মেলার মাঠে স্টল ও প্যাভিলিয়ন বরাদ্দের অস্বচ্ছতা নিরসন না হওয়া এবং চরম সময়স্বল্পতার কারণে আসন্ন ‘অমর একুশে বইমেলা ২০২৬’-এ অংশগ্রহণ করা কোনোভাবেই সম্ভব হচ্ছে না বলে জানিয়েছে দেশের সৃজনশীল প্রকাশকদের সর্ববৃহৎ প্ল্যাটফর্ম ‘প্রকাশক ঐক্য’।
শনিবার (২১ ফেব্রুয়ারি) গণমাধ্যমে পাঠানো এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে এসব কথা জানানো হয়েছে।
‘প্রকাশক ঐক্য’ -এর সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে একাত্তরের পাঠকদের জন্য হুবহু তুলে ধরা হলো-
দেশের অধিকাংশ সৃজনশীল প্রকাশকের সমন্বয়ে ক্রান্তিকালে গঠিত প্ল্যাটফর্ম ‘প্রকাশক ঐক্য’ মর্মাহত হৃদয়ে জানাচ্ছে যে, মেলার মাঠে স্টল ও প্যাভিলিয়ন বরাদ্দের অস্বচ্ছতা নিরসন না হওয়া, সমঝোতা মোতাবেক পদক্ষেপ গ্রহণে বাংলা একাডেমির ব্যর্থতা, এবং এই দুইয়ের ফলশ্রুতিতে চরম সময়স্বল্পতার কারণে আসন্ন ‘অমর একুশে বইমেলা ২০২৬’-এ আমাদের পক্ষে অংশগ্রহণ করা কোনোভাবেই সম্ভব হচ্ছে না।
পুরো সময়জুড়েই আমরা কর্তৃপক্ষ ও নতুন সরকারকে সর্বোচ্চ সহযোগিতা করতে চেয়েছি। গত ১৮ ফেব্রুয়ারি মাননীয় মন্ত্রী, প্রতিমন্ত্রী, সচিব এবং বাংলা একাডেমির মহাপরিচালকের সাথে ফলপ্রসূ আলোচনার পর, কেবল নতুন সরকারের প্রতি শুভেচ্ছা স্বরূপ তাঁদের আহ্বানে সাড়া দিয়ে আমরা আমাদের মূল দাবি (ঈদের পর মেলা আয়োজন) থেকে সরে আসি। নিশ্চিত ব্যবসায়িক ক্ষতি জেনেও আমরা মেলায় অংশগ্রহণের দুঃসাহসিক সিদ্ধান্ত নিই এবং বাংলা একাডেমির অনুরোধ মোতাবেক ১৯ তারিখের মধ্যে মেলার আবেদন সম্পন্ন করি।
‘প্রকাশক ঐক্য’-এর সাথে যুক্ত ৩ শতাধিক সৃজনশীল প্রকাশককে এই স্বল্প সময়ে বইমেলায় অংশগ্রহণের বিষয়ে রাজি করাতে, এবং একদিনের নোটিশে পুনরায় আবেদন করতে সম্মত করাতে আমাদের যথেষ্ট বেগ পেতে হয়েছে। তাদের উত্থাপিত দাবির প্রেক্ষিতে আমরা কথা দিয়েছিলাম যে, বিশেষ বাস্তবতার কারণে এবারের বইমেলায় সমঅধিকারের স্বার্থে আমরা নিজেরা কোনো প্যাভিলিয়ন নেব না এবং অন্য কারও প্যাভিলিয়নও থাকবে না। এটি মূলত সর্বস্তরের প্রকাশকের সম্মিলিত আকাঙ্ক্ষার প্রতিফলন।
বুধবারের (১৮ ফেব্রুয়ারি) আনুষ্ঠানিক মিটিংয়ের আগে বাংলা একাডেমির মহাপরিচালক (ডিজি) মহোদয়ের সাথে যে যৌক্তিক দাবিগুলোর বিষয়ে আমাদের মৌখিক সমঝোতা হয়েছিল, তার মধ্যে অন্যতম ছিল: সমস্ত প্যাভিলিয়ন বাতিল করে সবাইকে সমতার ভিত্তিতে সর্বোচ্চ ৫ ইউনিটের স্টল বরাদ্দ দেওয়া। এই দাবির পেছনের যৌক্তিক কারণগুলো হলো:
