জনসম্মুখে ভলোদিমির জেলেনস্কির সঙ্গে ভ্লাদিমির পুতিনকে গুলিয়ে ফেলার মাত্র দুই ঘণ্টা পর, জো বাইডেন একই ঘটনার পুনরাবৃত্তি করেছেন ভাইস প্রেসিডেন্ট কমলা হ্যারিসকে নিয়েও। এবার নিজের প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী ডোনাল্ড ট্রাম্পের সঙ্গে মিশিয়েছেন কমলাকে। আর এতে নতুন করে হতাশা ও ক্ষোভ ছড়িয়ে পড়েছে ডেমোক্র্যাট শিবিরে। আসন্ন নির্বাচনে পুনরায় জেতার বিষয়ে বাইডেনের সক্ষমতা নিয়ে উদ্বেগের শেষ নেই তাদের।
একটি অনুষ্ঠানে কমলা হ্যারিসের প্রতি তার আস্থা সম্পর্কে প্রশ্ন করা হলে মার্কিন প্রেসিডেন্ট জো বাইডেন জবাব দেন, আমি কখনোই ভাইস প্রেসিডেন্ট হিসেবে ট্রাম্পকে বাছাই করতাম না, যদি না আমি মনে করতাম যে, তিনি প্রেসিডেন্ট হওয়ার যোগ্য নন।
৮১ বছর বাইডেনের এই কথায় অবাক হয়ে যান উপস্থিত সবাই। প্রশ্ন উঠছে, তার স্মৃতিশক্তি কি এতোটাই লোপ পেয়েছে যে, নিজের ভাইস প্রেসিডেন্টের নামও মনে করতে পারছেন না! এমনকি নিজের প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী এবং সাবেক মার্কিন প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পকে তিনি প্রেসিডেন্ট হিসেবে উল্লেখ করছেন।
বৃদ্ধ বাইডেন সম্প্রতি নানা কাণ্ড ঘটিয়ে নিজের সক্ষমতার অভাব ফুটিয়ে তুলেছেন। এই অনুষ্ঠানের মাত্র দুই ঘণ্টা আগে পশ্চিমা সামরিক জোট ন্যাটোর শীর্ষ সম্মেলনে আরেক কাণ্ড ঘটান তিনি। সেখানে ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জেলেনস্কিকে প্রশংসা করতে গিয়ে তাকে ভ্লাদিমির পুতিন হিসেবে উল্লেখ করেন। খুব দ্রুত বাইডেন নিজের ভুল সংশোধন করে নিলেও এ ঘটনায় তাজ্জব বনে যান উপস্থিত অতিথিরা।

গত ২৭ জুন ট্রাম্পের সঙ্গে বিতর্কে লেজেগোবরে পাকিয়ে ফেলেন বাইডেন। তার বিপর্যয়কর পারফরম্যান্সের জন্য বয়সকে দায়ী করে মার্কিন গণমাধ্যমগুলো। নিজেকে সংশোধন করে সগৌরবে প্রত্যাবর্তনের অঙ্গীকার করেছিলেন বাইডেন। কিন্তু এরপরও একের পর তালগোল পাকিয়ে ফেলায় সমর্থকদের মধ্যে হতাশা বেড়েই চলেছে। সেই হতাশা এখন রূপ নিচ্ছে ক্ষোভে। বাইডেন নভেম্বরের ভোটে আবারও বিজয়ী হবেন, এ আশা এখন প্রায় ছেড়েই দিয়েছে ডেমোক্র্যাটরা।
বৃহস্পতিবার ওয়াল্টার তিনি ওয়াল্টার ই. ওয়াশিংটন কনভেনশন সেন্টারে জড়ো সাংবাদিকদের মুখোমুখি হন। ট্রাম্পের সঙ্গে বিতর্কের দিন বাইডেন যেভাবে ঘাবড়ে গিয়েছিলেন, তেমনটি এদিন দেখা যায়নি। তাকে বেশ সজীব দেখাচ্ছিল এবং তীক্ষ্ণ ও আত্মবিশ্বাসী মনে হয়েছিল। তবে প্রশ্নের জবাব দিতে গিয়ে গুবলেট পাকিয়ে ফেলেন।
কেবল ডোনাল্ড ট্রাম্পের সঙ্গে সঙ্গে কমলা হ্যারিসকে মিলিয়ে ফেলাই নয়, এদিন বাইডেন তালগোল পাকিয়েছেন আরও। এক প্রশ্নের জবাবে তিনি ভুল করে বলেন, কিছু বলা আগে ‘কমান্ডার ইন চিফ’-এর পরামর্শ অনুসরণ করছেন। সঙ্গে সঙ্গে ‘কমান্ডার ইন চিফ’ শুধরে নিয়ে বলেন, ‘চিফ অব স্টাফ’।
