তারেক রহমানের নেতৃত্বাধীন ডান-উদারপন্থী দল বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি) জাতীয় নির্বাচনে নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করার পর তিনি এখন বাংলাদেশের পরবর্তী প্রধানমন্ত্রী হওয়ার পথে রয়েছেন।
৬০ বছর বয়সী তারেক রহমান প্রভাবশালী জিয়া পরিবারের উত্তরাধিকারী, যারা গত কয়েক দশক ধরে এদেশের রাজনীতিতে শক্তিশালী প্রভাব বজায় রেখেছে। তাঁর বাবা ও মা উভয়ই ইতিপূর্বে বাংলাদেশের রাষ্ট্রপ্রধান হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন।
তবে ক্ষমতার এই শীর্ষে পৌঁছানোর পথটি তারেক রহমানের জন্য মোটেও মসৃণ ছিল না। রাজনৈতিক প্রতিপক্ষদের পক্ষ থেকে তাঁর বিরুদ্ধে পরিবারতন্ত্র ও দুর্নীতির অভিযোগ, দীর্ঘ প্রবাস জীবন এবং তাঁর বাবার হত্যাকাণ্ড- সব মিলিয়ে এক কণ্টকাকীর্ণ পথ পাড়ি দিতে হয়েছে তাঁকে।

বাংলাদেশের প্রথম নারী প্রধানমন্ত্রী ও তাঁর মা খালেদা জিয়ার মৃত্যুর কয়েক সপ্তাহ পরেই তিনি আনুষ্ঠানিকভাবে বিএনপির চেয়ারম্যান হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণ করেন।
২০০১ সালে তারেক রহমান যখন বিএনপির রাজনীতিতে সক্রিয় হন, তখন তাঁর বয়স ছিল ৩০-এর কোঠায়। সেটি ছিল প্রধানমন্ত্রী হিসেবে তাঁর মায়ের দ্বিতীয় মেয়াদের শুরু। এর আগে খালেদা জিয়া ১৯৯১ থেকে ১৯৯৬ সাল পর্যন্ত প্রথম মেয়াদে প্রধানমন্ত্রী ছিলেন।
তারেক রহমানের বাবা জিয়াউর রহমান ছিলেন একজন সামরিক শাসক থেকে প্রেসিডেন্ট হওয়া ব্যক্তিত্ব, যিনি ১৯৭৮ সালে বিএনপি প্রতিষ্ঠা করেন। বাংলাদেশের স্বাধীনতা সংগ্রামে অন্যতম প্রধান ভূমিকা রাখা জিয়াউর রহমান ১৯৮১ সালে এক সামরিক অভ্যুত্থানে নিহত হন।
২০০২ সালে তারেক রহমান তাঁর বাবা-মায়ের পদাঙ্ক অনুসরণ করে দলের একটি জ্যেষ্ঠ পদে আসীন হন। সে সময় বিরোধী দলগুলো তাঁর এই উত্থানকে চরম 'পরিবারতন্ত্র' হিসেবে অভিহিত করেছিল। পরবর্তীতে দলের ভেতর শৃঙ্খলা বজায় রাখার ক্ষেত্রে তিনি বেশ কঠোর হিসেবে পরিচিতি পান।

অতীতের বিভিন্ন সময়ে তারেক রহমানের বিরুদ্ধে ক্ষমতার অপব্যবহার করে ব্যক্তিগত সুবিধা নেওয়ার অভিযোগ উঠলেও তিনি তা বরাবরই অস্বীকার করেছেন। তাঁর সমর্থকদের দাবি, রাজনৈতিক প্রতিপক্ষরা তাঁকে বলির পাঁঠা হিসেবে ব্যবহার করেছে।
২০০৭ সালে সেনাসমর্থিত তত্ত্বাবধায়ক সরকারের আমলে দুর্নীতির অভিযোগে তিনি গ্রেপ্তার হন এবং বিচারের অপেক্ষায় থাকাকালীন নির্যাতনের শিকার হন বলে অভিযোগ করেন।
