১৬টি ক্ষেত্রে ১৫৫টি সুপারিশ করেছে নির্বাচন কমিশন। এর মধ্যে রয়েছে, দুই বারের বেশি প্রধানমন্ত্রী হতে না পারা, দুই বারের প্রধানমন্ত্রী রাষ্ট্রপতি হতে না পার, বিরোধী দলে ডেপুটি স্পিকার করা, সংসদে ১০০ আসন বৃদ্ধি, এক চতুর্থাংশ নারী সংসদ সদস্য ইত্যাদি।
বুধবার (১৫ জানুয়ারি) প্রধান উপদেষ্টা মুহাম্মদ ইউনূসের কাছে প্রতিবেদন জমার পর এক ব্রিফিং এসব তথ্য জানান সংস্কার কমিশন প্রধান বদিউল আলম মজুমদার।
সব অংশীজনের সঙ্গে আলোচনারভিত্তিতে সুপারিশমালা দেওয়া হয়েছে জানিয়ে বদিউল বলেন, কমিশনকে শক্তিশালী, দায়বদ্ধ করা, ক্ষমতা বাড়ানোসহ নানা সুপারিশ করা হয়েছে। এমনকি কমিশনের ক্ষমতা বাড়ানোর সুপারিশও করা হয়েছে।
গণতান্ত্রিক দেশে কেউ দায়বদ্ধতার ঊর্ধ্বে নয় মন্তব্য করে নির্বাচন সংস্কার কমিশনের প্রধান জানান, হলফনামা যাচাই-বাচাই করার বিষয় বাধ্যতামূলক করা হয়েছে। মিথ্যা তথ্য দিলে বাতিল করা হবে প্রার্থীতাও।
সংসদে ১০০ আসন বাড়ানো ও এক চতুর্থাশ নারী সদস্য রাখার সুপারিশসহ ৫০ শতাংশ দলীয় এবং ৫০ শতাংশ নির্দলীয় প্রার্থী দেওয়ার সুপারিশ করা হয়েছে।
তিনি বলেন, বিগত নির্বাচন কমিশন দায়বদ্ধতার ঊর্ধ্বে ছিলো। এজন্য আমরা গত তিনটি বিতর্কিত নির্বাচন পেয়েছি। যারা অন্যায় করেছে তাদের বিচারের সুপারিশ করা হয়েছে।
২০ জন নিয়ে তত্ত্বাবধায়ক সরকার হওয়া উচিত মন্তব্য করে বদিউল আলম মজুমদার বলেন, তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা ফিরিয়ে এনে জাতীয় ও স্থানীয় নির্বাচন করার সুপারিশ করা হয়েছে। এমনকি পাঁচ বছর পর পর রাজনৈতিক দলগুলোর পুনঃ নিবন্ধন করার সুপারিশও করা হয়েছে।
আমরা লেজুড়বৃত্তিক ছাত্র-শিক্ষক রাজনীতির বিপক্ষে মন্তব্য করে তিনি জানান, ২০১৮ সালে মধ্য রাতের যারা ভোটের আয়োজন করেছিলো তাদের আইনের আওতায় আনার সুপারিশ করা হয়েছে।
কমিশনের সুপারিশের নির্বাচনী ব্যবস্থা অংশে রয়েছে—
- নির্বাচনে ইলেকট্রনিক ভোটিং মেশিন বা ইভিএম ব্যবহারের বিধান বাতিল করা।
- নির্বাচনকালীন সময়ের জন্য আইন প্রয়োগকারী সংস্থার সংজ্ঞায় প্রতিরক্ষা বিভাগকে অন্তর্ভুক্ত করা।
- কোনো আসনে মোট ভোটারের ৪০ শতাংশ ভোট না পড়লে পুনর্নির্বাচন অনুষ্ঠান করা।
- বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নির্বাচন বন্ধ করা, রাজনৈতিক দলগুলোকে সৎ, যোগ্য এবং ভোটারদের কাছে গ্রহণযোগ্য প্রার্থী দেওয়া নিশ্চিত করার লক্ষ্যে জাতীয় নির্বাচনে ‘না-ভোটে’র বিধান প্রবর্তন করা। নির্বাচনে না-ভোট বিজয়ী হলে সেই নির্বাচন বাতিল করা এবং পুনর্নির্বাচনের ক্ষেত্রে বাতিল করা নির্বাচনে কোনো প্রার্থী নতুন নির্বাচনে প্রার্থী হতে না পারার বিধান করা।
কমিশনের সুপারিশের হলফনামা অংশে বলা হয়েছে—
- প্রার্থী কর্তৃক মনোনয়নপত্রের সঙ্গে প্রত্যেক দল তার প্রার্থীদের জন্য প্রত্যয়নপত্রের পরিবর্তে দলের সভাপতি, সাধারণ সম্পাদক বা অনুরূপ পদধারী ব্যক্তি কর্তৃক হলফনামা জমা দেওয়ার বিধান করা, যাতে মনোনীত প্রার্থীর নামের পাশাপাশি মনোনয়ন বাণিজ্য না হওয়ার ও দলীয় প্যানেল থেকে প্রার্থী মনোনয়ন প্রদানের বিষয়টি উল্লেখ থাকে।
- পরবর্তী নির্বাচনের আগে যেকোনো সময় নির্বাচন কমিশন নির্বাচিত ব্যক্তির হলফনামা যাচাই-বাছাই করতে এবং মিথ্যা তথ্য বা গোপন তথ্য পেলে তার নির্বাচন বাতিল করা।