জুন মাসে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের চাকরির প্রতিবেদন প্রকাশ নিয়ে বাইডেন বলেন, দু হাজার কর্মসংস্থান সৃষ্টি হয়েছে। এখানেও ভুল করেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট। প্রকৃতপক্ষে এই সংখ্যাটি হবে দুই লাখ।
অবশ্য নিজের দুর্বলতার কথা স্বীকার করেছেন বাইডেন। বলেন, সম্ভবত তার কাজের সময়সূচি পরিবর্তন করা উচিত, যাতে তিনি আর সকাল ৭টায় দিন শুরু করে মধ্যরাত পর্যন্ত কাজ না করেন। ‘আমাকে একটু ধীরে চলতে হবে,’ যোগ করেন তিনি।
বাইডেন আরও স্বীকার করেন যে, ডেমোক্র্যাটদের উদ্বেগ কমানোর জন্যই ভীষণ ব্যস্ত সময়সূচি বজায় রেখেছেন। সমর্থকরা যেনো তার প্রতি আস্থা না হারান সেজন্যই এত পরিশ্রম বলে জানান তিনি। ‘আমার মনে হয়, ভয় দূর করা গুরুত্বপূর্ণ,’ বলেছেন বাইডেন।
মার্কিন প্রেসিডেন্টের একের পর এক ভুলের কারণে এখন ঘরেই মধ্যেই ভীষণ চাপে বাইডেন। কয়েকজন মার্কিন ধনকুবের প্রকাশ্যে ঘোষণা দিয়েছেন, বাইডেন নির্বাচন করলে ডেমোক্র্যাটটের আর অর্থ দেবেন না তারা। এরপরও বাইডেন অনড়। তিনি পরবর্তী প্রেসিডেন্টের জন্য ভোট করবেন এবং বিজয়ী হবেন বলে দাবি করে আসছেন।

তবে ট্রাম্পের সঙ্গে বিতর্কের পরই ৮১ বছর বয়সী বাইডেনকে ভোটের মাঠ ছাড়ার জন্য প্রচণ্ড চাপ তৈরি হয়েছে। বৈশ্বিক পরাশক্তি যুক্তরাষ্ট্রের পরবর্তী নেতা হিসেবে বয়স্ক বাইডেনকে আর যোগ্য বলে বিবেচনা করা হচ্ছে না। কারণ, বিতর্ক অনুষ্ঠানে পরিষ্কার হয়ে গেছে যে, বাইডেনের আচরণে বয়সের ছাপ স্পষ্ট।
প্রভাবশালী মার্কিন ব্যবসায়ী ও ডেমোক্র্যাটদের অন্যতম ডোনার ডিজনি সিএনবিসি টেলিভিশনকে বলেছেন, ট্রাম্পের সঙ্গে বাইডেন এবার জিততে পারবে, এটা আমি বিশ্বাস করি না।
বিগত বছরগুলোতে দল হিসেবে ডেমোক্র্যাট ও তাদের অসংখ্য প্রার্থীকে সমর্থন-সহযোগিতা দিয়ে আসছেন ডিজনি। বলেন, বাইডেন খুবই ভালো মানুষ এবং দীর্ঘদিন তিনি এই দেশকে সেবা করার জন্য নিজের সর্বোচ্চটা ঢেলে দিয়েছেন। কিন্তু বাস্তবতা খুবই কঠিন। বাইডেন যদি না সরে তাহলে ডেমোক্র্যাটরা হারবেই, এটা আমি শতভাগ নিশ্চিত। আর এই পরাজয়ের পরিণতি হবে অত্যন্ত ভয়াবহ।
হলিউডের প্রযোজক লিন্ডেলফ আসন্ন নির্বাচন উপলক্ষে এরি মধ্যে ডেমোক্র্যাটদের এক লাখ লাখ দান করেছেন। সেই লিন্ডেলফ এক নিবন্ধ লিখে অন্য দাতাদের তহবিল আটকে রাখার অনুরোধ জানিয়েছেন। বাইডেনকে না সরালে অর্থ বন্ধ করার এই ক্যাম্পেইনকে ‘ডেমবার্গো’ হিসেবে অভিহিত করেছেন তিনি।
সাবেক প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামার চিফ অব স্টাফ রম ইমানুয়েলের ভাই এবং হলিউড এজেন্ট অ্যারি ইমানুয়েল কলোরাডোতে একটি সম্মেলনে বলেছেন, ভোটের দৌড় থেকে বাইডেনের সরানোর মূল চাবিকাঠি হলো, অর্থ দেয়া বন্ধ করা। তহবিল এমন এক জিনিস, যা রাজনৈতিক প্রচারাভিযানে রক্ত সঞ্চালনের ভূমিকায় থাকে। টাকা না থাকলে সব শুকিয়ে যাবে।
জেলেনস্কিকে ‘পুতিন’ ডেকে আরও বিপাকে বাইডেন!
বাইডেন না সরলে আর টাকা দেবে না ডোনাররা