চরম সময়স্বল্পতা: একটি প্যাভিলিয়ন নির্মাণ করতে কমপক্ষে ১০ দিন সময় লাগে। মেলা শুরু হতে মাত্র ৪ দিন বাকি। মূলধারার ও শীর্ষস্থানীয় প্রকাশকদের প্রায় ৯০ ভাগই ‘প্রকাশক ঐক্য’-এর সাথে যুক্ত ছিলেন এবং পূর্ববর্তী বয়কটের কারণে তারা মেলার প্রস্তুতি থেকে বিরত ছিলেন। এখন সময়ের অভাবে এই প্রকাশকরা বাধ্য হয়ে স্টল নিচ্ছেন। অন্যদিকে, প্যাভিলিয়নের প্রকৃত দাবিদার যে প্রকাশকরা কর্তৃপক্ষের আহ্বানে সাড়া দিয়ে মেলায় ফিরতে সম্মত হয়েছিলেন, উদ্বোধনের মাত্র ৩-৪ দিন আগে তাদের পক্ষে কোনোভাবেই প্যাভিলিয়নের বিশাল অবকাঠামো নির্মাণ করা সম্ভব হবে না। মেলায় অংশ নেয়া থেকে বিরত থাকা নবীন প্রকাশকরাও এখন আর অবকাঠামো নির্মাণ করার সময় ও সুযোগ পাবেন না।
অস্বচ্ছ বরাদ্দ ও অমর্যাদা: ‘প্রকাশক ঐক্য’-এর কর্মসূচি চলাকালে বাংলা একাডেমি অস্বচ্ছ প্রক্রিয়ায় অনেক অযোগ্য প্রকাশককে প্যাভিলিয়ন বরাদ্দ দেয় এবং তারা নির্মাণকাজ এগিয়ে নেন। এমতাবস্থায়, অযোগ্যদের দেয়া প্যাভিলিয়নের বিপরীতে মূলধারার সৃজনশীল প্রকাশকদের জন্য ছোট স্টল নিয়ে যেনতেনভাবে মেলায় অংশ নেওয়া চরম অমর্যাদাকর।
অন্যায্য সুবিধা ও বৈষম্য: যেসব প্রকাশক বৃহত্তর ঐক্যের বাইরে গিয়ে প্যাভিলিয়ন নিয়েছিলেন, তারা সরকারের ভর্তুকি ছাড়াই ফি দিয়ে মেলায় অংশ নিয়েছিলেন। কিন্তু আজ ‘প্রকাশক ঐক্য’-এর আন্দোলনের ফলেই সরকার শতভাগ স্টলভাড়া মওকুফ করেছে এবং সেই সুবিধা এখন প্যাভিলিয়নধারীরাও ভোগ করবেন। অথচ মেলার সামগ্রিক প্রস্তুতিতে তারা পূর্ব থেকেই অন্যায্য সুবিধা পেয়ে আসছেন। তাদের একটা বড় অংশের মেলায় অংশগ্রহণেরও যোগ্যতা নেই। প্রস্তুতিহীনতার চরম ঝুঁকি নিয়ে মেলায় এসে আমরা এমন বৈষম্যের শিকার হবো, তা কোনোভাবেই মেনে নেওয়া যায় না।
এ কারণেই, শুধুমাত্র এবারের মেলার এই অস্বাভাবিক ও বিশেষ পরিস্থিতির বিবেচনায় নিয়ে আমরা সমস্ত প্যাভিলিয়ন সাময়িকভাবে বাতিল করার যৌক্তিক দাবি জানিয়েছিলাম। মাননীয় মন্ত্রীদ্বয়ের সামনেই বাংলা একাডেমির ডিজি মহোদয় এই দাবিটিকে অত্যন্ত বাস্তবসম্মত ও বাস্তবায়নযোগ্য বলে আমাদের আশ্বস্ত করেন। কিন্তু অবাক বিস্ময়ে আমরা লক্ষ্য করলাম, মিটিং-পরবর্তী বাংলা একাডেমির সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে এই দাবির কথা আদৌ উল্লেখ করা হয়নি।
