২৫ বছর আগে হংকংকে চীনের কাছে হস্তান্তর করে ব্রিটেন, যার ফলে শুরু হয়েছিলো এক বিশাল রাজনৈতিক এক্সপেরিমেন্টের। সাবেক এই পুঁজিবাদী ব্রিটিশ উপনিবেশ চীনের কমিউনিস্ট শাসনের অধীনে কীভাবে টিকে থাকবে তা নিয়ে উদ্বিগ্ন ছিলেন অনেকেই।
এই উদ্বেগ নিরসনে ১৯৯৭ সালে হংকংকে এক অনন্য প্রতিশ্রুতি দেয় বেইজিং- চীনের মূল ভূখণ্ডে যেসব নাগরিক অধিকার ও স্বাধীনতা অনুপস্থিত, সেগুলোই আগামী ৫০ বছর উপভোগ করবে হংকং। এর নাম দেয়া হয় 'এক দেশ, দুই নীতি' ব্যবস্থা।
সেই ৫০ বছরের অর্ধেক সময় পার করে ফেলেছে হংকং। আগামী ২৫ বছর তাহলে কী অপেক্ষা করছে হংকংবাসীর জন্য?
পরিবর্তনশীল রাজনীতি
সামনের দিনগুলোতে হংকংয়ের কাছে কতটুকু রাজনৈতিক স্বায়ত্বশাসন ও স্বাধীনতা থাকবে তা এখন বড় প্রশ্ন। হস্তান্তরের আগে অনেকেই আশা করছিলেন সময়ের সাথে সাথে চীন আরও উদারপন্থী হয়ে উঠবে এবং হংকংকে পূর্ণ গণতান্ত্রিক অধিকার দেবে।
ব্রিটেন ও চীনের মধ্যে সই করা এক চুক্তি অনুযায়ী হংকংয়ের মিনি সংবিধানে সেই প্রতিশ্রুতিই দেয়া হয়েছে। এই সংবিধানে হংকংয়ের নির্বাচন ব্যবস্থায় প্রগতিশীল সংস্কারের কথা বলা হয়েছে, যার ফলে প্রধান নির্বাহী ও আইনপ্রণেতারা সার্বজনীন ভোটাধিকার প্রয়োগের মাধ্যমে নির্বাচিত হবেন।
তবে সমালোচকদের মতে, সাম্প্রতিক সময়ে জাতীয় নিরাপত্তা আইন ও নির্বাচনী ব্যবস্থা সংস্কারের মাধ্যমে সেই প্রতিশ্রুতি ভেঙেছে বেইজিং। নতুন নিয়ম অনুযায়ী শুধুমাত্র 'দেশপ্রেমী'রাই হংকংয়ের নেতৃত্ব দিতে পারবেন।
এই অবস্থায় পূর্ণ গণতান্ত্রিক ব্যবস্থা প্রবর্তনের আশা খুবই বলে মনে করছেন পর্যবেক্ষকরা। তাদের আশঙ্কা, বেইজিং হংকংয়ের পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ নিয়ে নেয়ায় এর মূল চরিত্র বদলে গেছে।
গণতন্ত্রপন্থী সাবেক আইনপ্রণেতা টেড হুই বলেন, এক দেশ দুই নীতি ব্যবস্থা ইতোমধ্যে উধাও হয়ে গেছে বলেই মনে করেন বেশিরভাগ হংকংবাসী। দেশটির জাতীয় নিরাপত্তা আইন খুব অল্পসংখ্যক মানুষের ওপর প্রভাব ফেলে বলে কর্তৃপক্ষ দাবি করলেও, এটি হংকংয়ের একসময়কার প্রাণবন্ত নাগরিক সমাজের কণ্ঠরোধ করে বলে হুইয়ের অভিযোগ।
জাতীয় নিরাপত্তা আইনের ফলে হংকংয়ে কয়েক ডজন রাজনৈতিক দল ও ইউনিয়ন ভেঙে গেছে। নিষিদ্ধ করা হয়েছে তিয়েনআনমেন স্কয়ার গণহত্যা স্মরণে বার্ষিক মোমবাতি প্রজ্জ্বলন অনুষ্ঠান ও ১ জুলাইয়ের হস্তান্তর স্মরণে বার্ষিক পদযাত্রা।
এশিয়ায় প্রেস স্বাধীনতার বাতিঘর হংকং এবছর প্রেস স্বাধীনতা সূচকে ৭০ ধাপ পিছিয়ে ১৪৮তম অবস্থানে নেমে গেছে। বিক্ষোভের শহর ছেয়ে গেছে নীরবতায়।
যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক প্রতিষ্ঠান হংকং ডেমোক্রেসি কাউন্সিলের পলিসি এন্ড রিসার্চ ফেলো জেফরি এনগো বলেন, অদূর ভবিষ্যতে হংকংয়ে কোনো বড় আকারের বিক্ষোভ সমাবেশ অনুষ্ঠিত হবে না বলেই ধরে নেয়া যায়। ২০২০ সালের পর থেকে হয় বিক্ষোভকারীরা জেলে আছেন, নয়ত জেলে যাওয়া থেকে বাঁচতে নিজেদেরকে আড়াল করে রেখেছেন।
চীনা কর্তৃপক্ষের দাবি, এক দেশ, এক নীতি ব্যবস্থার উন্নয়ন ঘটানোর জন্যই সাম্প্রতিক এসব পরিবর্তন প্রয়োজনীয় ছিল। এটিকে 'ব্যাপকভাবে স্বীকৃত সাফল্য' দাবি করে তারা বলেন, ২০৪৭ সালের পরও এটি চালু থাকতে পারে।
বেইজিংপন্থী আইনপ্রণেতা ডমিনিক লি দাবি করেন, হংকংবাসী এখনও তাদের নাগরিক স্বাধীনতা উপভোগ করেন। যতক্ষণ না তাদের মতামত জাতীয় নিরাপত্তার ওপর প্রভাব ফেলে না, ততক্ষণ তারা সেটি প্রকাশ করতে পারেন বলে মত প্রকাশ করেন তিনি।
আন্তর্জাতিক অর্থনৈতিক কেন্দ্র, নাকি চীনা?
