ইরানের পারমাণবিক অবকাঠামোতে হামলা চালানোর বিষয়টি ইসরাইলের সামরিক বাহিনী নিশ্চিত করার পর ইরান মধ্য ও উত্তর ইসরাইলের কিছু অংশে ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চালিয়েছে। ইসরাইলি জরুরি পরিষেবার বরাত দিয়ে ব্রিটিশ বার্তা সংস্থা বিবিসি জানিয়েছে, ইরানি হামলায় কমপক্ষে ১০ জন নিহত হয়েছে, তবে ইরান ইসরাইলি হামলায় হতাহতের বিষয়ে এখনো আনুষ্ঠানিক কোন বক্তব্য দেয়নি।

ইসরাইলের মধ্যাঞ্চল ও উত্তরাঞ্চলে ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র হামলায় শনিবার দিবাগত রাতে আটজন নিহত হওয়ার খবর দিয়েছে বিবিসি। ইসরাইলের জরুরি সেবা কর্তৃপক্ষ মাগেন ডেভিড অ্যাডম (এমডিএ) বলেছে, তেল আবিবের বাত ইয়াম এলাকায় তিনজন নিহত হয়েছেন। নিহত ব্যক্তিদের মধ্যে ৬৯ বছর ও ৮০ বছর বয়সী দুই নারী এবং ১০ বছর বয়সী এক শিশু আছে। আহত হয়েছেন আরও ১০০ জন। ইসরাইলি সংবাদমাধ্যমের খবরে বলা হয়েছে, উত্তরাঞ্চলীয় শহর তামরাতে হামলায় কমপক্ষে পাঁচজন নিহত হয়েছেন।
ইরানের হামলায় ইসরাইলের কেন্দ্রীয় শহর রেহোভে গবেষণাধর্মী বিশ্ববিদ্যালয় উইজম্যান ইনস্টিটিউট অব সায়েন্সেও ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে। বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ বলছে, প্রতিষ্ঠানটির কয়েকটি স্থাপনা নষ্ট হয়েছে। এই হামলায় কেউ হতাহত হয়নি। বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ বলেছে, ক্যাম্পাসের কয়েকটি ভবনে হামলা হয়েছে।

ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাগচি বলেছেন, ইসরাইল হামলা বন্ধ করলে ইরানও হামলা থামাবে। শুক্রবার ইসরাইলের হামলার পর এই প্রথমবারের মতো জনসম্মুখে এলেন আরাগচি। তেহেরানে এক সংবাদ সম্মেলনে তিনি একথা বলেন। ইসরাইলকে উদ্দেশ করে আরাগচি আরও বলেন, হামলা বন্ধ হলে, আমরাও থেমে যাব। তবে ইসরাইল বলছে, ইরানের পরমাণু কেন্দ্রগুলো ধ্বংস করার পরই তারা হামলা বন্ধ করবে।
উল্টো ইরানের সর্বোচ্চ নেতা ধর্মীয় নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনির ওপর হামলার ইঙ্গিত দিয়েছে ইসরাইল। দেশটির সামরিক বাহিনীর একজন কর্মকর্তা ওয়াল স্ট্রিট জার্নালকে দেয়া সাক্ষাৎকারে বলেন, খামেনিও লক্ষ্যবস্তু হবেন- এটা মোটেও উড়িয়ে দেওয়া যায় না। তবে ওই কর্মকর্তা নিজের নাম প্রকাশ করতে চাননি। ওই কর্মকর্তা আরও স্পষ্ট করে বলেন, ইরানের সর্বোচ্চ নেতা ইসরাইলি হামলার সীমার বাইরে নন।

ইরানের ওপর ইসরাইলের সাম্প্রতিক হামলার কড়া জবাব দেওয়ার হুমকি দিয়েছেন আয়াতুল্লাহ আলী খামেনি। এর প্রতিক্রিয়ায় ইসরাইলের প্রতিরক্ষামন্ত্রী ইসরায়েল কাৎজ শনিবার আয়াতুল্লাহ আলী খামেনির উদ্দেশে বলেন, খামেনি ইরানের নাগরিকদের জিম্মি করছেন। ইসরাইলের জনগণের ক্ষতি হলে ইরানকে চড়া মূল্য দিতে হবে। তিনি আরও বলেন, খামেনি যদি ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চালাতে থাকেন, তাহলে তেহরান জ্বলবে।
ইরানের হামলার জবাবে, দেশটির ইস্পাহান প্রদেশে দেশটির প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের সদর দপ্তর লক্ষ্য করে হামলা চালিয়েছে ইসরাইল। ইস্পাহানের নিরাপত্তা বিষয়ক ডেপুটি গভর্নর আকবর সালেহি বলেছেন, সদর দপ্তর থেকে এখনও পর্যন্ত কোনও হতাহতের খবর পাওয়া যায়নি এবং সম্ভাব্য ক্ষয়ক্ষতির মূল্যায়ন করা হচ্ছে। এক ইরানি কর্মকর্তা নিশ্চিত করেছেন, ইরানের ইস্পাহানের কেন্দ্রীয় প্রদেশে হামলা চালানো হয়েছে।