এরপর বাংলা একাডেমির ডিজি ও সচিব মহোদয়কে এ বিষয়ে বারবার স্মরণ করিয়ে দিলে তারা আমাদের প্রতিনিয়ত আশ্বস্ত করেন যে, এই দাবি বাস্তবায়ন করা হবে। এমনকি গত ২০ ফেব্রুয়ারি সন্ধ্যায়ও ডিজি মহোদয় আমাদের দাবি খুবই ন্যায্য বলে স্বীকার করেন।
কিন্তু দৃশ্যমান কোনো পদক্ষেপ না দেখে, এই অস্বচ্ছতা নিরসনে প্যাভিলিয়ন বাতিলের জন্য আমরা গত ২০ ফেব্রুয়ারি (শুক্রবার) রাত ১০টা পর্যন্ত সময়সীমা নির্ধারণ করে মহাপরিচালক মহোদয়কে চূড়ান্ত সময় বেঁধে দিয়েছিলাম। তারপরও তাদেরই অনুরোধে আজ ২১ ফেব্রুয়ারি (শনিবার) সারাদিন আমরা কর্তৃপক্ষের ইতিবাচক পদক্ষেপের অপেক্ষায় ছিলাম। কিন্তু আজ সন্ধ্যার দিকে সংস্কৃতি বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের মাননীয় সচিব মহোদয় ফোনে আমাদের জানান যে, প্যাভিলিয়ন বাতিল করা সম্ভব হচ্ছে না এবং তিনি এবারের মতো প্যাভিলিয়ন রেখেই আমাদের মেলায় আসার অনুরোধ করেন।
সবচেয়ে বড় হতাশার জায়গা হলো, প্যাভিলিয়ন বাতিল করতে না পারার কারণে বাংলা একাডেমি আজ পর্যন্ত স্টল নম্বর বরাদ্দের লটারিও করতে পারেনি। আজ ২১ ফেব্রুয়ারি অতিক্রান্ত হয়ে যাচ্ছে, আর মেলা শুরু হবে ২৫ তারিখে। লটারি না হওয়ায় এখন পর্যন্ত কেউ স্টলের জায়গাই বুঝে পাননি। এমন একটি চরম অনিশ্চিত পরিস্থিতিতে, উদ্বোধনের মাত্র ৩-৪ দিন আগে কাঠামো নির্মাণ, বিদ্যুৎ সংযোগ, রঙ শুকানো, স্টলের সাজসজ্জা এবং বই গুছিয়ে মেলায় অংশগ্রহণ করা কারিগরি ও বাস্তবিকভাবে কোনো প্রকাশকের পক্ষেই আর সম্ভব নয়।
আমরা সবিনয়ে বলতে চাই— শুধু ভাড়া মওকুফ বা কাগজে-কলমে অন্য সকল দাবি মেনে নেওয়ার আশ্বাসই মেলার প্রস্তুতির জন্য যথেষ্ট নয়। মেলায় অংশ নেওয়ার জন্য স্টল নির্মাণ ও বই গোছানোর ন্যূনতম সময় এবং মেলার মাঠে একটি বৈষম্যহীন পরিবেশ অপরিহার্য, যা কর্তৃপক্ষ নিশ্চিত করতে ব্যর্থ হয়েছে। স্টলের জায়গাই যেখানে আজ পর্যন্ত নির্দিষ্ট হয়নি, সেখানে শুধু ভাড়া মওকুফের সুবিধা নিয়ে খোলা মাঠে বইমেলা করা যায় না।
তাই বাধ্য হয়েই, বাস্তবতার নিরিখে ‘প্রকাশক ঐক্য’ এবারের বইমেলায় অংশগ্রহণ থেকে নিজেদের বিরত রাখছে। ‘প্রকাশক ঐক্য’-এর শীর্ষস্থানীয় প্রকাশকরা মেলায় অংশ নিতে পারছেন না বলে সর্বস্তরের সাধারণ প্রকাশকরাও মেলায় অংশ নেবেন না বলে জানিয়েছেন।
