মঙ্গলবার জেনেভায় অনুষ্ঠিত দ্বিতীয় দফার পরোক্ষ আলোচনায় পারমাণবিক বিরোধ নিরসনে মূল ‘নির্দেশক নীতিমালা’ নিয়ে একটি সমঝোতায় পৌঁছেছে ইরান ও যুক্তরাষ্ট্র। তবে, এর অর্থ এই নয় যে, এখনই কোনো চূড়ান্ত চুক্তি হতে যাচ্ছে, এমনটিই জানিয়েছেন ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাগচি।
মঙ্গলবার জেনেভায় আলোচনা শেষে আরাগচি ইরানি গণমাধ্যমকে বলেন, বিভিন্ন ধারণা প্রস্তাব করা হয়েছে এবং সেগুলো নিয়ে গুরুত্বের সঙ্গে আলোচনা হয়েছে। শেষ পর্যন্ত আমরা কিছু নির্দেশক নীতিমালার ওপর সাধারণ ঐকমত্যে পৌঁছাতে পেরেছি। এখন থেকে আমরা সেই নীতিগুলোর ভিত্তিতে কাজ করব এবং একটি সম্ভাব্য চুক্তির খসড়া তৈরির পর্যায়ে প্রবেশ করব।
তিনি আরও জানান, নথিপত্র আদান-প্রদানের পর উভয় পক্ষ তৃতীয় দফা আলোচনার তারিখ নির্ধারণ করবে।

মধ্যপ্রাচ্যে মার্কিন সামরিক উপস্থিতি
দশকব্যাপী চলা এই পারমাণবিক বিরোধে তেহরানকে ছাড় দিতে বাধ্য করাতে মধ্যপ্রাচ্যে বিশাল যুদ্ধবাহিনী পাঠিয়েছে যুক্তরাষ্ট্র। প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প এমন মন্তব্যও করেছেন, তেহরানে শাসনব্যবস্থার পরিবর্তন হওয়াই হয়তো সবচেয়ে ভালো ঘটনা হতে পারে।
এদিকে, ইরানের রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যম জানিয়েছে, পারমাণবিক কর্মসূচি নিয়ে আলোচনার চলার সময় তেহরান সাময়িকভাবে বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ তেল সরবরাহ পথ হরমুজ প্রণালীর একাংশ বন্ধ করে দিয়েছে। অন্যদিকে, মঙ্গলবার ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনি সতর্ক করে বলেছেন, তাঁর সরকারকে উৎখাত করার যে কোনো মার্কিন প্রচেষ্টা ব্যর্থ হবে।

আরাগচিরর ইতিবাচক মন্তব্যের পর বাজারে তেল সরবরাহ বিঘ্নিত হওয়ার আশঙ্কা কিছুটা কমে যাওয়ায় বিশ্ববাজারে জ্বালানি তেলের দাম এক শতাংশের বেশি কমেছে। আরাগচি আশা প্রকাশ করেন, আলোচনার মাধ্যমে একটি টেকসই সমাধান আসবে, যা ইরানের বৈধ অধিকারের পূর্ণ স্বীকৃতি নিশ্চিত করবে।
ওমানের মধ্যস্থতায় অনুষ্ঠিত এই বৈঠকে মার্কিন প্রতিনিধি হিসেবে স্টিভ উইটকফ এবং জারেড কুশনার অংশ নেন। ট্রাম্প সোমবার জানান, তিনি নিজেও এই আলোচনায় পরোক্ষভাবে যুক্ত আছেন। ট্রাম্প বলেন, আমি মনে করি না যে তারা (ইরান) চুক্তি না করার পরিণতি ভোগ করতে চায়। পারমাণবিক সক্ষমতা ধ্বংস করতে বি-২ বোমারু বিমান পাঠানোর পরিবর্তে আমরা অনেক আগেই একটি চুক্তি করতে পারতাম। উল্লেখ্য, গত জুনে ইসরাইলের সঙ্গে যৌথভাবে ইরানের পারমাণবিক স্থাপনায় বোমাবর্ষণ করেছিল যুক্তরাষ্ট্র।
‘সবচেয়ে শক্তিমানকেও চড় মারা সম্ভব’
গত জুনের সেই হামলার পর থেকে আন্তর্জাতিক নিষেধাজ্ঞার প্রভাবে সৃষ্ট জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধির সংকটে ইরানি শাসকগোষ্ঠী কিছুটা দুর্বল হয়ে পড়েছে। দ্রব্যমূল্য বৃদ্ধির প্রতিবাদে আয়োজিত বিক্ষোভে হাজার হাজার প্রাণহানির ঘটনাও ঘটেছে।
তবে আলোচনা শুরু হওয়ার পরপরই ৮৬ বছর বয়সী খামেনি দৃঢ়কণ্ঠে বলেন, ওয়াশিংটন তাঁর সরকারকে ক্ষমতাচ্যুত করতে পারবে না। তিনি বলেন, মার্কিন প্রেসিডেন্ট বলেন তাদের সেনাবাহিনী বিশ্বের শক্তিশালী। কিন্তু বিশ্বের শক্তিশালী সেনাবাহিনীকেও মাঝে মাঝে এমন জোরে চড় মারা যায় যে, তারা আর উঠে দাঁড়াতে পারে না।
ওয়াশিংটন এই আলোচনার পরিধি বাড়িয়ে ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র ভাণ্ডারকেও অন্তর্ভুক্ত করতে চেয়েছিল। কিন্তু তেহরান স্পষ্ট জানিয়েছে, তারা শুধু পারমাণবিক কর্মসূচি এবং তার বিনিময়ে নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহারের বিষয়েই আলোচনা করতে ইচ্ছুক। তাদের ক্ষেপণাস্ত্র কর্মসূচির ধরন বা পাল্লা নিয়ে কোনো আপস করা হবে না।

মঙ্গলবার আলোচনার মধ্যেই হরমুজ প্রণালীতে সামরিক মহড়া চালিয়েছে ইরানের বিপ্লবী গার্ডস। অতীতে ইরান হুমকি দিয়েছে, তাদের ওপর হামলা হলে তারা এই প্রণালী দিয়ে বাণিজ্যিক জাহাজ চলাচল বন্ধ করে দেবে। এর ফলে বিশ্বের মোট তেলের প্রবাহের এক-পঞ্চমাংশ বন্ধ হয়ে যাবে, যা তেলের দামকে আকাশচুম্বী করে তুলবে।
যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইল বিশ্বাস করে, ইরান পারমাণবিক অস্ত্র তৈরির চেষ্টা করছে, যা ইসরাইলের অস্তিত্বের জন্য হুমকিস্বরূপ। যদিও ইরান দাবি করে আসছে, তাদের এই কর্মসূচি সম্পূর্ণ শান্তিপূর্ণ। ইরান পারমাণবিক অ-প্রসারণ চুক্তিতে স্বাক্ষরকারী দেশ হলেও ইসরাইল এই চুক্তিতে সই করেনি।
