বান্দরবানের পাহাড়ে নতুন জঙ্গি সংগঠন ‘জামাতুল আনসার ফিল হিন্দাল শারক্বীয়া’র আস্তানায় একাধিক অভিযান চালালেও শীর্ষ নেতাদের গ্রেপ্তার করা যায়নি। সেখানে নানারকম প্রশিক্ষণ চললেও তাদের লক্ষ্য সম্পর্কে স্পষ্ট কোনো তথ্য পায়নি র্যাব। তবে, বান্দরবান ক্যাম্পের অভিযানে আটক পাঁচ জনের কাছে মিলেছে নিখোঁজ ৫৫ ব্যক্তির তথ্য।
গেলো বৃহস্পতিবার বান্দরবানের থানচি ও রোয়াংছড়ি উপজেলার দুর্গম পাহাড়ি অঞ্চলে র্যাবের অভিযানে গ্রেপ্তার জামাতুল আনসার ফিল হিন্দাল শারক্বীয়ার পাঁচ সদস্যকে ছয় দিনের রিমান্ড দেয় রাঙ্গামাটি জেলা আদালত। এই রিমান্ডে তারা ওই নব্য জঙ্গি সংগঠনটি সম্পর্কে নানা ধরনের তথ্য দিয়েছে বলে দাবি করেছে র্যাব।
বাহিনীর আইন ও গণমাধ্যম শাখার পরিচালক কমান্ডার খন্দকার আল মঈন বলেন, জঙ্গি প্রশিক্ষণে কেএনএফের কৌশল সম্পর্কে বেশ কিছু তথ্য পাওয়া গেছে। একটি বাহিনীর আদলে তারা প্রশিক্ষণ কার্যক্রম চালিয়েছে। জঙ্গিরা প্রশিক্ষকদের ‘ওস্তাদ’বা ‘ওস্তাদজি’ বলে সম্বোধন করতেন। র্যাবের হাতে গ্রেপ্তার পাঁচ তরুণও প্রশিক্ষকদের বিষয়ে নানা তথ্য দিয়েছেন।
র্যাব জানায়, দেশে নতুন জঙ্গি সংগঠন জামাতুল আনসার ফিল হিন্দাল শারক্বিয়ার সদস্যদের অর্থের বিনিময়ে সামরিক প্রশিক্ষণ দিচ্ছে পাহাড়ের বিচ্ছিন্নতাবাদী সংগঠন কুকি-চীন ন্যাশনাল ফ্রন্ট (কেএনএফ)। তথাকথিত হিজরতের উদ্দেশ্যে যারা ঘরছাড়া হয়েছে তারাই বান্দরবান ও রাঙ্গামাটির গহীন পাহাড়ে সামরিক প্রশিক্ষণ নিচ্ছে। কুমিল্লা থেকে নিখোঁজ নিলয় নামে একজনের কাছ থেকে তথ্য পাওয়ার পর র্যাব অভিযানে নামে।
গ্রেপ্তার জঙ্গিদের দেয়া তথ্যের ভিত্তিতে বান্দরবানের রুমায় কুকি-চিন ন্যাশনাল ফ্রন্ট (কেএনএফ) ও নতুন জঙ্গিগোষ্ঠী জামাতুল আনসার ফিল হিন্দাল শারকস্ফীয়ার গোপন আস্তানায় অভিযান চালায় র্যাব। পাহাড়ের বিভিন্ন গোপন আস্তানায় বম সম্প্রদায়ের চার সদস্য জঙ্গিদের সশস্ত্র প্রশিক্ষণ দিয়েছিলেন।
কুমিল্লা থেকে নিখোঁজ ভিক্টোরিয়া কলেজের ছাত্র আমিনুল ইসলাম ওরফে আল আমিনের বাবা নুরুল ইসলাম গেলো মঙ্গলবার বান্দরবান চিফ জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট আদালতে হত্যা মামলার আবেদন করেন। সেখানে তিনি বম সম্প্রদায়ের ওই প্রশিক্ষকদের দায়ী করেছেন। আবেদনটি আমলে নিয়ে পুলিশকে তদন্ত করার নির্দেশ দিয়েছেন আদালত। তাঁরা হলেন- লালমোহন রিয়াল ওরফে কর্নেল সলোমান, ভাঙচুর লিয়ান, লালমুন সাং বম ওরফে পাদন ও দিদার ওরফে চম্পাই।
