উত্তর-পশ্চিম দিল্লির শর্মা এনক্লেভ এলাকার বাসিন্দা রবীন্দ্র কুমারকে প্রতিদিন গোড়ালি সমান নোংরা কাদা মাড়িয়ে ঘরের বাইরে বের হতে হয়। কিন্তু বিড়ম্বনার বিষয় হলো, বাইরে থিকথিকে কাদা থাকলেও তার ঘরের ভেতরে এক ফোঁটা সুপেয়ে পানি নেই। ৫৫ বছর বয়সী এই প্রৌঢ়ের ঘরে পানি আসে তিন দিন অন্তর মাত্র এক ঘণ্টার জন্য। সেই পানিও অনেক সময় কুচকুচে কালো বা দুর্গন্ধযুক্ত থাকে। খবর সিএনএন।
এটি কেবল রবীন্দ্র কুমারের একার গল্প নয়, বরং বর্তমানে দিল্লির প্রায় ২০ মিলিয়ন বাসিন্দার বিরাট অংশের বাস্তব চিত্র। যমুনা নদীতে অ্যামোনিয়ার মাত্রা অস্বাভাবিক হারে বেড়ে যাওয়ায় গত সপ্তাহে দিল্লির ৯টি প্রধান পানি শোধনাগারের মধ্যে ছয়টিই বন্ধ হয়ে গেছে। ফলে ২০ লক্ষ মানুষ সরাসরি পানিকষ্টের মুখে পড়েছেন।
যে যমুনা নদীকে কোটি কোটি মানুষ পবিত্র মনে করে পূজা করেন, সেই নদী এখন শিল্পবর্জ্য আর শোধিত না করা নর্দমার পানিতে মৃতপ্রায়। যদিও এই নদীর দৈর্ঘ্যের মাত্র দুই শতাংশ দিল্লির মধ্য দিয়ে প্রবাহিত হয়, কিন্তু যমুনার মোট দূষণের ৭৬ শতাংশেরই উৎস এই রাজধানী শহর। নদীর ওপর এখন সাদা বিষাক্ত ফেনার পুরু স্তর জমে আছে, যা মূলত ডিটারজেন্ট এবং রাসায়নিক বর্জ্যের ফল।

নদীতে দ্রবীভূত অক্সিজেনের মাত্রা শূন্যে নেমে আসায় জলজ প্রাণীর অস্তিত্ব বিলীন হয়ে গেছে। সম্প্রতি একদল স্বেচ্ছাসেবী নদী পরিষ্কারের অভিযানে নেমেছিলেন, কিন্তু তাদের মতে কেবল ওপরের আবর্জনা সরালে এই সমস্যার সমাধান সম্ভব নয়, কারণ নদীর পানিতে মিশে আছে বিষাক্ত শিল্প বর্জ্য।
দিল্লির ৪৩টি মহল্লার বাসিন্দারা গত কয়েকদিন ধরে চরম দুর্ভোগের মধ্য দিয়ে যাচ্ছেন। অনেক এলাকায় গত কয়েক দিন ধরে এক ফোঁটা পানিও আসেনি। যেটুকু পানি পাওয়া যাচ্ছে, তার রঙ হলুদ এবং পচা ডিমের মতো দুর্গন্ধযুক্ত। রঘুবীর নগরের বাসিন্দা রাজা কামাত জানান, টানা পাঁচ দিন পর শুক্রবার যখন পানি এল, তখন তা ছিল কালো রঙের। তিনি মাসে মাত্র ১৩ ডলার সরকারি পেনশনে বেঁচে থাকেন, তাই চড়া দামে বোতলজাত পানি কেনা তার পক্ষে প্রায় অসম্ভব।
৭০ বছর বয়সী বৃদ্ধা শশী বালা জানান, নোংরা ও দূষিত পানি ব্যবহারের ফলে তার পরিবারের সদস্যদের শরীর খারাপ হচ্ছে। তিনি বলেন, এখানে সব কিছুই নোংরা। আমাদেরকে সুপেয় পানির জন্য প্রতিবেশীদের ওপর নির্ভর করতে হচ্ছে। সব সময় তাদের কাছ থেকে পানিও পাওয়া যায় না।

দিল্লি পানি বোর্ড জানিয়েছে যে, পাইপলাইনে অবৈধ পাম্প ব্যবহারের কারণে কিছু এলাকায় পানির মানের সমস্যা দেখা দিয়েছে এবং তারা তা দ্রুত সমাধানের চেষ্টা করছে। এছাড়া সরকার ২০২৮ সালের মধ্যে শহরের সব অনুমোদনহীন কলোনিতে নর্দমা ব্যবস্থা স্থাপনের লক্ষ্য নির্ধারণ করেছে।
উল্লেখ্য , ১৯৯৩ সালে 'যমুনা অ্যাকশন প্ল্যান' শুরু হলেও তিন দশক এবং কোটি কোটি টাকা ব্যয়ের পরও যমুনার অবস্থার কোনো পরিবর্তন হয়নি। অপরিকল্পিত নগরায়ন এবং বর্জ্য ব্যবস্থাপনার অভাব দিল্লির ভূগর্ভস্থ পানিকেও বিষাক্ত করে তুলছে।
দিল্লির এই পানিসংকট এখন আর কেবল ঋতুভিত্তিক সমস্যা নয়, বরং এটি একটি মানবিক বিপর্যয়ে রূপ নিয়েছে। যেখানে নাগরিকরা বেঁচে থাকার ন্যূনতম চাহিদা 'বিশুদ্ধ পানি' পাওয়ার জন্য হাহাকার করছেন।
