৪০০ কোটি টাকার মালিক কে এই পিয়ন?

আপডেট : ১৫ জুলাই ২০২৪, ০৪:২৭ পিএম

দুর্নীতিবিরোধী চলমান অভিযানের মধ্যে নিজের পিওনের ৪০০ কোটি টাকা কামায় করায় তাকে বের করে দেওয়া হয়েছে- প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার এ বক্তব্যের পর তোলপাড় শুরু হয়েছে। প্রশ্ন উঠেছে, অবৈধভাবে ভাবে ৪০০ কোটি টাকা বানানো কে সেই পিওন? এখন তিনি কোথায় আছেন? কীইবা করছেন? কীভাবে এতো অঢেল সম্পদের মালিক হলেন এক পিওন?

রোববার গণভবনে সংবাদ সম্মেলনে এক প্রশ্নের জবাবে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেন, দুর্নীতির বিরুদ্ধে তাঁর সরকার জিরো টলারেন্স নীতি অনুসরণ করে যাচ্ছে এবং দুর্নীতির বিরুদ্ধে অভিযান চলতে থাকবে। আমরা এখন দুর্নীতিবাজদের ধরতে পারছি বলেই সবাই জানতে পারছে। আমার বাসায় কাজ করে গেছে, সেই পিয়নও ৪০০ কোটি টাকার মালিক। সে হেলিকপ্টার ছাড়া চলে না। আর, এটাই বাস্তব কথা।

নিজের সেই পিওনের বিষয়ে প্রধানমন্ত্রী বলেন, আমি যখন জানলাম সঙ্গে সঙ্গে তাকে (পিয়ন) বাসা থেকে বের করে দিয়েছি। তার কার্ড-টার্ড (পরিচয়পত্র) সব বাজেয়াপ্ত করে নিয়েছি। ধরার পড়ার পরই এখন সবাই জানতে পেরেছে।

প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার বাসায় কাজ করা সেই পিওন হলেন জাহাঙ্গীর আলম। প্রধানমন্ত্রী বাসভবন ও কার্যালয়ে যাতায়াতের সুবাদে অত্যন্ত প্রতাপশালী এই ব্যক্তি বহু অনিয়মে জড়িয়ে পড়েন। নানা জায়গায় হস্তক্ষেপ করে চাঁদাবাজি ও তদবিরের মাধ্যমে অবৈধ সম্পদের পাহাড় গড়ে তোলেন। জাহাঙ্গীর চক্রে জড়িত হন আরও কয়েকজন।

ক্ষমতার অপব্যবহার করে জাহাঙ্গীর শুধু অবৈধ সম্পদই অর্জন করেননি, বাগিয়ে নেন আওয়ামী পদ-পদবিও। গত জানুয়ারিতে অনুষ্ঠিত দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে নোয়াখালীর চাটখিল ও সোনাইমুড়ী আসনে নৌকার মনোনয়ন চেয়েছিলেন জাহাঙ্গীর। তবে না পেয়ে স্বতন্ত্র হিসেবে মনোনয়নপত্র জমা দেন। তবে শেষমেশ আর ভোট করতে পারেননি।

বেপরোয়া জাহাঙ্গীরের বিষয়ে অভিযোগ আসে খোদ প্রধানমন্ত্রীর কাছে। এরপরই অনিয়মে জড়িয়ে পড়া পিওনের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়ার খবর প্রথম সামনে আসে গত ডিসেম্বরে। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার ব্যক্তিগত সহকারী পরিচয় দিয়ে নানা ‘অনৈতিক’ কাজে জড়িত জাহাঙ্গীর আলমের বিষয়ে সতর্ক থাকার অনুরোধ জানিয়েছে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় থেকে তখন বিজ্ঞপ্তি দেওয়া হয়।  

বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, জাহাঙ্গীর আলম নিজেকে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার ব্যক্তিগত সহকারী পরিচয় দিয়ে বিভিন্ন অনৈতিক কাজ করে বেড়াচ্ছেন। তার সঙ্গে প্রধানমন্ত্রী এবং প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের কোনো সম্পর্ক নেই।