আরেকটি প্রশ্ন হলো, হংকং কি ভবিষ্যতে আন্তর্জাতিক অর্থনৈতিক কেন্দ্রস্থল হিসেবে তাদের অবস্থান ধরে রাখতে পারবে?
১৯৯৭ সালে 'পার্ল অব ওরিয়েন্ট' হংকংয়ের জিডিপি ছিল চীনের প্রায় ২০ শতাংশের সমান। এখন তা এসে দাঁড়িয়েছে দুই শতাংশে। সাংহাইয়ের মতো চীনা শহরগুলোর সাথে তীব্র প্রতিদ্বন্দ্বিতা করতে হচ্ছে হংকংকে।
এসএন্ডপি গ্লোবাল রেটিংস-এর এশিয়া প্যাসিফিক ইকোনমিস্ট লুইস কুজিস বলেন, ২৫ বছর আগে যখন চীন কম উন্নত ছিল তখন হংকং উন্নত ও আন্তর্জাতিকভাবে সংযুক্ত শহর হিসেবে সুপরিচিত ছিল। কিন্তু তারপর থেকে অনেক শহর অর্থনৈতিকভাবে হংকংয়ের পর্যায়ে পৌঁছে গেছে।
তবে আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত অর্থনৈতিক ব্যবস্থা ও বাজার ব্যবস্থার কারণে হংকং বিশ্বের কাছে উন্মুক্ত হওয়ায় এটি এখনও চীনে ঢোকার ও বের হওয়ার অন্যতম দরজা বলেও মন্তব্য করেন তিনি।
বেইজিংয়ের সাথে সাম্প্রতিক উত্তেজনা ও জিরো কোভিড নীতির কারণে হংকং আন্তর্জাতিক কোম্পানিগুলোর কাছে জনপ্রিয়তা হারাচ্ছে কিনা এমন প্রশ্নও তুলেছেন অনেকে।
কুজিস বলেন, হংকংয়ের চেহারায় পরিবর্তন আসছে আর এটি সম্ভবত একটু কম আন্তর্জাতিক আর একটু বেশি মূল-ভূখণ্ড কেন্দ্রিক হয়ে পড়ছে।
হংকংয়ার নাকি চাইনিজ?
হংকংয়ার বলতে আসলে কী বোঝায় তাও একটি বড় প্রশ্ন হয়ে দাঁড়িয়েছে। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে স্থানীয়রা শহর ছেড়ে যাওয়ায় অভিবাসীর সংখ্যা বৃদ্ধি পাচ্ছে। হংকং কর্তৃপক্ষ অভিবাসনের হিসাব না রাখলেও, অভিবাসীদের বেশিরভাগই যুক্তরাজ্যে চলে গেছেন বলে ধারণা করা হয়।
এর আগেও রাজনৈতিক অস্থিরতার কারণে অনেকে হংকং ছেড়ে চলে গেছেন, যেমন ১৯৮৪ সালে সিনো-ব্রিটিশ যৌথ চুক্তি সই অথবা ১৯৮৯ সালে তিয়েনআনমেন স্কয়ারে গণহত্যার পর। তবে এবার পরিস্থিতি কিছুটা ভিন্ন বলেই ধারণা করা হচ্ছে।
জেফরি এনগোর মতে, আগে রাজনৈতিক হুমকির আশঙ্কা থাকলেও, সম্ভাবনা ছিল যে পরিস্থিতি অতটা খারাপ নাও হতে পারে। তবে এবার সেই সম্ভাবনা একদমই নেই। যারা যাচ্ছেন তারা জেনেই যাচ্ছেন যে তারা কখনও হংকংয়ে আর ফিরে নাও আসতে পারেন।
তবে অভিবাসীরা তাদের হংকংয়ার পরিচয় ধরে রাখবেন বলেই বিশ্বাস করেন তিনি। তিনি মনে করেন, অ্যাক্টিভিস্টরা দেশের বাইরে থেকে হংকংয়ে গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার আন্দোলন চালিয়ে যাবে।
আরও পড়ুন: সুদানে জান্তা বিরোধী বিক্ষোভে গুলি, নিহত আট
অন্যদিকে ডমিনিক লির মতে, হংকংয়ের তরুণ প্রজন্ম আরও দেশপ্রেমী হয়ে গড়ে উঠবে।
'আমার সন্তান পতাকা উত্তোলন অনুষ্ঠানের কথা আমাকে বলে এবং স্বতঃস্ফূর্তভাবে (চীনা) জাতীয় সঙ্গীত গায়', বলেন তিনি।
জেফরি এনগোর আশঙ্কা, এর ফলে হংকংয়ের স্বতন্ত্র পরিচয় হারিয়ে যাবে। ২০৪৭ সাল নাগাদ হংকং আর চীনকে অর্থবহভাবে একে অপরের থেকে আলাদা করে চেনা যাবে না বলে শঙ্কা প্রকাশ করেন তিনি।
একাত্তর/এসজে