কমিশনের সুপারিশে নির্বাচনী ব্যয় অংশে রয়েছে—
- সংসদীয় আসনের ভোটার প্রতি ১০ টাকা হিসেবে নির্বাচনী ব্যয় নির্ধারণের বিধান করা।
- সকল নির্বাচনী ব্যয় ব্যাংকিং ব্যবস্থা বা আর্থিক প্রযুক্তির (যেমন বিকাশ, রকেট) মাধ্যমে পরিচালনা করা।
- নির্বাচনী আসনভিত্তিক নির্বাচনী ব্যয় নির্বাচন কমিশন কর্তৃক নিবিড়ভাবে নজরদারি করা।
- প্রার্থী এবং দলের নির্বাচনী ব্যয়ের হিসাবের রিটার্নের নিরীক্ষা এবং হিসাবে অসংগতির জন্য শান্তির বিধান করা।
কমিশনের সুপারিশের মনোনয়নপত্র অংশে রয়েছে—
- বাংলাদেশের অভ্যন্তরে আইনি হেফাজতে থাকা ব্যতীত সকল প্রার্থীর সশরীরে মনোনয়নপত্র জমা দেওয়ার বাধ্যবাধকতা তৈরি করা।
- নির্বাচনী তফসিলে মনোনয়নপত্র বাছাইয়ের সময় বৃদ্ধি করা, যাতে হলফনামা যাচাই-বাছাই করা ও আপিল নিষ্পত্তি জন্য পর্যাপ্ত সময় পাওয়া যায়। অন্যদিকে নির্বাচনী প্রচারণার সময় কমানো, যাতে প্রার্থীর নির্বাচনী ব্যয় সাশ্রয় হয়।
- প্রার্থিতা চূড়ান্ত করার ক্ষেত্রে নির্বাচন কমিশনের ক্ষমতা নিরঙ্কুশ করা। এ লক্ষ্যে আদালতের হস্তক্ষেপের বিষয়টি শুধু ‘কোরাম নন জুডিস’ ও ‘ম্যালিস ইন ল’-এর ক্ষেত্রে সীমিত করা।
- মনোনয়নপত্রের সঙ্গে ৫ বছরের আয়কর রিটার্নের কপি জমা দেওয়ার বিধান করা।
- নির্বাচনী তফসিলে মনোনয়নপত্র বাছাইয়ের সময় বৃদ্ধি করা, যাতে হলফনামা যাচাই-বাছাই করা ও আপিল নিষ্পত্তি জন্য পর্যাপ্ত সময় পাওয়া যায়। অন্যদিকে নির্বাচনী প্রচারণার সময় কমানো, যাতে প্রার্থীর নির্বাচনী ব্যয় সাশ্রয় হয়।
কমিশনের সুপারিশে নির্বাচন পর্যবেক্ষণ/গণমাধ্যম অংশে বলা হয়েছে—
- নিশ্চল পর্যবেক্ষণের অনুমতি দেওয়া, যাতে পর্যবেক্ষকেরা সারা দিন কেন্দ্রে থাকতে পারে, কিন্তু ভোটকক্ষে সার্বক্ষণিকভাবে নয়।
- নির্বাচন পর্যবেক্ষক সংস্থাকে প্রাক-নির্বাচনকালীন পর্যবেক্ষণের অফিশিয়াল অনুমতি প্রদান করা।
- পক্ষপাতদুষ্ট ভুয়া পর্যবেক্ষক নিয়োগ বন্ধ করা।
- ব্যক্তি পর্যায়ে পর্যবেক্ষক নিয়োগের বিধান চালু করা।
- পর্যবেক্ষণ প্রতিবেদন ভবিষ্যতে নির্বাচন ভালো করার জন্য কাজে লাগানোর বিধান করা।
- আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষক নিয়োগের শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত ধাপগুলো সংশ্লিষ্ট পর্যবেক্ষক সংস্থার জন্য সুস্পষ্ট করা। সরকারের পরিবর্তে কমিশনের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী পর্যবেক্ষক নিয়োগ দেওয়া।
- নির্বাচন কমিশনের পক্ষ থেকে প্রদত্ত বৈধ কার্ডধারী সাংবাদিকদের সরাসরি ভোটকেন্দ্রে প্রবেশ, অনিয়মের চিত্র ধারণ, নির্বাচনের দিনে মোটরসাইকেল ব্যবহার করার অনুমতি প্রদান করা।
কমিশনের সুপারিশ অংশে নির্বাচনী আচরণবিধি বিষয়ে বলা হয়েছে—
- ব্যানার, তোরণ ও পোস্টারের পরিবর্তে লিফলেট, ভোটার-প্রার্থী মুখোমুখি অনুষ্ঠান, পত্র-পত্রিকায় বিজ্ঞাপন ও সরকারি গণমাধ্যমে প্রচারের সম-সুযোগ প্রদানের বিধান করা।
- সাইবার সুরক্ষা অধ্যাদেশ, ২০২৪ মেনে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রচারণার বিধান করা।
- ১৯৯০ সালের তিন জোটের রূপরেখার মতো রাজনৈতিক দলের জন্য আচরণবিধি প্রণয়ন করা।
সূত্র: দৈনিক প্রথম আলো।
সীমান্তে সমস্যা আসবে, সমাধানও হবে: পররাষ্ট্র উপদেষ্টা