রাজধানী ঢাকার যানজট সময়ের সঙ্গে সঙ্গে অসহনীয় উঠছে। আর প্রথম রোজা থেকেই এই যানজট অতীতের সব রেকর্ড ছাড়িয়ে যাচ্ছে। প্রতিদিনই পরিস্থিতি খারাপের দিকে যাচ্ছে।
যানজটের কারণ হিসাবে রাজধানীতে মেগা উন্নয়ন প্রকল্পের কারণে সড়ক সরু হয়ে পড়া, রাস্তা খোঁড়াখুঁড়ি আর শিক্ষা প্রতিষ্ঠান খোলা রাখাসহ ট্রাফিক ব্যবস্থাপনাকেও দায়ী করা হচ্ছে।
নগর পরিকল্পক ও পরিবহন বিশেষজ্ঞরা বলছেন, মেগাপ্রকল্প নয়, রাজধানীর যানজট নিরসনে দরকার গণপরিবহন কেন্দ্রিক নগর পরিকল্পনা। যাতে থাকবে না শুধুমাত্র মুনাফা লাভের চিন্তা।
তারা বলেন, একের পর এক ফ্লাইওভার নির্মাণ করে রাজধানীর যানজটের কোন সমাধান আসবে না। উল্টো ফ্লাইওভারের কারণে রাজধানীতে এখন দ্বিতল যানজট হচ্ছে।
সোমবার দুপুরে রাজধানী সেগুনবাগিচা ঢাকা রিপোর্টার্স ইউনিটির নসরুল হামিদ মিলনায়তনে ‘অসহনীয় যানজট: সমাধান কী’ সংলাপে বিশ্লেষকরা বলেন, সড়কে ধারণ ক্ষমতার তুলনায় বেশি যানবাহন, যত্রতত্র পার্কিং, মানহীন রাস্তা, অপরিকল্পিত নগর, নিথর ট্রাফিক সিগন্যাল ব্যবস্থা আর গণপরিবহণের ব্যবস্থা গড়ে না ওঠাই রাজধানীর যানজটের অন্যতম কারণ।
নিরাপদ সড়ক চাই আন্দোলনের চেয়ারম্যান ইলিয়াস কাঞ্চন বলেন, যানজট নিরসনে দায়িত্ব কেউ নিচ্ছে না। আমাদের সরকারি সংস্থাগুলো যদি রাস্তায় গাড়ি রাখে, আপনারা পার্কিংয়ের কথা বলছেন? কাকে পার্কিংয়ে বাধা দেবেন তাহলে? সরকারের দায়িত্বটা কে নেবে এটা আমি বুঝতে পারলাম না। আমি চিন্তা করছিলাম এখানে এসে আমি গাড়িটা রাখবো কোথায়। আপনাদের এখানে কি পার্কিংয়ের সুবিধা আছে। মন্ত্রী সাহেব যে গাড়ি রেখে এসেছেন, তিনি কি পার্কিংয়ে রেখে এসেছেন? মন্ত্রী সাহেব তো রাস্তার ওপর গাড়ি রেখে এখানে চলে এসেছেন।
তিনি বলেন, মন্ত্রীর বক্তব্য আমি শুনছিলাম। তিনি বলছিলেন, করতে হবে? কিন্তু কে করবে? আমাদেরও দায়িত্ব আমরা পালন করছি না। আমরা শুধু বলে যাচ্ছি করতে হবে। কিন্তু আমরা কেউ দায়িত্ব নিচ্ছি না। এই যে আপনারা বললেন সকলে মিলে করতে হবে, এখন একটা জিনিস আমরা করতে পারি। সেটি হলো আপনারা পুলিশ দিয়ে রাস্তার উল্টোপাশে দিয়ে চলে যেতে পারেন। আমরা এটা বন্ধ করে দিব, নিজেদের গাড়ি নিয়ে রাস্তার মধ্যে ২-৩ দিন বসে থাকবো। উনারা যখন যেতে পারবে না তখন সমাধান হবে।
ক্ষোভ প্রকাশ করে ইলিয়াস কাঞ্চন বলেন, আপনারা শুধু বলেন-১৩বছর ধরে আছেন। ১৩ বছর ধরে তো আমরা শুধু ধুলাবালি, এয়ারপোর্ট রোডের ওপর পাঁচ বছর ধরে একটা পিলার ফেলে রেখে দিয়েছেন। কেন পিলার ফেলে রেখেছেন এতদিন ধরে। কাজটি তো প্রোপারলি করতে হবে।
তিনি বলেন, একটা দেশের উদাহরণ দিতে পারবেন। যে একটা প্রকল্প পাঁচ বছরের শেষ করবেন। কিন্তু কন্টাক্টর শেষ করবে না, ইঞ্জিনিয়ার শেষ করবে না, কিন্তু তাকে উল্টা আবার টাকা দেবেন। এমন পৃথিবীর কোথায় আছে? শুধু লন্ডনের উদাহরণ দিলে হবে না। লন্ডনের তো রাস্তার ওপরে এভাবে গাড়ি রেখে দেয় না।
স্থপতি মোবাশ্বের হোসেন বলেন, বেইলি রোডে সচিবদের জন্য আবাসন করা হয়েছে। কিন্তু সেখান থেকে প্রতিদিন সকালে একসঙ্গে ১১৪ জন সচিব-অতিরিক্ত সচিব গাড়ি নিয়ে বের হন। তাদের অনেকে এ সময় সড়কের উল্টোদিকে গাড়ি নিয়ে চলেন,এ সময় যানজট তৈরি হয়।
১১৪ জন সচিব, অতিরিক্ত সচিবদের যদি বিশ্বমানের অত্যাধুনিক বাস বা মিনিবাসে করে সচিবালয়ে নিয়ে আসেন, তাহলে ওই ১১৪টি গাড়ি রাস্তায় বের হবে না। আপনারা কি পারবেন ওই কাজটি করাতে?