আর এ বিষয়ে সবাইকে সতর্ক থাকার অনুরোধ জানিয়ে প্রয়োজনে নিকটস্থ আইন প্রয়োগকারী সংস্থার সহায়তা নিতেও প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের ওই বিজ্ঞপ্তিতে অনুরোধ জানানো হয়।

এরপর গত কয়েকমাস জাহাঙ্গীরের বিষয়ে তেমন কোনো আলোচনা শোনা যায়নি। প্রধানমন্ত্রীর সংবাদ সম্মেলনের পর বিষয়টি আবার সামনে আসে। এরপরই জাহাঙ্গীরের অসংখ্য অনিয়মের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণের প্রক্রিয়া শুরু হয়ে গেছে।

কেন্দ্রীয় ব্যাংকের বাংলাদেশ ফিন্যান্সিয়াল ইন্টেলিজেন্স ইউনিট (বিএফআইইউ) মো. জাহাঙ্গীর আলমের ব্যাংক হিসাব অবরুদ্ধ (ফ্রিজ) করার নির্দেশ দিয়েছে। জাহাঙ্গীর, তার স্ত্রী কামরুন নাহার ও তাদের স্বার্থসংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের সব ব্যাংক হিসাব অবরুদ্ধ করতে নির্দেশ দিয়েছে বিএফআইইউ। আর তাদের সব ব্যাংক হিসাবের লেনদেনের তথ্যও চাওয়া হয়েছে। অ্যাকাউন্ট খোলার ফরমসহ যাবতীয় তথ্য পাঁচ দিনের মধ্যে পাঠাতে নির্দেশ দিয়েছে বিএফআইইউ।

কে এই জাহাঙ্গীর?

জাহাঙ্গীরের কীভাবে উত্থান সে বিষয়ে খুব বেশি জানা যায়নি। তবে অনেকদিন আগে তিনি শেখ হাসিনার বাসার ‘কাজের লোক’ হিসেবে পরিচিত হন। আর এলাকায় তিনি পরিচিত ‘পানি জাহাঙ্গীর’ নামে। নোয়াখালীর চাটখিল উপজেলার খিলপাড়ায় বাড়ি জাহাঙ্গীরের। তার বাবা মৃত রহমত উল্ল্যাহ।

শেখ হাসিনা বিরোধীদলে থাকার সময় তার বাসভবন ‘সুধা সদনের’ ব্যক্তিগত স্টাফ হিসেবে কাজ করেছেন জাহাঙ্গীর। সেসময় বিভিন্ন প্রোগ্রামে শেখ হাসিনার জন্য যে খাবার পানি বাসা থেকে নেওয়া হতো, সেটাই বহন করে নিয়ে যেতেন এই জাহাঙ্গীর। এজন্য তিনি ‘পানি জাহাঙ্গীর’ হিসেবে পরিচিতি হয়ে ওঠেন।

পরে শেখ হাসিনা প্রধানমন্ত্রী হলে তার ব্যক্তিগত কর্মচারী হিসেবে কাজ করে যান জাহাঙ্গীর। প্রধানমন্ত্রীর ব্যক্তিগত কর্মচারী হিসেবে কাজ করলেও তিনি নিজেকে ব্যক্তিগত সহকারী হিসেবে পরিচয় দিতেন।

কর্মচারী হয়েও নিজেকে প্রধানমন্ত্রীর ব্যক্তিগত সহকারী পরিচয় দিয়ে নানা তদবির-চাঁদাবাজি করে কোটি কোটি টাকা কামিয়েছেন জাহাঙ্গীর। বাকপটু এই ‘কাজের লোক’ সহজেই প্রভাব বিস্তার করতে পারতেন। অন্যান্যদের সঙ্গে কথা বলতেন ধমকের সুরে। তাকে প্রধানমন্ত্রীর আশেপাশে দেখা যাওয়ায় অনেক প্রভাব ও বিত্তশালীরাও জাহাঙ্গীরকে সমঝে চলতেন। সঙ্গে নিয়ে ঘুরতেন নিজের লাইসেন্স করা অস্ত্র।

