গাজা উপত্যকায় ইসরাইল গণহত্যা চালাচ্ছে, এমন কথা বিশ্বাস করে না যুক্তরাষ্ট্র। মার্কিন জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা জ্যাক সুলিভান বলেছেন, গাজায় যা ঘটছে তা একটি গণহত্যা বলে আমরা বিশ্বাস করি না। তাঁর এমন মন্তব্যের পরপরই হামাসের বিরুদ্ধে যুদ্ধে জয় পেতে ইসরাইলকে গাজায় পারমাণবিক বোমা ফেলার আহবান জানিয়েছেন মার্কিন সেনেটর লিন্ডসে গ্রাহাম।
আবারও গাজার উত্তরে অভিযান চালিয়ে দক্ষিণের দিকে অগ্রসর হচ্ছে ইসরাইলি সেনারা। সোমবার গাজার এমন এলাকাগুলোতে তারা অভিযান চালিয়েছে, যেখানে কয়েক মাস আগে হামাসকে পরাজিত করার দাবি করেছিলো। উপত্যকার দক্ষিণের রাফাহ শহরের মহাসড়কে ইসরাইলি ট্যাংক ও সেনারা অবস্থান নিয়েছে। দক্ষিণ অংশেও কয়েক সপ্তাহ ধরে তুমুল লড়াই চলছে।

নতুন করে সংঘাত ছড়িয়ে পড়ায় আবারও হাজারো ফিলিস্তিনি নতুন আশ্রয়ের খোঁজে বের হয়েছেন। ত্রাণ সংস্থাগুলো বলছে, মানবিক সংকট আরও তীব্র হয়েছে। ইসরাইলি হামলা এরিমধ্যে কেড়ে নিয়েছে ৩৫ হাজারের বেশি ফিলিস্তিনির প্রাণ; যাদের মধ্যে নারী ও শিশুর সংখ্যাই বেশি। বিধ্বস্ত হয়েছে হাজার হাজার বাড়িঘর, হাসপাতাল ও শিক্ষা প্রতিষ্ঠানসহ বহু অবকাঠামো।
এমন পরিস্থিতির পরও সেখানে গাজায় কোন গণহত্যা দেখতে পাচ্ছে না ইসরাইলের প্রধান দোসর যুক্তরাষ্ট্র। প্রেসিডেন্ট বাইডেনের শীর্ষ জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা জ্যাক সুলিভান সোমবার এক সাংবাদিক সম্মেলনে বলেন, গাজায় যা ঘটছে তা একটি গণহত্যা বলে আমরা বিশ্বাস করি না। তবে আমরা বিশ্বাস করি, নিরপরাধ বেসামরিক নাগরিকদের সুরক্ষা ও সুস্থতা নিশ্চিত করতে ইসরায়েল আরও অনেক কিছু করতে পারে।
তিনি বলেন, প্রেসিডেন্ট বাইডেন হামাসকে পরাজিত দেখতে চেয়েছিলেন। তবে তিনি ফিলিস্তিনি বেসামরিক লোকদের ‘নরকে’ পড়তে দেখেছেন। চলমান রাফা অভিযানের মধ্য দিয়ে এই কৌশলগত খেলার শেষ হতে হবে। একই সঙ্গে এই প্রশ্নেরও উত্তর বের করে আনতে হবে যে, এরপর কী হবে? চলমান যুদ্ধে সামগ্রিকভাবে ইসরাইলও অনেক ক্ষতির মুখে পড়েছে বলে সংবাদ সম্মেলনে স্বীকার করেন জ্যাক সুলিভান।

