চলতি বছরের শুরুতে কাতারে অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা ছিল ‘ফিনালিসিমা’- যেখানে মুখোমুখি হওয়ার কথা ছিল দক্ষিণ আমেরিকা ও ইউরোপের দুই চ্যাম্পিয়ন আর্জেন্টিনা ও স্পেনের। কিন্তু ইরান ও মার্কিন-ইসরাইলি সামরিক সংঘাতের কারণে ম্যাচটি বাতিল হয়ে যায়। তবে, সেই অপূর্ণ হিসাব মেটাতেই যেন রোববার রাত ১টায় নিউ জার্সির মেটলাইফ স্টেডিয়ামে বসছে এক মহাকাব্যিক আসর, যেখানে কোনো আনুষ্ঠানিক ট্রফি নয়, বাজি ধরা আছে ফুটবলের সর্বোচ্চ শ্রেষ্ঠত্ব!
২০২৬ বিশ্বকাপের এই ফাইনাল ম্যাচটি ফুটবল বিশ্বকে উপহার দিতে যাচ্ছে এক অদ্ভুত ও রোমাঞ্চকর দ্বৈরথ। একদিকে রয়েছে- আবেগ, আগুন আর মেসির আর্জেন্টিনা; অন্যদিকে রয়েছে ইউরোপ সেরা স্পেন, যারা মাঠের শৃঙ্খলাকে পূজা করে এবং নিখুঁত নিয়ন্ত্রণকে রূপ দিয়েছে এক অনন্য আর্ট ফর্মে।

এটি মূলত দক্ষিণ আমেরিকা বনাম ইউরোপের লড়াই, আবেগ বনাম নিখুঁত গাণিতিক ফুটবলের যুদ্ধ। আর, এই লড়াইয়ের পরতে পরতে জড়িয়ে আছে বার্সেলোনার বিখ্যাত লা মাসিয়া একাডেমির ইতিহাস, যেখানে একাডেমির ইতিহাসের সর্বকালের সেরা ছাত্র লিওনেল মেসি মুখোমুখি হবেন লা মাসিয়ার নতুন বিস্ময়বালক ১৯ বছর বয়সী লামিন ইয়ামালের!
২০২২ সালে ফ্রান্সকে হারিয়ে কাতার জয় করার চার বছর পর আবারও ফাইনালে আর্জেন্টিনা। তখন ৩৫ বছর বয়সী মেসির পক্ষে আরেকটি বিশ্বকাপ ফাইনাল খেলা আকাশকুসুম কল্পনা মনে হলেও, আজ ৩৯ বছর বয়সে এসেও তিনি সময়, ডিফেন্ডার এবং সব যুক্তিকে বুড়ো আঙুল দেখিয়ে চলেছেন।
তবে আর্জেন্টিনার এবারের ফাইনালের পথটা কিন্তু মোটেও মসৃণ ছিল না; কাতার বিশ্বকাপের ১৭ জন খেলোয়াড়কে নিয়ে গড়া স্কালোনির এই দলটিকে ফাইনালে আসতে প্রতি পদে রক্ত ঘামাতে হয়েছে। অতিরিক্ত সময়ে কেপ ভার্দেকে হারানো এবং মিশর, সুইজারল্যান্ড ও ইংল্যান্ডের বিরুদ্ধে শ্বাসরুদ্ধকর ম্যাচে জয়, সব মিলিয়ে তারা যেন রকি বালবোয়ার মতো মার খেতে খেতে প্রতি রাউন্ড পার করে ফাইনালে এসেছে। আর প্রতি ম্যাচেই মেসির জাদুকরী পারফরম্যান্স নতুন করে উসকে দিচ্ছে সেই চিরন্তন বিতর্ক, তিনি নাকি পেলে, কে সর্বকালের সেরা?