আবেদনে বম সম্প্রদায়ের নাথানা লনচে ওরফে নাথানকেও দায়ী করা হয়। তাঁদের সহায়তা করেন সাংরেম বম ক্যাপ্টেন ও সাংপা। আদালত আমিনুলের বাবার ওই অভিযোগ আমলে নিয়ে পুলিশকে তদন্ত করার নির্দেশ দিয়েছেন। গোয়েন্দারা বলছেন, তাঁদের গ্রেপ্তারের চেষ্টা চলছে।
নিখোঁজ তরুণদের পরিবারের সদস্য ও একাধিক কর্মকর্তার সঙ্গে কথা বলে এসব তথ্য পাওয়া গেছে। এ ছাড়া র্যাবের হাতে গ্রেপ্তার পাঁচ জঙ্গি গতকাল আদালতে ১৬৪ ধারায় জবানবন্দি দিয়েছেন। কারা, কীভাবে তাঁদের সহায়তা করেছিল- এসব তথ্য সেখানে উঠে আসে।
র্যাব কর্মকর্তা জানান, পাহাড়ে জঙ্গি আস্তানায় গিয়ে কুমিল্লার ছাত্র আমিনুল ছাড়া আরও একজন মারা গেছেন। তিনি হলেন নোয়াখালীর সোনাইমুড়ীর জোহায়ের বিন রহমান। জঙ্গিরা তাঁর নতুন নাম দিয়েছিলেন ডা. আহমেদ। গ্রেপ্তার জঙ্গিরা
গোয়েন্দাদের জানান, আস্তানায় তাঁদের মূল প্রশিক্ষক ছিলেন বম সম্প্রদায়ের ওই চার ব্যক্তি। অস্ত্র চালানোসহ শারীরিক নানা কসরত তাঁদের শেখাতেন লালমোহন রিয়াল ওরফে কর্নেল সলোমান, ভাঙচুর লিয়ান, লালমুল সাং বম ওরফে পাদন ও দিদার ওরফে চম্পাই।
চুক্তি অনুযায়ী উগ্রপন্থি সংগঠনের সদস্যরা অর্থ দেবে কেএনএফকে। এর বিনিময়ে আস্তানায় যাওয়া তরুণদের খাবার ও প্রশিক্ষণ দেবে কেএনএফ। তবে পাহাড়ে অভিযান শুরুর পর সঠিকভাবে খাবার সরবরাহ করতে পারছিল না কেএনএফ। আবার জঙ্গিরা তাঁদের ঠিকঠাক অর্থ দিতে ব্যর্থ হয়। এতে কয়েকজন জঙ্গি ক্ষুধায় অসুস্থ হয়ে পড়েন।
জঙ্গিদের কেউ কেউ গোয়েন্দাদের জানান, বান্দরবানের রুমার গহিন অরণ্যে না খেয়ে, রোগে আক্রান্ত হয়ে মারা গেছেন কুমিল্লার তরুণ আমিনুল। তবে তাঁর বাবার দাবি, ভুল বুঝতে পেরে সঠিক পথে ফেরার চেষ্টা করলে জঙ্গিরা তাঁর ছেলেকে খুন করেছে।
এর পর লাশ গুম করতে লুয়াংমুয়ালপাড়ায় পুঁতে রাখা হয়। ছলে-বলে-কৌশলে তরুণদের প্রলুব্ধ করে জঙ্গিবাদে জড়িয়েছে একটি চক্র। এই চক্রে কুমিল্লার কুবা মসজিদের ইমাম হাবিবুল্লাহ হাবিবসহ আরও অনেকে রয়েছেন। তাঁরা তরুণদের মগজ ধোলাই করেছেন। তাঁদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি চেয়েছেন আমিনুলের বাবা।
