ইরান-যুক্তরাষ্ট্র যুদ্ধের আবহে বিশ্বজুড়ে তেলের বাজারে যখন হাহাকার, তখন কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ ‘হরমুজ প্রণালী’ নিয়ে সামনে এসেছে এক চাঞ্চল্যকর তথ্য। কাগজে-কলমে এই জলপথটি অবরুদ্ধ মনে হলেও, বাস্তবে ইরান এখান দিয়ে বেছে বেছে কিছু জাহাজ চলাচলের অনুমতি দিচ্ছে। এক বিশেষ ‘সেফ করিডোর’ বা নিরাপদ পথ তৈরি করে তেহরান যেমন নিজের তেল রপ্তানি সচল রেখেছে, তেমনি চীন, ভারত ও পাকিস্তানের মতো বন্ধুপ্রতিম দেশগুলোর জাহাজকেও পার হওয়ার সুযোগ দিচ্ছে।
গত ১ মার্চ থেকে শুরু হওয়া যুদ্ধের পর থেকে হরমুজ প্রণালী দিয়ে সাধারণ বাণিজ্যিক চলাচল কার্যত বন্ধ। কিন্তু সামুদ্রিক তথ্য বিশ্লেষণকারী সংস্থা ‘লয়েডস লিস্ট ইন্টেলিজেন্স’ জানাচ্ছে, গত ১৫ দিনে অন্তত ৯০টি জাহাজ এই সংকীর্ণ জলপথটি অতিক্রম করেছে। এর মধ্যে ১৬টি তেলবাহী ট্যাঙ্কারও রয়েছে। যেখানে যুদ্ধের আগে প্রতিদিন ১০০ থেকে ১৩৫টি জাহাজ চলাচল করত, সেখানে এখন সংখ্যাটি অনেক কম হলেও পুরোপুরি শূন্য নয়। কারা পার হচ্ছে এই ‘বিপজ্জনক’ পথ?

বিশ্লেষকদের মতে, ইরান এই জলপথটিকে সম্পূর্ণ বন্ধ না করে ‘নির্বাচিতভাবে’ খোলা রেখেছে।পশ্চিমা নিষেধাজ্ঞা এড়িয়ে ইরান তার ‘ডার্ক ফ্লিট’ বা ছদ্মবেশী ট্যাঙ্কারের মাধ্যমে গত দুই সপ্তাহে প্রায় ১ কোটি ৬০ লাখ ব্যারেলের বেশি তেল রপ্তানি করেছে, যার বড় অংশই গেছে চীনে। অনেক জাহাজ নিজেদের ‘চীনা মালিকানাধীন’ বা ‘চীনা ক্রু’ বলে ঘোষণা দিয়ে আক্রমণ এড়িয়ে পার হচ্ছে।
এছাড়া গ্রিস ও ভারতের কিছু জাহাজও এই পথ ব্যবহার করেছে। সম্প্রতি পাকিস্তানের পতাকাবাহী ট্যাঙ্কার ‘এমটি করাচি’ এবং ভারতের দুটি এলপিজিবাহী জাহাজ ‘শিভালিক’ ও ‘নন্দা দেবী’ সফলভাবে এই প্রণালী অতিক্রম করেছে। ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রী এস জয়শঙ্কর জানিয়েছেন, তেহরানের সাথে কূটনৈতিক আলোচনার মাধ্যমেই এই জাহাজগুলো পার হতে পেরেছে।

বিশ্ববাজারে তেলের দাম ব্যারেল প্রতি ১০০ ডলার ছাড়িয়ে যাওয়ায় মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প মিত্র দেশগুলোর ওপর চাপ সৃষ্টি করছেন যাতে তারা যুদ্ধজাহাজ পাঠিয়ে এই পথটি পুনরায় উন্মুক্ত করে। তবে মজার বিষয় হলো, মার্কিন ট্রেজারি সেক্রেটারি স্কট বেসেন্ট জানিয়েছেন, বিশ্ববাজারে তেলের সরবরাহ স্বাভাবিক রাখতে যুক্তরাষ্ট্র বর্তমানে ইরানি ট্যাঙ্কারগুলোকে চলাচলের সুযোগ দিচ্ছে। ট্রাম্প প্রশাসন ইরানের ‘খারাগ দ্বীপের’ সামরিক স্থাপনায় বোমা হামলা চালালেও তেলের অবকাঠামোতে আপাতত হাত দেয়নি।
ইরান হুঁশিয়ারি দিয়েছে, তারা যুক্তরাষ্ট্র, ইসরাইল বা তাদের মিত্রদের জন্য ‘এক লিটার তেলও’ এই পথ দিয়ে যেতে দেবে না। পরামর্শক প্রতিষ্ঠান ‘রেড্ডাল’-এর ক্লায়েন্ট ডিরেক্টর কুন কাও বলেন, হরমুজ প্রণালী এখন আর সবার জন্য উন্মুক্ত কোনো পথ নয়; এটি এখন ইরানের একটি কৌশলগত অস্ত্র। তারা কেবল তাদের অনুগত বা সমঝোতাকারী দেশগুলোর চলাচলের অনুমতি দিচ্ছে।

ডাচ ব্যাংক আইএনজি-এর কৌশলবিদরা মনে করছেন, ইরান যদি জ্বালানির দাম বাড়িয়ে বিশ্ব অর্থনীতিতে ‘ব্যথা’ দেয়ার পরিকল্পনা করে, তবে জাহাজ চলাচলের এই সংখ্যা আরও কমিয়ে আনতে পারে। বর্তমানে তেলের দাম যুদ্ধের শুরুর তুলনায় প্রায় ৪০ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়েছে, যা সাধারণ মানুষের নাভিশ্বাস তুলছে।
হরমুজ প্রণালী এখন আর শুধু একটি জলপথ নয়, বরং ভূ-রাজনীতির দাবার বোর্ডে পরিণত হয়েছে। ইরান প্রমাণ করে দিচ্ছে যে, অবরোধের মধ্যেও তারা বিশ্ববাজারের নাটাই নিজেদের হাতে রাখার ক্ষমতা রাখে।
তথ্যসূত্র: এনডিটিভি