শনিবার রাতেও ইরানের বিভিন্ন সংবাদমাধ্যম জানিয়েছে, তেহরানের নোবোনিয়াদ এলাকায় দেশটির প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়কে লক্ষ্য করে হামলা চালিয়েছে ইসরাইল।
ইরানের রাজধানী তেহরানে দেশটির প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের সদর দপ্তরে বিমান হামলা চালানোর খবর নিশ্চিত করেছে ইসরাইলের সামরিক বাহিনীও। এক বিবৃতিতে ইসরাইলি সামরিক বাহিনী জানায়, তাদের বিমানবাহিনী ইরানের রাজধানীতে বেশ কয়েকটি লক্ষ্যবস্তুতে ধারাবাহিকভাবে অভিযান চালিয়েছে। এর মধ্যে প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের সদর দপ্তর রয়েছে।

ইরানের রাজধানী তেহরানে বড় ধরনের বিস্ফোরণের শব্দ শোনা গেছে। একই সঙ্গে আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা সক্রিয় হওয়ার আওয়াজ শোনা গেছে। কাতারভিক্তিক গণমাধ্যম আল–জাজিরার খবরে বলা হয়, রোববার মাত্র কয়েক মিনিট আগে কমপক্ষে দুটি বড় ধরনের বিস্ফোরণের শব্দ পাওয়া গেছে, যা ইঙ্গিত দেয়- ইসরাইলের হামলা অব্যাহত রয়েছে এবং ইরানও পাল্টা জবাব দিচ্ছে। ইরানের রাষ্ট্রীয় সংবাদমাধ্যমগুলো জানিয়েছে, ইসরাইলি মিসাইল ও ড্রোন ধ্বংসে তেহরানের বিমান প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা সক্রিয় করা হয়েছে।

ইসরাইলি সেনাবাহিনী জানিয়েছে, তেহরানের বিভিন্ন সামরিক স্থাপনাকে তাদের লক্ষ্যবস্তু করা হয়েছে। তাই এসব স্থাপনার কাছাকাছি থাকা বাসিন্দাদের সরে যাবার নোটিশ পাঠিয়েছে। ফার্সি ভাষায় এসব নোটিশে বলা হয়েছে, তারা (আইডিএফ) ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচির সাথে সম্পর্কিত স্থানগুলোতে আক্রমণ করবে এবং তাদের নিজেদের নিরাপত্তার জন্য লোকজনকে চলে যাওয়া উচিত।

একটি নিরাপত্তা সূত্র জানিয়েছে, তেহরানের বাসিন্দাদের সরিয়ে নেওয়ার জন্য ইসরাইলি প্রতিরক্ষামন্ত্রী কাটজের নির্দেশে সরে যাবার নোটিশ দেয়া হয়েছে। আইডিএফ জানিয়েছে, তারা তেহরানের বাসিন্দাদের বার্তা পাঠিয়ে বলেছে, ইরানের অস্ত্র তৈরির কারখানান এবং সংশ্লিষ্ট সুবিধাগুলোতে বা তার কাছাকাছি অবস্থিত সব ব্যক্তিদের অবিলম্বে এলাকাগুলো ছেড়ে যেতে হবে এবং সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে সেটি জানাতে হবে।

তবে তেহরানের বাসিন্দারা জানিয়েছেন, তারা ইসরাইলি নোটিশকে আমলে নিচ্ছেন না। তারা বলেন, তেহরানের কোথায় কোথায় সামরিক স্থাপনা রয়েছে সেটি তাদের জানার কথা নয়। তেহরানের এক বাসিন্দা বলেন, আমি যাদের সাথে কথা বলেছি তাদের মধ্যে তেহরানের নাগরিকরা সবচেয়ে বেশি চিন্তিত ছিলেন। আমি নিজে তেহরান ছেড়ে যেতে পারি না। আমি আমার বৃদ্ধ বাবা-মাকে ছেড়ে যেতে পারি না। তাছাড়া, আমাকে কাজে আসতে হবে।
দীর্ঘমেয়াদি সংঘর্ষে জড়াতে পারে ইরান-ইসরাইল
ইরানের মানচিত্রের একাংশ উড়িয়ে দিতে চায় ইসরাইল