আঠারো মাস কারাগারে থাকার পর মুক্তি পেয়ে তিনি লন্ডনের উদ্দেশ্যে দেশ ত্যাগ করেন। সে সময়ের বিভিন্ন প্রতিবেদনে বলা হয়েছিল যে, চিকিৎসার জন্য বিদেশ যাওয়ার অনুমতি পাওয়ার শর্ত হিসেবে তিনি রাজনীতি ছেড়ে দেওয়ার অঙ্গীকার করেছিলেন।
এরপর দীর্ঘ ১৭ বছর তারেক রহমান আর দেশে ফিরতে পারেননি। তবে বিদেশে অবস্থান করেও তিনি বিএনপির রণকৌশল ও নীতিনির্ধারণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন। বিশেষ করে ২০১৮ সালে তাঁর মা কারাদণ্ড পাওয়ার পর থেকে তিনি দলের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান হিসেবে দায়িত্ব পালন করে আসছিলেন।
শেখ হাসিনার শাসনামলে তাঁর বিরুদ্ধে বেশ কিছু ফৌজদারি মামলা চলে এবং ২০০৪ সালের গ্রেনেড হামলাসহ একাধিক মামলায় অনুপস্থিতিতেই তাঁকে কারাদণ্ড দেওয়া হয়। তবে হাসিনার পতনের পর তিনি সব অভিযোগ থেকে খালাস পান।
দীর্ঘ প্রবাস জীবন শেষে ২০২৫ সালের ২৫ ডিসেম্বর তিনি অবশেষে বাংলাদেশে ফিরে আসেন। এর মাত্র পাঁচ দিন পর তাঁর মা খালেদা জিয়ার মৃত্যু হয়। গত ৯ জানুয়ারি তিনি আনুষ্ঠানিকভাবে বিএনপির চেয়ারম্যান নিযুক্ত হন। বিশ্লেষকদের মতে, বিএনপির নেতৃত্বে তাঁর আসা ছিল অনিবার্য।
তারেক রহমানের এই পদ গ্রহণ নিয়ে পরিবারতন্ত্রের অভিযোগ আবারও সামনে এলেও বিএনপির সাবেক বাণিজ্যমন্ত্রী আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী বিষয়টিকে আমলে নেননি। তিনি বিবিসিকে বলেন, আপনি রাজবংশ থেকে এসেছেন কি না তা অপ্রাসঙ্গিক। তাঁর মতে, হাসিনা শাসনামলে বিএনপি এতটাই কোণঠাসা ছিল যে, জিয়া পরিবারের বাইরে নতুন নেতৃত্ব নির্বাচন করা দলটির পক্ষে সম্ভব ছিল না।
তবে অনেকে মনে করেন, তারেক রহমানের আসল পরীক্ষা হবে তিনি ভবিষ্যতে কীভাবে দল এবং রাষ্ট্র পরিচালনা করেন তার ওপর। রাজনৈতিক বিশ্লেষক মহিউদ্দিন আহমদ বিবিসিকে বলেন, তারেক রহমান রাজনীতির অন্ধকার দিকগুলো দেখেছেন এবং এদেশের সংঘাত ও প্রতিশোধের রাজনীতির অভিজ্ঞতা অর্জন করেছেন। সেই রাজনৈতিক প্রজ্ঞা ব্যবহার করে তিনি দলীয় নেতার গণ্ডি পেরিয়ে একজন রাষ্ট্রনায়ক হয়ে উঠতে পারেন কি না, সেটিই এখন দেখার বিষয়।
জয়-পরাজয়ের হিসাব শেষে বাংলাদেশের সামনে কি?
অভিনন্দন জানাই আমার তারেক ভাইকে, তাঁর দলকে: মমতা
দুই দশক পর ফিরল বিএনপি, নতুন প্রধানমন্ত্রী হতে যাচ্ছেন তারেক রহমান