ভারতশাসিত জম্মু-কাশ্মীরের পেহেলগামে হামলাকে কেন্দ্র করে নয়াদিল্লির সঙ্গে ইসলামাবাদের টক্কর বেড়েই চলছে। উত্তেজনার পারদ এতোটাই চড়েছে যে, ভারত-পাকিস্তানের মধ্যে আরেকটি যুদ্ধের সম্ভাবনা দেখতে পাচ্ছেন বিশ্লেষকরা। তারা বলছেন, পূর্ণমাত্রায় যুদ্ধের সম্ভাবনা না থাকলেও আরেকটি কার্গিল হতে পারে।
এরিমধ্যে ভারত ও পাকিস্তান একে অপরের বিরুদ্ধে রণহুঙ্কার দেয়ার পাশাপাশি পরস্পরের বিরুদ্ধে বিভিন্ন পদক্ষেপ নিয়েছে, যার কারণে দুই দেশের কূটনৈতিক সম্পর্কে এখন তলানিতে ঠেকেছে। এই পরিস্থিতিতে পাকিস্তান নিয়ন্ত্রিত আজাদ কাশ্মীরে এখন যেন যুদ্ধ পরিস্থিতি বিরাজ করছে।

গত সাত দিন নিয়ন্ত্রণ রেখা বরাবর ভারত-পাকিস্তানের সেনাদের মধ্যে টানা গুলি বিনিময়ের কারণে বিনিদ্র রাত কাটাচ্ছেন কাছাকাছি এলাকায় বসবাসকারী মানুষরা। এরিমধ্যে সেখানের অনেক বাড়িঘরও ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। যুদ্ধের আশঙ্কায় রীতিমতো বাঙ্কার তৈরির কাজ শুরু করেছেন আজাদ কাশ্মীরের কিছু বাসিন্দা।
নিয়ন্ত্রণরেখা থেকে প্রায় পাঁচ কিলোমিটার দূরে পাকিস্তান শাসিত লিপা উপত্যকার বাসিন্দা এহসান-উল-হক শামি। ওই অঞ্চলের জনসংখ্যা প্রায় ৪০ হাজার এবং সেখানকার বেশিরভাগ মানুষ আইন মেনে চলেন। শামি জানান, পাকিস্তান ও ভারতের সেনাবাহিনীর মধ্যে গোলাগুলির কারণে তারা আতঙ্কে রাত কাটাচ্ছেন।
আইনজীবী শামি বলেন, ভারতীয় এবং পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর মধ্যে ব্যাপক গুলি বিনিময়ে ২০১৯ সালে তার বাড়ি ক্ষতিগ্রস্ত হয়। একইভাবে ২০০২ ও ১৯৯৮ সালে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছিল তার বাড়ি।

এরিমধ্যে আজাদ কাশ্মীরের সব মাদ্রাসা বন্ধ ঘোষণা করা হয়েছে। এক সরকারি নোটিশে বলা হয়েছে, দুই দেশের উত্তেজনার জেরে যে কোনো সময় ভারতীয় সেনাবাহিনী হামলা চালাতে পারে- এমন আশঙ্কায় ১০ দিনের জন্য বন্ধ করা হয়েছে পাকিস্তান শাসিত আজাদ কাশ্মীরের সব মাদ্রাসা।
সম্ভাব্য যুদ্ধকে সামনে রেখে নিয়ন্ত্রণরেখার বিভিন্ন দুর্গম এলাকায় খাবারের সরবরাহ বাড়িয়েছে পাকিস্তান। পাকিস্তানি সংবাদমাধ্যম দ্য ডন জানিয়েছে, আজাদ কাশ্মীরের খাদ্য বিভাগ নিয়ন্ত্রণরেখা (এলওসি) সংলগ্ন ঝুঁকিপূর্ণ এলাকায় আটা সরবরাহ বাড়ানোর কাজ শুরু করেছে।
দুর্গম এলাকাগুলোর মধ্যে যেগুলো সীমান্তের কাছে অবস্থিত, সেগুলোতে সাধারণত শীতের সময় (ডিসেম্বর থেকে মে পর্যন্ত) দীর্ঘদিন সংরক্ষণযোগ্য বিশেষভাবে প্রক্রিয়াজাত আটা মজুত রাখা হয়, যাতে স্থানীয়রা টিকে থাকতে পারেন। তুলনামূলক নিরাপদ ও যাতায়াত সহজ এলাকায় ১৫ দিনের জন্য আটা মজুত রাখা হয়।