আর ক্ষমতার প্রভাব খাটিয়ে তদবির, টেন্ডারবাজি, নিয়োগ বাণিজ্যসহ নানা অপকর্মে লিপ্ত হন জাহাঙ্গীর। প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের পরিচয় ব্যবহার করে গাজীপুরের ইপিজেড এলাকার ঝুট ব্যবসাও নিয়ন্ত্রণ করতেন তিনি।

অবৈধভাবে বিপুল অর্থ-সম্পদ গড়ার পর রাজনীতির ময়দানে নেমে পড়েন পিয়ন জাহাঙ্গীর। বাগিয়ে নেন চাটখিল উপজেলা আওয়ামী লীগের সহ-সভাপতির পদ।

পিওন জাহাঙ্গীরের কত সম্পদ?

নানা অনিয়ম, দুর্নীতির মাধ্যমে বিপুল বিত্ত-বৈভব গড় তোলেন জাহাঙ্গীর। নির্বাচনী হলফনামাতে তিনি সম্পদের যে তথ্য বিবরণী দিয়েছেন, তা রীতিমতো বিস্ময়কর। নোয়াখালী ও রাজধানীসহ বিভিন্ন জায়গায় রয়েছে জাহাঙ্গীরের অঢেল সম্পদ। একাধিক ফ্ল্যাট, বাড়ি, গাড়ি, জমি, দোকান, কোম্পানির মালিকানাসহ বিপুল সম্পদ তার।

ঢাকায় একাধিক প্লট-ফ্ল্যাটের মালিক জাহাঙ্গীর। ধানমন্ডিতে স্ত্রীর নামে আড়াই হাজার বর্গফুটের একটি ফ্ল্যাট কিনেছেন। নোয়াখালীর মাইজদী শহরের হরিনারায়ণপুরে আট তলা একটি বাড়ি রয়েছে। সেটিও স্ত্রীর নামে। রাজধানীর মোহাম্মদপুর ও নিউমার্কেটে দুটি দোকান রয়েছে তার। মিরপুরে একটি সাত তলা ভবন ও দুটি ফ্ল্যাট রয়েছে।

দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের হলফনামায় জাহাঙ্গীর কৃষিখাত থেকে প্রতি বছর ৪ লাখ টাকা, বাড়ি ও দোকান ভাড়া থেকে সাড়ে ১১ লাখ টাকা, শেয়ার, সঞ্চয়পত্র ও ব্যাংক আমানত থেকে ৯ লাখ টাকা এবং চাকরি থেকে ৬ লাখ ও অন্যান্য উৎস থেকে প্রায় সাড়ে পাঁচ লাখ টাকা আয়ের তথ্য জানান। হলফনামার হিসাব অনুযায়ী বছরে প্রায় ৫০ লাখ টাকার আয় তার।

হলফনামার তথ্য অনুযায়ী, জাহাঙ্গীরের নিজের নামে আড়াই কোটি টাকা ও স্ত্রীর নামে ব্যাংকে প্রায় সোয়া এক কোটি টাকা ছিল। ডিপিএস ছিল পৌনে তিন লাখ টাকা, এফডিআর সোয়া এক কোটি টাকা। স্ত্রীর নামে কিনেছেন গাড়ি। বিভিন্ন কোম্পানিতে কোটি টাকার শেয়ারও রয়েছে। এছাড়া একটি অংশীদারি প্রতিষ্ঠানে তার ছয় কোটি টাকার বিনিয়োগও রয়েছে।

এসব ঘোষিত সম্পদের বাইরেও জাহাঙ্গীর আরও অঢেল সম্পদের মালিক লে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। তদন্তে সেসব বেরিয়ে আসবে বলে আশা করছেন অনেকেই।

সংসদ সদস্য হওয়ার জন্য নোয়াখালীতে বিপুল অর্থও খরচ করতেন। নগদ টাকা বিলাতেন তিনি। প্রতিটি সভা-সমাবেশের জন্য লাখ লাখ টাকা খরচ করেছেন। ঘুরতেন দামি গাড়িতে। মাঝেমধ্যেই তিনি নিজ এলাকায় যাতায়াত করতেন হেলিকপ্টারে। বিভিন্ন সময় সরকারের প্রভাবশালী অনেক মন্ত্রী ও গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিদের এলাকায় দাওয়াত করে নিয়ে যেতেন জাহাঙ্গীর।

পিওন জাহাঙ্গীর কোথায়?