বুয়েটের দুর্ঘটনা গবেষণা ইনস্টিটিউটের সাবেক পরিচালক অধ্যাপক ড. শামসুল হক বলেন, গণপরিবহনের অবকাঠামো বানাতে হবে, কোনোভাবে ব্যক্তিগত গাড়ির জন্য নয়। গণপরিবহনের জোর দিয়ে যদি আমরা আমাদের উন্নয়ন কাজ করি, তাহলে আমাদের সমস্যা এখনও সমাধান করা সম্ভব।
সংলাপের প্রধান অতিথি স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় মন্ত্রী তাজুল ইসলাম বলেন, দুর্নীতি ও অব্যবস্থাপনা দূর করতে পারলে মানুষের ভোগান্তি কিছুটা হলেও কমে আসবে।
তিনি বলেন, বলেন, বর্তমান সরকার টানা ১৩ বছর ধরে ক্ষমতায় আছে। এ কারণে দেশে বিভিন্ন ক্ষেত্রে উন্নতি হয়েছে। এই ১৩ বছরে অনেকগুলো উন্নতির কারণেই ট্রাফিক সিস্টেমটা ট্রাফিক প্রবলেমটা আমাদের কাছে একটা হেডেক হয়ে গেছে। ট্রাফিক সমস্যা নাই পৃথিবীতে এমন কোনো জায়গা নাই। আমরা যে পরিস্থিতিতে আছি তা মাথায় নিয়ে সে বিবেচনায় সমাধানের চিন্তা করতে হবে।
মন্ত্রী আরো বলেন, 'রাস্তা না রেখে শুধু বড় বড় বিল্ডিং করলে এবং ব্যক্তিগত গাড়ির সংখ্যা বাড়লে রাস্তায় ট্রাফিক জ্যাম হওয়াটাই স্বাভাবিক। রাস্তায় গাড়ির সংখ্যা ক্রমাগত বেড়েই চলেছে। পাবলিক ট্রান্সপোর্ট ব্যবহারে সবাইকে উৎসাহী করতে হবে।
বিভিন্ন তথ্য-উপাত্ত বলছে, এভাবে চলতে থাকলে আগামী কয়েক বছরের মধ্যে গাড়ির গতি মানুষের হাঁটার চেয়েও কম হবে। ট্র্যাফিক জ্যাম নিরসন করা একক কোনো প্রতিষ্ঠানের পক্ষে সম্ভব নয়। সমন্বিতভাবে কাজ করলে কাঙ্ক্ষিত লক্ষ্যে পৌঁছনো সম্ভব হবে।
এ ক্ষেত্রে সাধারণ মানুষের অংশগ্রহণ করতে হবে। ট্রাফিক আইন মানার বিষয়ে মানুষকে আরো বেশি সচেতন হতে হবে। ঢাকা শহরে কত মানুষ বসবাস করবে তা ঠিক করা জরুরি। কারণ সবাইকে ঢাকায় রাখা সম্ভব না। ঢাকা ডিটেল এরিয়া প্লান-ড্যাপ সে লক্ষ্যে প্রণয়ন করা হচ্ছে। ঢাকাকে সম্প্রসারণ করা হচ্ছে। মূল ঢাকায় না থেকে যাতে করে মানুষজনকে সম্প্রসারিত এলাকা স্থানান্তর করা যায় সে ব্যাপারে উৎসাহিত করতে হবে।
তাজুল ইসলাম বলেন, ঢাকায় প্রতিদিন প্রায় পাঁচ হাজার লোক আসছে। বিশ্বের উন্নত দেশগুলো তাদের মূল শহরে বসবাসের কষ্ট বাড়িয়েছে। এতে মানুষজন পার্শ্ববর্তী এলাকায় থাকে এবং সকালবেলা কর্মক্ষেত্রে চলে আসে।
ঢাকায় থাকার লিভিং কষ্ট এবং গ্রামে থাকার লিভিং কষ্ট যদি প্রায় সমান হয় তাহলে ইনকাম এবং সুযোগ-সুবিধা পাবার আশায় মানুষ ঢাকায় আসবে এটাই স্বাভাবিক। জোনভিত্তিক পানি, গ্যাস, হোল্ডিং ট্যাক্স নির্ধারণ করার কথা প্রায় বলে থাকি। কিন্তু এটা নিয়ে কেউ কথা বলে না।
একাত্তর/এআর