কিন্তু আজাদ কাশ্মীরের প্রধানমন্ত্রী চৌধুরী আনোয়ারুল হকের নির্দেশে এবার সীমান্তবর্তী এলাকায় অন্তত দুই মাসের জন্য মজুত বাড়ানোর উদ্যোগ নেয়া হয়েছে। সেখানে খাদ্যমন্ত্রী বলেন, প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশ অনুযায়ী আমরা পুরো সীমান্ত এলাকায় দু’মাসের জন্য পর্যাপ্ত আটা সরবরাহ নিশ্চিত করতে অভিযান শুরু করেছি।
তিনি জানান, সীমান্তে গোলাবর্ষণ বা সামরিক হামলার ঝুঁকিপূর্ণ স্থানগুলো থেকে খাদ্য গুদাম তুলনামূলক নিরাপদ স্থানে সরিয়ে নেয়ার কাজও চলছে, যাতে মানুষের জন্য আটার সহজলভ্যতা ব্যাহত না হয়। যে সব এলাকা প্রায়ই তুষারপাত বা ভারতীয় গোলাবর্ষণে যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়, সেখানে খাদ্য সরবরাহ অব্যাহত রাখতে বিকল্প পরিকল্পনা তৈরির জন্য কর্মকর্তাদের নির্দেশ দেয়া হয়েছে।
আজাদ কাশ্মীরের খাদ্য বিভাগ জানিয়েছে নিয়ন্ত্রণরেখার সব গুদামে ইতোমধ্যেই পর্যাপ্ত আটা মজুত রয়েছে। তবে বর্তমান অনিশ্চিত পরিস্থিতি ও প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশনা অনুযায়ী দুই মাসের জন্য মজুত বাড়ানো হচ্ছে। সব ঠিকাদারকে সর্বোচ্চ সংখ্যক গাড়ি ব্যবহার করে দ্রুততম সময়ে আটা পৌঁছাতে নির্দেশনা দেয়া হয়েছে।
শনিবার আজাদ কাশ্মিরের রাজধানী মুজাফফরাবাদের উপকণ্ঠের একটি মিল থেকে প্রায় ২৫০ টন আটা সীমান্ত এলাকায় পাঠানো হয়েছে। এই চালানগুলো নীলম ও ঝিলম উপত্যকায় পাঠানো হচ্ছে। সব মিলিয়ে যে কোন পরিস্থিতিতে যাতে খাদ্যের সংকট না হয়, সেটি নিশ্চিত করছে আজাদ কাশ্মীর।
দ্য ডন আরেক প্রতিবেদনে জানিয়েছে, আজাদ কাশ্মীরের অনেকেই জানাচ্ছেন, পাকিস্তান সেনাবাহিনীর পাশে থেকে তারা ভারতীয় আগ্রাসনের বিরুদ্ধে লড়তে প্রস্তুত। আজাদ কাশ্মীরের এক বাসিন্দা বলেন, আমরা শান্তি চাই, তবে যদি যুদ্ধ আসে, আমরা প্রস্তুত। এক বিন্দু পাকিস্তানি ভূমি ক্ষতিগ্রস্ত হতে দেব না।
ভারতের দিকেও চলছে প্রস্তুতি। জম্মু-কাশ্মীর অঞ্চলে সাধারণ মানুষ বাঙ্কার নির্মাণে ব্যস্ত। শুধু তাই নয়, যুদ্ধ হলে সেনাবাহিনীর সঙ্গে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে লড়াইয়ে অংশ নিতে চান অনেকেই। স্থানীয়রা বলছেন, তারা সেনাবাহিনীকে খাদ্য, পানি ও অন্যান্য সহায়তা দিতে প্রস্তুত।
উত্তেজনার মধ্যে ক্ষেপণাস্ত্রের পরীক্ষা চালালো পাকিস্তান
এবার পাকিস্তানের রেঞ্জার্স সদস্যকে আটক করলো ভারত