দক্ষিণ আমেরিকার তেল সমৃদ্ধ দেশ ভেনেজুয়েলাকে অপ্রস্তুত করে দেয়া সেই আকস্মিক ও দুঃসাহসী অভিযানের এক সপ্তাহ পর, এখন আমেরিকা-রাশিয়া সম্পর্কের সমীকরণগুলো আরও স্পষ্ট হতে শুরু করেছে। গত সপ্তাহে কারাকাসে মার্কিন বাহিনীর এক আচমকা হামলায় ভেনেজুয়েলার সাবেক নেতা নিকোলাস মাদুরোকে তার বিছানা থেকে টেনে হিঁচড়ে নিউইয়র্কের একটি কারাগারে নিয়ে যাওয়া হয়।
মাদুরোকে যেভাবে বন্দি করা হয়েছে তাতে ‘জোর যার মুলুক তার’ প্রবাদেরই প্রতিফলন ঘটেছে। ইউক্রেনীয় নেতা ভলোদিমির জেলেনস্কির মতো মার্কিন মিত্ররা ইঙ্গিত দিয়েছেন, প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প রাশিয়ার ভ্লাদিমির পুতিনের জন্যও হয়তো একই ধরনের কোনো পরিকল্পনা করছেন।
তবে জেলেনস্কির সাথে দ্বিমত জানিয়ে ট্রাম্প জানান, পুতিনের বিরুদ্ধে এমন পদক্ষেপের কোন প্রয়োজন নেই, যদিও তিনি পুতিনের ওপর খুবই অসন্তুষ্ট। উল্লেখ্য, ইউক্রেনে কথিত যুদ্ধাপরাধের অভিযোগে হেগের আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালত পুতিনের বিরুদ্ধে আগেই গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি করে রেখেছে।
নতুন বছরের শুরুতেই মাদুরোর এই গ্রেপ্তার ওয়াশিংটনের মিত্রদের উৎসাহিত করেছে। বিশেষ করে ইউক্রেনকে, যারা ২০২২ সাল থেকে রাশিয়ার নতুন দফার আক্রমণ প্রতিহত করে আসছে এবং এখনো রাজধানী কিয়েভকে দখলদারিত্ব থেকে মুক্ত রাখতে সক্ষম হয়েছে।
মাদুরো প্রসঙ্গ টেনে জেলেনস্কি পরোক্ষভাবে পুতিনের দিকে ইঙ্গিত করে বলেন, যদি একজন স্বৈরশাসকের সাথে এভাবেই আচরণ করতে হয়, তবে যুক্তরাষ্ট্র জানে এরপর কী করতে হবে।
জেলেনস্কির এই মন্তব্য এবং ট্রাম্প কখনো পুতিনকে বন্দি করার নির্দেশ দেবেন কি না- এমন প্রশ্নের জবাবে মার্কিন প্রেসিডেন্ট বলেন, আমি মনে করি না এর প্রয়োজন হবে।
দেশের শীর্ষ তেল ও গ্যাস নির্বাহীদের সাথে এক বৈঠকে সাংবাদিকদের ট্রাম্প বলেন, আমি মনে করি তার (পুতিন) সাথে আমাদের একটি চমৎকার সম্পর্ক গড়ে উঠবে, যা আগেও ছিল। তবে আমি খুব হতাশ। আমি আটটি যুদ্ধ মিটিয়েছি। আমি ভেবেছিলাম, এই সমস্যাটি মেটানো মাঝারি মানের কঠিন হবে অথবা হয়তো অন্যতম সহজ কাজ হবে।
সেনাদের মৃত্যুর কথা স্মরণ করে প্রেসিডেন্ট আক্ষেপ প্রকাশ করেন, তিনি ইউক্রেন-রাশিয়া সংঘাত থামাতে পারেননি। এ সময় তিনি বিশ্বজুড়ে আটটি যুদ্ধ থামানোর দাবি আবারও পুনর্ব্যক্ত করেন।
ট্রাম্প বলেন, গত মাসে তারা ৩১,০০০ মানুষকে হারিয়েছে, যাদের বড় একটি অংশ রুশ সেনা। রাশিয়ার অর্থনীতিও ধুঁকছে। আমি মনে করি শেষ পর্যন্ত আমরা এটি মিটিয়ে ফেলব। আমার আক্ষেপ যে এটি আরও দ্রুত করা সম্ভব হলো না, কারণ প্রচুর মানুষ মারা যাচ্ছে, যাদের বেশিরভাগই সেনা।
নিকোলাস মাদুরো যেভাবে বন্দি হলেন
কারাকাসে তখন সবে মধ্যরাত পেরিয়েছিল। ভেনেজুয়েলার তৎকালীন প্রেসিডেন্ট মাদুরো এবং তার স্ত্রী সিলিয়া ফ্লোরেস সম্ভবত তাদের প্রাসাদে ঘুমিয়ে ছিলেন। ঠিক সেই মুহূর্তে শহরজুড়ে মার্কিন যুদ্ধবিমানগুলো বিমান হামলা শুরু করে।
এরপর অভিযানে নামে আমেরিকার অন্যতম গোপন ও দুর্ধর্ষ লড়াকু বাহিনী ‘ডেল্টা ফোর্স’। সেনারা মাদুরোকে বন্দি করে আকাশপথে দেশটির বাইরে একটি মার্কিন সামরিক ঘাঁটিতে নিয়ে যায়। সেখান থেকে ‘ইউএসএস জিমা’ নামক একটি বিশাল উভচর যুদ্ধজাহাজে করে তাকে নিউইয়র্কে পাঠানো হয়।
বর্তমানে মাদুরোর ভাইস প্রেসিডেন্ট ডেলসি রদ্রিগেজ ভেনেজুয়েলার প্রেসিডেন্টের দায়িত্ব গ্রহণ করেছেন। অন্যদিকে, ট্রাম্প প্রশাসন দেশটির তেল রপ্তানির ওপর নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার প্রস্তুতি নিচ্ছে।