তবে আমরা বারবার আমাদের সদস্যদের আশ্বস্ত করেছি যে, কোন প্রকাশক যদি তার ব্যক্তিগত ও ব্যবসায়িক অবস্থান থেকে মেলায় অংশগ্রহণ করতে চান, তবে তাতে বাকি প্রকাশকদের কোনো আপত্তি থাকবে না।
আমরা কোনোভাবেই মেলার বা সরকারের প্রতিপক্ষ নই। আমরা চাই একুশের বইমেলা তার আপন মহিমায় উদযাপিত হোক। নবনির্বাচিত গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকারের মাননীয় প্রধানমন্ত্রী জনাব তারেক রহমান প্রথমবারের মতো এই বইমেলার উদ্বোধন করবেন, আমরা তাঁকে আন্তরিক শুভেচ্ছা ও অভিনন্দন জানাই এবং এবারের বইমেলার সার্বিক সাফল্য কামনা করছি।
আমরা আশাবাদী, গণতান্ত্রিকভাবে নির্বাচিত সরকার খুব দ্রুতই বাংলাদেশের প্রকাশনা শিল্পকে রক্ষা করার স্বার্থে প্রকাশকদের দাবিকে গুরুত্ব দিয়ে বিবেচনা করবেন এবং গ্রন্থখাতের উন্নয়নের লক্ষ্যে সরকারের দিক থেকে করণীয় সকল ভূমিকা পালন করবেন। বহুল প্রতীক্ষিত নির্বাচিত সরকারকে এই সকল কাজে দিকনির্দেশনা দেয়ার জন্য আমাদের তরফ থেকে সবরকম সহযোগিতার আশ্বাস দিচ্ছি।
ধন্যবাদান্তে,
প্রকাশক ঐক্য-এর পক্ষে
১. মেছবাহউদ্দীন আহমদ (প্রকাশক, আহমদ পাবলিশিং হাউজ)
২. এ.কে নাসির আহমেদ (প্রকাশক, কাকলী)
৩. মনিরুল হক (প্রকাশক, অনন্যা)
৪. মাজহারুল ইসলাম (প্রকাশক, অন্যপ্রকাশ)
৫. সৈয়দ জাকির হোসাইন (প্রকাশক, অ্যাডর্ন পাবলিকেশন)
৬. জসীম উদ্দিন (প্রকাশক, কথাপ্রকাশ)
৭. মোহাম্মদ নাজিম উদ্দিন (প্রকাশক, বাতিঘর প্রকাশনী; বেস্টসেলার থ্রিলার লেখক)
৮. মো. মোবারক হোসেন ( পাণ্ডুলিপি সমন্বয়ক, প্রথমা প্রকাশন)
৯. মো. গফুর হোসেন (প্রকাশক, রিদম প্রকাশনা সংস্থা)
১০. ইকবাল হোসেন সানু (প্রকাশক, লাবনী)
১১. দীপঙ্কর দাশ (প্রকাশক, বাতিঘর)
১২. কামরুল হাসান শায়ক (প্রকাশক, পাঞ্জেরি পাবলিকেশন্স)
১৩. মো. জহির দীপ্তি (প্রকাশক, ইতি প্রকাশন; সদস্য, অমর একুশে বইমেলা কমিটি ২০২৬)
১৪. মাহ্রুখ মহিউদ্দীন (প্রকাশক, ইউপিএল; সদস্য, অমর একুশে বইমেলা কমিটি ২০২৬)
১৫. মাহাবুব রাহমান (প্রকাশক, আদর্শ; সদস্য, অমর একুশে বইমেলা কমিটি ২০২৬)
ঈদের আগেই ইমাম-মুয়াজ্জিনদের অনেকেই পাবেন সম্মানী: মাহদী আমিন
মার্চের দ্বিতীয় সপ্তাহে বসছে সংসদের প্রথম অধিবেশন