বাংলাদেশে মশাবাহিত রোগের প্রকোপ দিন দিন বেড়েই চলেছে। ডেঙ্গুর আতঙ্কের মধ্যেই চিকুনগুনিয়া নতুন করে উদ্বেগের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। এডিস মশার মাধ্যমে ছড়ানো এই দুটি রোগ জনস্বাস্থ্যের জন্য মারাত্মক হুমকি সৃষ্টি করছে। বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করে বলছেন, একই সঙ্গে ডেঙ্গু ও চিকুনগুনিয়ায় আক্রান্ত হওয়ার ঝুঁকি বাড়ছে।
বুধবার (২০ আগস্ট) বিশ্ব মশা দিবসে মশাবাহিত রোগ সম্পর্কে সচেতনতা বাড়ানোর গুরুত্ব তুলে ধরেন বিশেষজ্ঞরা।
বিশ্ব মশা দিবসের তাৎপর্য
১৮৯৭ সালের ২০ আগস্ট ব্রিটিশ চিকিৎসক ও বিজ্ঞানী স্যার রোনাল্ড রস আবিষ্কার করেন যে, ম্যালেরিয়ার জীবাণু প্লাজমোডিয়াম মশার মাধ্যমে মানুষের শরীরে ছড়ায়। এই আবিষ্কার মশাবাহিত রোগ নিয়ে গবেষণার নতুন দ্বার উন্মোচন করে এবং ১৯০২ সালে রস এই অবদানের জন্য নোবেল পুরস্কার লাভ করেন। এই দিনটি মশাবাহিত রোগের ঝুঁকি সম্পর্কে জনসচেতনতা বাড়াতে বিশ্ব মশা দিবস হিসেবে পালিত হয়। তবে বাংলাদেশে এই দিবস পালনে তেমন উদ্যোগ দেখা যায় না।
ডেঙ্গু ও চিকুনগুনিয়ার প্রকোপ
পরিসংখ্যান অনুযায়ী, ১৯ আগস্ট ২০২৫ পর্যন্ত বাংলাদেশে ডেঙ্গু আক্রান্ত রোগীর সংখ্যা গত বছরের তুলনায় তিন গুণেরও বেশি বেড়েছে এবং মৃত্যু দ্বিগুণ হয়েছে। এডিস মশার বিস্তার এখন নিয়ন্ত্রণহীন। এর পাশাপাশি চিকুনগুনিয়ার প্রকোপও বাড়ছে, যা জনগণের মধ্যে আতঙ্ক ছড়াচ্ছে।

জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের কীটতত্ত্ববিদ ও জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক ড. কবিরুল বাশার বলেন, মশা বিশ্বে মানুষের মৃত্যুর অন্যতম বড় কারণ। প্রতি বছর কোটি কোটি মানুষ ম্যালেরিয়া, ডেঙ্গু, চিকুনগুনিয়া, জিকা ভাইরাস, ইয়েলো ফিভার ও জাপানিজ এনসেফালাইটিসে আক্রান্ত হয়।
মশার প্রজনন ও জলবায়ু পরিবর্তন
অপরিকল্পিত নগরায়ন এবং জলবায়ু পরিবর্তন মশাবাহিত রোগের প্রকোপ বাড়িয়ে দিচ্ছে। অধ্যাপক বাশার জানান, তাপমাত্রা, বৃষ্টিপাতের ধরণ, এবং আর্দ্রতার পরিবর্তন এই রোগের বিস্তারে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে।

শ্যামলীর ২৫০ শয্যাবিশিষ্ট টিবি হাসপাতালের উপ-পরিচালক ডা. আয়েশা আক্তার বলেন, বর্ষার মৌসুমে জলাবদ্ধতা এবং থেমে থেমে বৃষ্টিপাতের কারণে এডিস মশার প্রজনন বাড়ছে। ফুলের টব, নির্মাণাধীন ভবন, পরিত্যক্ত প্লাস্টিকের বোতল, এবং ছাদে জমে থাকা পানি মশার প্রজনন কেন্দ্রে পরিণত হয়েছে।
বিভিন্ন মশা, বিভিন্ন রোগ
বাংলাদেশ মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয়ের ইন্টারনাল মেডিসিন বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক ডা. ফজলে রাব্বী চৌধুরী জানান, তিন ধরনের মশা—ম্যানুফেলিস, এডিস, এবং কিউলেক্স—বিভিন্ন রোগ ছড়ায়। ম্যানুফেলিস ম্যালেরিয়া, এডিস ডেঙ্গু, চিকুনগুনিয়া ও জিকা, এবং কিউলেক্স জাপানিজ এনসেফালাইটিস ছড়ায়।

তিনি বলেন, গত দুই বছরে সারাদেশে ডেঙ্গু ছড়িয়েছে, এবার চিকুনগুনিয়া বাড়ছে। জিকা এবং জাপানিজ এনসেফালাইটিসও রয়েছে, যদিও সেগুলো হয়তো পুরোপুরি চিহ্নিত করা যায়নি।
প্রতিরোধে করণীয়
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, শুধু কীটনাশক ছিটিয়ে মশা নিয়ন্ত্রণ সম্ভব নয়। প্রয়োজন সমন্বিত ভেক্টর ব্যবস্থাপনা, পরিবেশবান্ধব প্রযুক্তি, এবং জনসচেতনতা। ডা. ফজলে রাব্বী চৌধুরী পরামর্শ দেন:
- ঘরবাড়ি, ছাদ, ফুলের টব, এবং পানির ট্যাঙ্ক পরিষ্কার রাখতে হবে।
- শিশুদের ফুল প্যান্ট পরানো এবং মশারি ব্যবহার করা।
- জ্বর, শরীর ব্যথা, বা মাথাব্যথার লক্ষণ দেখা দিলে দ্রুত চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া।
- পরিত্যক্ত টায়ার, প্লাস্টিকের বোতল, এবং জমে থাকা ময়লা সরানো।
অধ্যাপক বাশার জোর দিয়ে বলেন, মশা নিয়ন্ত্রণে সরকারের পাশাপাশি জনগণের সক্রিয় অংশগ্রহণ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার তথ্য অনুযায়ী, মশাবাহিত রোগ বিশ্ব জনস্বাস্থ্যের জন্য অন্যতম প্রধান হুমকি। বাংলাদেশে ডেঙ্গু ও চিকুনগুনিয়ার প্রকোপ কমাতে সরকার, জনগণ এবং কমিউনিটির সমন্বিত প্রচেষ্টা প্রয়োজন। বিশ্ব মশা দিবস আমাদের স্মরণ করিয়ে দেয় যে, একটি দিন নয়, প্রতিদিনই মশার বংশবিস্তার রোধে সচেতন থাকতে হবে।