র্যাব জানায়, এখন পর্যন্ত দেশের বিভিন্ন জেলা থেকে ৫৫ তরুণ কেএনএফের ক্যাম্পে প্রশিক্ষণ নিতে যান। বিভিন্ন অভিযানে ১২ জনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। দু'জন পাহাড়ে মারা গেছেন। বাকি ৪১ জনের খোঁজ নেই। নিখোঁজ তরুণরা ছাড়াও জঙ্গিদের অর্থদাতা, প্রশিক্ষক ও শূরা সদস্যদের গ্রেপ্তারে জঙ্গিবিরোধী অভিযান অব্যাহত রয়েছে।
আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর অভিযানে কেএনএফের আস্তানা ও প্রশিক্ষণ ছাউনির কিছু ধ্বংস হয়েছে। আবার কিছু আস্তানা সরিয়ে নেওয়া হয়েছে। জঙ্গি আস্তানার আশপাশে পাথরের গায়ে কেএনএফ নামটি খোদাই করা ছিল। বম জঙ্গিরা খ্রিষ্টান ধর্মালম্বী। তবে জঙ্গিরা তাঁদের আস্তানায় গিয়ে প্রশিক্ষণ নেয়ার আগে নিজেদের মতো করে ইসলামের একটি ব্যাখ্যা হাজির করে।
আরও পড়ুন: চট্টগ্রামে হেলে পড়েছে চারতলা ভবন
কুমিল্লা থেকে নিখোঁজ তরুণ আমিনুলের লাশের সন্ধানে গত সোমবার লুয়াংমুয়ালপাড়া এলাকায় প্রায় পাঁচ ঘণ্টা অভিযান চালানো হয়। ওই এলাকাটি থানচি থেকে ২৯ কিলোমিটার ও রুমা থেকে ৫০ কিলোমিটার দূরে। অভিযানের সময় তামলাওপাড়ার বমরা জানিয়েছেন, কেএনএফ জঙ্গিগোষ্ঠীর অত্যাচারে ও নানামুখী চাপে পাড়াবাসী টিকতে না পেরে কোথাও চলে গেছেন। একইভাবে পাশের পাইনুয়ামপাড়ায়ও কেউ নেই।
পাহাড়ের কুকি-চীন ন্যাশনাল ফ্রন্ট (কেএনএফ) ও জামাতুল আনসার ফিল হিন্দাল শারক্বিয়ার অত্যাচার, ভয়, নানামুখী চাপে পাড়া (গ্রাম) ছেড়ে পালিয়েছে বম সম্প্রদায়ের ২৭টি পরিবার। বান্দরবানের রুমা উপজেলা রেমাক্রিপ্রাংসা ইউনিয়নের লুয়াংমুয়াল পাড়া ও পাইনুয়াম পাড়ার সবাই নিরাপদ আশ্রয়ের খোঁজে অন্যত্র চলে গেছেন।
গত বছরের ডিসেম্বরের শুরুর দিকে পাড়া ছেড়ে অন্য জায়গায় পালায় পাড়ার লোকজন। এছাড়া রুমা উপজেলার তিনঢলপিপাড়া, চাইক্ষ্যংপাড়া, চিলপিপাড়াসহ আরও কয়েকটি পাড়ার বেশ কিছু পরিবার এলাকা ছেড়ে অন্যত্র চলে গেছে বলে স্থানীয়রা জানিয়েছে। কেএনএফ ও জঙ্গিদের অত্যাচারসহ নানামুখী চাপে পড়ে পাশের দেশ ভারতের মিজোরাম ও মিয়ানমারেও আশ্রয় নিয়েছে বলে জানা গেছে।
একাত্তর/আরবিএস
