ক্রিকেটের নিয়তি কখনো কখনো কী নিষ্ঠুর হতে পারে, তার এক জলজ্যান্ত সাক্ষী হয়ে থাকল মিরপুর শের-ই-বাংলা স্টেডিয়াম! সেঞ্চুরির জন্য দরকার মাত্র একটি রান, শট খেলার জন্য চোখ টিপছেন ব্যাটসম্যান, অথচ ঠিক সেই মুহূর্তে খলনায়ক হয়ে নামল অন্ধকার!
বাজে আলোর কারণে ঢাকার প্রথম টেস্টের প্রথম দিনের খেলা যখন নির্ধারিত সময়ের আগেই শেষ ঘোষণা করা হলো, তখন বাঁহাতি ওপেনার সাদমান ইসলাম অপরাজিত ঠিক ৯৯ রানে।

সাদমানের এই ৯৯-এ আটকে থাকা এক বিরল ইতিহাসেরও অংশ। টেস্ট ক্রিকেটের ইতিহাসে এই নিয়ে মাত্র ২০ বার কোনো ব্যাটসম্যান দিন শেষে ৯৯ রানে অপরাজিত থেকে মাঠ ছাড়লেন। গত বছর আয়ারল্যান্ডের বিরুদ্ধে মুশফিকুর রহিমের পর বাংলাদেশের দ্বিতীয় এবং সব মিলিয়ে বিশ্বের ২০তম ব্যাটসম্যান তিনি।
তবে একটা বড় স্বস্তি, আগের ১৯টি ঘটনার প্রতিটিতেই কিন্তু ব্যাটসম্যান পরের দিন সেঞ্চুরি পূরণ করতে পেরেছিলেন!

দিনের শুরুটা কিন্তু মোটেও সহজ ছিল না। মিরপুরের আর্দ্রতা আর তপ্ত রোদের সাথে উইকেটের অতিরিক্ত বাউন্স ভাবাচ্ছিল টাইগারদের। ওপেনার তানজীদ হাসান তামিম ২২ বল ‘স্ক্র্যাচ’ করে মাত্র ৭ রান করে জয়ডেন সিলসের বলে স্লিপে ক্যাচ দিয়ে প্যাভিলিয়নের পথ ধরেন।
সেখান থেকে শুরু সাদমানের বুক চিতিয়ে লড়াই। প্রথমে মুমিনুল হককে নিয়ে গড়েন ৫৯ রানের জুটি। কিন্তু অপ্রয়োজনীয় এক শটে জোমেল ওয়ারিকানকে উইকেট উপহার দিয়ে ২৮ রানে থামেন মুমিনুল। ৯৬ রানে ২ উইকেট হারিয়ে মধ্যাহ্নভোজে যায় বাংলাদেশ।
বিরতির পর হাফসেঞ্চুরি তুলে নেন সাদমান। কিন্তু অধিনায়ক নাজমুল হোসেন শান্ত (১৯) প্যাডেল সুইপ করতে গিয়ে ওয়ারিকানের দ্বিতীয় শিকারে পরিণত হলে ১১২ রানে ৩ উইকেট হারিয়ে সামান্য চাপে পড়ে বাংলাদেশ।

এরপরই শুরু হয় দিনের সেরা ও সবচেয়ে ড্রামাটিক নাটক! সাদমানের সঙ্গী হন তাওহীদ হৃদয়। উইকেটে জমে যাওয়ার পর ছক্কা-চারের ফুলঝুরি ফোটালেও ঢাকা টেস্টের ভ্যাপসা গরম সহ্য করা কঠিন হয়ে পড়েছিল হৃদয়ের জন্য।
ক্রমাগত পায়ের ক্র্যাম্পে ভুগতে থাকা হৃদয় শেষ পর্যন্ত ৬৬তম ওভারে মাঠের মধ্যেই লুটিয়ে পড়েন। বাধ্য হয়ে তাকে স্ট্র্যাচারে করে তুলে নিয়ে যাওয়া হয় ড্রেসিংরুমে। রিটায়ার্ড হার্ট হওয়ার আগে সাদমানের সাথে উপহার দেন ৮৮ রানের দারুণ জুটি, হৃদয়ের ব্যাট থেকে আসে ৮৪ বলে ৪২ রান।
বিকেল ৩টা ১৬ মিনিটে প্রথমবার বাজে আলোর জন্য খেলা বন্ধ হলে সাদমানের রান ছিল ৯৬। ৫০ মিনিট পর যখন খেলা শুরু হয়, জীবন বাজি রেখে চার ওভারে ৩ রান তুলে ৯৯-এ পৌঁছান সাদমান।
ক্যারিবিয়ান দলপতি রোস্টন চেজ ফাস্ট বোলার আনার চেষ্টা করেছিলেন, কিন্তু আম্পায়াররা আলো নেই বলে সাফ মানা করে দেন! বিকেল ৪টা ২২ মিনিটে দ্বিতীয়বারের মতো আলো পুরোপুরি পড়ে গেলে বাধ্য হয়ে খেলা স্থগিত করেন আম্পায়াররা।

দিন শেষে সাদমান ২১৯ বলে ১০টি চারে ৯৯ রানে দাঁড়িয়ে আছেন, আর অন্য প্রান্তে ইনজুরি কাটিয়ে ফেরা লিটন দাস অপরাজিত ১০ রানে। ওয়েস্ট ইন্ডিজের হয়ে ওয়ারিকান ৩৩ রানে ২টি এবং সিলস ১টি উইকেট দখল করেন।
সব মিলিয়ে মিরপুরের তপ্ত আবহাওয়া, হৃদয়ের স্ট্র্যাচারে মাঠ ছাড়া, আর সেঞ্চুরির একদম দোড়গোড়ায় গিয়ে সাদমানের থমকে যাওয়া— সব মিলিয়ে ঢাকা টেস্টের প্রথম দিনটা ছিল একেবারে হাই-ভোল্টেজ ড্রামায় ঠাসা! এখন দেখার বিষয়, কাল সকালে দিনের শুরুতেই সাদমান তার ক্যারিয়ারের তৃতীয় টেস্ট সেঞ্চুরি উদযাপন করতে পারেন কি না!