তার এমন মন্তব্যের পরই আমেরিকার এক আইনপ্রণেতা গাজায় পরমাণবিক বোমা ফেলতে ইসরাইলের প্রতি আহবান জানিয়েছেন। হিরোশিমা ও নাগাসাকির মতো ফিলিস্তিনের গাজাতেও পারমাণবিক বোমা হামলা চালানোর পক্ষে সাফাই গেয়েছেন মার্কিন সিনেটের লিন্ডসে গ্রাহাম। পারমাণবিক বোমা হামলা চালাতে ইসরাইলের প্রতি আহবানও জানিয়েছেন তিনি। এক অনুষ্ঠানে বক্তব্য দিতে গিয়ে তিনি একথা জানান।
সিনেটর লিন্ডসে গ্রাহাম বলেন, আমরা জাপানের হিরোশিমা ও নাগাসাকিতে বোমা ফেলে যুদ্ধ শেষ করার সিদ্ধান্ত নিয়েছিলাম। সেটি সঠিক সিদ্ধান্ত ছিলো। তাই ইসরাইলকে পারমাণবিক বোমা দেয়া উচিত, যাতে তারা এই যুদ্ধ শেষ করতে পারে। তারা হারতে পারে না। ইসরাইলের কট্টর সমর্থক হিসেবে পরিচিত এই সিনেটর অস্ত্র সরবরাহ বন্ধ করে দেয়ায় বাইডেন প্রশাসনের বিরুদ্ধে তীব্র সমালোচনাও করেন।
রোববার এনবিসি নিউজের এক সাক্ষাৎকারে মার্কিন ওই সিনেটর বলেন, চলমান অস্তিত্বের যুদ্ধে হামাসের বিরুদ্ধে ইসরাইলের জয় পাওয়ার জন্য তাদের যা প্রয়োজন তাই করতে হবে। ঠিক যেভাব দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় জাপানের হিরোশিমা ও নাগাসাকিতে যুক্তরাষ্ট্রের পারমাণবিক বোমা ফেলাও ন্যয়সঙ্গত ছিল। গাজায় বেসামরিক হতাহতের জন্য হামাস দায়ী। এ যুদ্ধে বিজয় অর্জন না হওয়া পর্যন্ত তিনি ইসরায়েলকে লড়াই চালিয়ে যাওয়ার আহ্বান জানান। আর সেটা যে কোনো মূল্যেই হোক না কেন।
গ্রাহাম বলেন, পার্ল হারবারে হামলার পরে যখন আমরা জাতি হিসেবে জার্মান এবং জাপানিদের সঙ্গে যুদ্ধে ধ্বংসের মুখোমুখি হয়েছিলাম, আমরা হিরোশিমা ও নাগাসাকিতে পারমাণবিক অস্ত্র দিয়ে বোমা হামলা করে যুদ্ধ শেষ করার সিদ্ধান্ত নিয়েছিলাম। সুতরাং ইসরাইলকে ইহুদি রাষ্ট্র হিসেবে টিকে থাকার জন্য যা প্রয়োজন তাই করতে হবে। ইসরাইলকে পারমাণবিক বোমা দেওয়া উচিত যাতে করে তারা এ যুদ্ধ শেষ করতে পারে।
ইসরাইলের কট্টর এই সমর্থক নিজ দেশের প্রেসিডেন্ট বাইডেনের তীব্র সমালোচনা করেন। তিনি বলেন, ইসরাইলকে অস্ত্র দেয়ার বন্ধ করা উচিত হয়নি। এ ছাড়া গাজায় বেসামরিক প্রাণহানির জন্য হামাসকেই দায়ী করেন। তিনি অভিযোগ করেন, হামাস বেসামরিক নাগরিকদের মানবঢাল হিসেবে ব্যবহার করছে।
গাজায় পারমানবিক হামলা করতে গ্রাহামই প্রথম নন, এর আগেও আরেক মার্কিন আইনপ্রণেতা একই কথা উচ্চারণ করেছিলেন। গেল মাসে মার্কিন সংবাদমাধ্যম সিএনএন জানায়, গাজায় বিধ্বংসী পরমাণু হামলা চালানোর আহবান জানিয়েছেন একজন হাই প্রোফাইল রাজনীতিবিদ। যিনি দেশটির পার্লামেন্ট কংগ্রেসের সদস্য এবং রিপাবলিকান পার্টির গুরুত্বপূর্ণ একজন নেতা। জানা গেছে, তার নাম টিম ওয়েলবার্গ।

গত ২৫ মার্চ একটি টাউন হলে অন্য আইনপ্রণেতাদের সঙ্গে কথা বলার সময় গাজায় পারমাণবিক বোমা হামলার পরামর্শ দেন তিনি। ওই সময় জাপানের হিরোশিমা ও নাগাসাকিতে যুক্তরাষ্ট্রের চালানো ভয়াবহ পারমাণবিক হামলার কথা উল্লেখ করেন এই প্রবীণ রাজনীতিবিদ। বলেন, জাপানে যেমন পারমাণবিক হামলার পর যুদ্ধ বন্ধ হয়ে গিয়েছিল। তেমনই গাজায় এ ধরনের হামলা হলে দ্রুত যুদ্ধ শেষ হয়ে যাবে।
গাজায় মানবিক সহায়তা পৌঁছাতে যুক্তরাষ্ট্র কেন মার্কিন নাগরিকদের অর্থ খরচ করে অস্থায়ী জেটি তৈরি করছে, এমন এক প্রশ্নের জবাবে টিম ওয়েলবার্গ বলেন, সেখানে জেটি বানানো উচিত হয়নি। সেখানে মানবিক সহায়তার জন্য একটি পয়সাও খরচ করা ঠিক হয়নি বলেও মন্তব্য করেন তিনি। উল্টো বলেন, গাজার অবস্থা নাগাসাকি ও হিরোশিমার মতো অবস্থা হওয়া উচিত। দ্রুত সব কিছু করা হোক।
তবে এই আইনপ্রণেতা গাজায় সত্যিকার পারমাণবিক হামলার কথা বলেননি বলে দাবি করেছেন। এর বদলে সেখানে রূপক অর্থ ব্যবহার করেছেন বলেও দাবি করেছেন তিনি। এই আইনপ্রণেতা আরও বলেছেন, তিনি চান রাশিয়া ও ইউক্রেনেও একই পদ্ধতি ব্যবহার করা হোক। এতে দ্রুত যুদ্ধ শেষ হয়ে যাবে এবং সাধারণ মানুষ পরিত্রাণ পাবেন। তিনি যুদ্ধের পরিপন্থী বলেও দাবি করেন।
উল্লেখ্য, এর আগে গেলো নভেম্বরে গাজাতে পরমাণু বোমা ফেলার পরমর্শ দিয়ে চাকরি হারিয়েছিলেন এক ইসরাইলি মন্ত্রী। এক রেডিও সাক্ষাৎকারে উগ্রপন্থী ওটজমা ইহুদিত পার্টির অতি ডানপন্থী নেতা এবং দেশটির ঐতিহ্যমন্ত্রী আমিচাই এলিয়াহু বলেন, ইসরাইলের উচিত ইতিমধ্যে গণহত্যার শিকার গাজা উপত্যকার ওপর একটি পারমাণবিক বোমা ফেলা। এরপরই তাকে বরখাস্ত করেন ইসরাইলি প্রধানমন্ত্রী নেতানিয়াহু।
