২০১৬ সালে নিউ জার্সির মেটলাইফ স্টেডিয়ামেই কোপা আমেরিকার ফাইনাল হেরে যখন কান্নায় ভেঙে পড়েছিলেন লিওনেল মেসি, তখন আন্তর্জাতিক ফুটবল থেকে অবসরের ঘোষণা দিয়ে তিনি বলেছিলেন, আমার পক্ষে যা করা সম্ভব ছিল, তার সবটুকুই আমি করেছি। ২৯ বছর বয়সে ব্যক্তিগত ও ক্লাব ফুটবলের সব রেকর্ড নিজের করে নিলেও তিনটি কোপা আমেরিকা ও একটি বিশ্বকাপ ফাইনাল হারার পর মনে হচ্ছিল, দেশের হয়ে বড় কোনো আন্তর্জাতিক ট্রফি ছোঁয়া বুঝি তাঁর কপালে নেই।
তবে কোটি ভক্ত আর পুরো দেশের আকুল আকুতিতে সাড়া দিয়ে আবারও আর্জেন্টিনার আকাশী-নীল জার্সি গায়ে জড়িয়েছিলেন এই জাদুকর। আর রোববার রাত ১টায় সেই একই মাঠে, যা এই টুর্নামেন্টের জন্য ‘নিউ ইয়র্ক-নিউ জার্সি স্টেডিয়াম’ নামে নতুন রূপ পেয়েছে, তিনি নামছেন টানা দ্বিতীয়বারের মতো বিশ্বকাপের সোনালী ট্রফিটা নিজের করে নিতে।

সর্বকালের সেরা ফুটবলার কে, তা নিয়ে বিতর্ক হয়তো কেয়ামত পর্যন্ত চলবে, তবে বিশ্বকাপের মঞ্চে একক কোনো খেলোয়াড়ের এমন অতিমানবীয় প্রভাব দেখতে হলে আপনাকে পেলে কিংবা ডিয়েগো ম্যারাডোনার যুগে ফিরে যেতে হবে। রোববারের ফাইনালে আর্জেন্টিনার প্রতিপক্ষ স্পেন যেখানে পুরোপুরি তাদের দলীয় শক্তির ওপর ভরসা করে খেলছে, সেখানে আলবিসেলেস্তেদের গত পাঁচ বছরের অবিচ্ছিন্ন সাফল্যের মূল চালিকাশক্তি হয়ে আছেন একা মেসি।
জাতীয় প্রতীকে পরিণত হওয়া এক নেতা: মাঠে মেসির অবদান শুধু গোল বা অ্যাসিস্টের সংখ্যা দিয়ে পরিমাপ করা যাবে না। তিনি এখন আর্জেন্টিনার এমন এক জাতীয় প্রতীক বা বিশ্বাসের নাম, যাকে কেন্দ্র করে এক অদম্য যোদ্ধার দল বারবার খাদের কিনারা থেকে ঘুরে দাঁড়িয়ে জয় ছিনিয়ে আনে।

সেমিফাইনালে ইংল্যান্ডের বিপক্ষে মেসির পাস থেকেই শেষ মুহূর্তের জয়সূচক গোল করা লাউতারো মার্টিনেজ বলেন, সবাই এখন ভীষণ আনন্দিত, আর এর সব কৃতিত্বই এই দলটার। যে কোনো প্রতিকূলতার সামনেও আমরা থমকে যাই না, কখনও ক্লান্ত হই না। আর আমাদের সামনে পথ দেখানোর জন্য বিশ্বের সেরা খেলোয়াড়টি তো উদাহরণ হিসেবে আছেনই।
মেসির জাদুকরী দক্ষতার পাশাপাশি তাঁর অবিশ্বাস্য শারীরিক সক্ষমতাও সবাইকে তাক লাগিয়ে দিয়েছে। এই বিশ্বকাপে আর্জেন্টিনার নকআউট পর্বের প্রতিটি ম্যাচের প্রতিটি মিনিট মাঠে কাটিয়েছেন তিনি, যার মধ্যে দুটি ম্যাচ অতিরিক্ত সময়েও গড়িয়েছিল।
রোজারিও থেকে উঠে আসা এই খুদে জাদুকরের ভবিষ্যৎ নিয়ে আগাম কোনো মন্তব্য করা বোকামি হলেও, ফাইনালে আর্জেন্টিনার হয়ে চতুর্থবারের মতো বিশ্বজয় নিশ্চিত করতে পারলে তা হবে মেসির এই রূপকথার মতো ক্যারিয়ারের সবচেয়ে বড় মুকুট। ২০২১ ও ২০২৪ সালের কোপা আমেরিকা এবং ২০২২ সালের বিশ্বকাপ জয় মেসির আন্তর্জাতিক ট্রফির খরা এমন এক সময়ে ঘুচিয়েছে, যখন ক্লাব ফুটবলে ইউরোপের পাট চুকিয়ে তিনি খেলছেন তুলনামূলক কম চাপের মেজর লিগ সকারে।

ইন্টার মায়ামির সাথে ২০২৮ মৌসুম পর্যন্ত চুক্তি থাকা মেসি ২১ বছরের আন্তর্জাতিক ক্যারিয়ারে ২০৬টি ম্যাচ খেলেছেন। আকাশী-নীল জার্সিতে রোবারের ম্যাচটি তাঁর শেষ ম্যাচ কি না, সে বিষয়ে তিনি কোনো স্পষ্ট আভাস দেননি। তবে একটা বিষয় নিশ্চিত, আন্তর্জাতিক ফুটবলকে কবে বিদায় জানাবেন, সেই সিদ্ধান্ত নেয়ার পূর্ণ অধিকার লিওনেল মেসি নিজের পারফরম্যান্স দিয়েই অর্জন করে নিয়েছেন।
