হয়ে দাঁড়াবে? নাকি ফুটবলাররা এখন থেকেই নাপিতের দোকানে সিরিয়াল দেবেন? উত্তর মিলবে প্রিমিয়ার লিগের পরবর্তী ম্যাচগুলোতে!