প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সংবাদ সম্মেলনের পরই লাপাত্তা হয়ে গেছেন জাহাঙ্গীর আলম। তাকে কোথাও খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না। বিপুল বিত্ত- বৈভবের মালিক বনে যাওয়া বিষয়ে জাহাঙ্গীরের বক্তব্য জানকে তার ব্যক্তিগত মোবাইলে যোগাযোগ করা হলে তা বন্ধ পাওয়া যায়।

নির্ভরযোগ্য সূত্রের বরাতে একটি গণমাধ্যমের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, জাহাঙ্গীর বুঝতে পেরেছেন, যে কোনো সময় তাকে গ্রেফতার করা হতে পারে। এজন্য যেভাবেই হোক, দেশ ছাড়ার পরিকল্পনা করছেন।

 

আরবি
অবৈধ সম্পদ অর্জনের অভিযোগে ন্যাশনাল টেলিকমিউনিকেশন মনিটরিং সেন্টারের (এনটিএমসি) সাবেক মহাপরিচালক ও সাবেক সেনা কর্মকর্তা জিয়াউল আহসানের বিরুদ্ধে অনুসন্ধানের সিদ্ধান্ত নিয়েছে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)।
অর্থপাচার ও অবৈধ সম্পদ অর্জনের অভিযোগে সাবেক মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ মন্ত্রী আব্দুর রহমান এবং আওয়ামী লীগের সাবেক তিন সংসদ সদস্যের বিরুদ্ধে অনুসন্ধান শুরু করেছে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)।
সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার ব্যক্তিগত সহকারী (পিওন) জাহাঙ্গীর আলমের দুর্নীতির অনুসন্ধান শুরু করেছে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)।
দেশের বিভিন্ন জায়গায় সন্ত্রাসীরা নাশকতা চালাচ্ছে উল্লেখ করে তাদেরকে শক্ত হাতে দমন করার জন্য দেশবাসীকে আহ্বান জানিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। 
প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান দীর্ঘদিন ধরে রাজপথে ফ্যাসিবাদ বিরোধী যুগপৎ আন্দোলনে শরিক নেতাদের উদ্দেশ্য বলেছেন, আমরা অতীতে একসাথে ছিলাম, আছি এবং একসাথেই থাকবো।
স্বাক্ষরিত জুলাই সনদ অক্ষরে অক্ষরে পালন করবে বিএনপি সরকার। যুগপৎ আন্দোলনের শরিকদের এমনটিই জানিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান।
বিশ্বকাপের ফাইনালে আর্জেন্টিনার বিরুদ্ধে স্পেনের মহাকাব্যিক জয় শুধু একটি ঐতিহাসিক ট্রফি অর্জন আর রূপকথার গল্প নয়, এটি ছিল ফুটবলের এক প্রজন্ম থেকে অন্য প্রজংশে ব্যাটন হস্তান্তরের স্মারক। ফুটবল...
২০২৬ ফিফা বিশ্বকাপের রোমাঞ্চকর ফাইনালে আর্জেন্টিনার বিরুদ্ধে ইনজুরি টাইমে ফেরান তোরেসের অবিশ্বাস্য গোল স্প্যানিশ ফুটবলে নতুন ইতিহাস লিখেছে। ২০১০ সালে আন্দ্রেস ইনিয়েস্তার সেই ঐতিহাসিক জয়ের পর দেশকে...
লোডিং...
সর্বশেষপঠিত

এলাকার খবর