আর্জেন্টিনা যেখানে খুঁড়িয়ে খুঁড়িয়ে আবেগ দিয়ে লড়ছে, স্পেন সেখানে মাঠে নামছে একদম কর্পোরেট বসের মতো শান্ত ও ঠাণ্ডা মাথায়। টানা ৩৭ ম্যাচে অপরাজিত থাকা স্পেনের সামনে সুযোগ ২০১০ সালের পর দ্বিতীয়বার বিশ্বকাপ জেতার এবং ২০১৮-২০২১ এর মধ্যে ইতালির গড়া আন্তর্জাতিক অপরাজিত থাকার রেকর্ডটি ভেঙে চুরমার করার।
ইউরো জেতার পর বুকমেকারদের ফেভারিট হিসেবে আমেরিকায় আসা স্প্যানিশ দলটির কোচ লুইস দে লা ফুয়েন্তে, যিনি এই দলের অনেক খেলোয়াড়কে তাদের কৈশোর থেকে চেনেন। ফলে তাদের মধ্যকার বোঝাপড়া এতটাই নিখুঁত যে প্রতিপক্ষের মনে হবে তারা কোনো দরজা-জানালাহীন এক সুসজ্জিত আলো ঝলমলে ঘরে বন্দি হয়ে পড়েছেন, যার স্বাদ সেমিফাইনালে ফ্রান্স খুব ভালো করেই পেয়েছে!
তবে স্পেনের এই নিখুঁত পাসিং মেশিনের ভেতরেও রয়েছে এক বুনো সৃজনশীলতা, যার মূল কারিগর তরুণ উইঙ্গার লামিন ইয়ামাল। বার্সেলোনার হয়ে ১৫ বছর বয়সে ডেবিউ করা এই তরুণ ইতিমধ্যেই বয়সের সব রেকর্ড ভেঙে মেসির সাথে তুলনার জন্ম দিয়েছেন।

কাকতালীয়ভাবে, ফুটবল ইতিহাসের অন্যতম সেরা এক ভাইরাল ছবিতে দেখা যায় তরুণ মেসি ফুটফুটে শিশু ইয়ামালকে গোসল করাচ্ছেন! কোনো এক রসিক চিত্রনাট্যকারের লেখা এই দৃশ্য আজ এক চরম নিয়তি হিসেবে দেখা দিয়েছে। ইয়ামালের বাবা তো মজা করে বলেই দিয়েছেন, কে বলতে পারে যে মেসিই আমার ছেলের কাছ থেকে সেই জাদুকরী স্পর্শ পায়নি!
ট্যাকটিক্যাল এই দাবার লড়াইয়ে মাঠের বাইরেও রয়েছে গুরু-শিষ্যের লড়াই। প্রায় এক দশক আগে স্প্যানিশ ফুটবল ফেডারেশনের কোচিং কোর্সে লিওনেল স্কালোনির শিক্ষক ছিলেন খোদ স্প্যানিশ বস দে লা ফুয়েন্তে। আজ সেই শিক্ষক-ছাত্রের লড়াইয়ে বাজি ফুটবলের সবচেয়ে বড় ট্রফি।
অবশ্য ফাইনালের ভাগ্য নির্ধারণে বড় ভূমিকা রাখতে পারে নিউ জার্সির বৈরী কন্ডিশন। টুর্নামেন্টজুড়ে এখানকার বাজে পিচ নিয়ে অনেক অভিযোগ উঠেছে, যা স্পেনের চেনা পাসিং ছন্দকে নষ্ট করে আর্জেন্টিনাকে তাদের পছন্দের ছন্নছাড়া ও আবেগী খেলায় মেতে ওঠার সুযোগ করে দিতে পারে।

সাথে থাকবে ৩০ ডিগ্রি সেলসিয়াস তাপমাত্রা এবং কানাডার দাবানলের কারণে তৈরি বিষাক্ত ধোঁয়াশা। ৮০ হাজার দর্শকের সামনে স্পেনের লক্ষ্য থাকবে ম্যাচটিকে নিজেদের নিয়ন্ত্রণে রেখে শান্ত রাখা, আর আর্জেন্টিনার লক্ষ্য থাকবে এই প্রতিকূলতাকে আরও একবার থিয়েটার বা নাটকের মঞ্চে রূপ দেওয়া। আর এই সবকিছুর কেন্দ্রবিন্দুতে দাঁড়িয়ে লিওনেল মেসি, যিনি চাইবেন তাঁর ক্যারিয়ারের শেষ বিশ্বকাপ ম্যাচটি যেন কোনো বিষাদময় বিদায় না হয়ে, জাদুকরের শেষ রাজকীয় মহিমায় ভাস্বর হয়ে থাকে!
তথ্যসূত্র: রয়টার্স
