ইরানের সঙ্গে দুই মাসের যুদ্ধে বিশ্ব অর্থনীতির পাশাপাশি ঘরোয়া জীবনযাত্রার ব্যয় আকাশমুখী হওয়ায় এখন বড় ধরনের চাপের মধ্যে রয়েছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। এরপরও তিনি ইরানকে কাবু করতে হরমুজ প্রণালীতে অনির্দিষ্টকালের জন্য নৌ অবরোধ বজায় রাখার প্রস্তুতি নিতে পেন্টাগনকে নির্দেশ দিয়েছেন। এই খবরের সঙ্গে বিশ্ব জ্বালানির বাজার আবারও টালমাটাল হয়ে পড়েছে।
এই পরিস্থিতিতে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ইরানের বন্দরগুলোতে দীর্ঘমেয়াদী অবরোধের সম্ভাব্য প্রভাব কাটিয়ে ওঠার বিষয়ে শীর্ষস্থানীয় তেল কোম্পানিগুলোর সাথে আলোচনা করেছেন। একই সঙ্গে তিনি তেহরানকে দ্রুত একটি চুক্তিতে আসার আহ্বান জানিয়ে 'শিগগিরই বুদ্ধিমান হওয়ার' পরামর্শ দিয়েছেন।
মঙ্গলবার হোয়াইট হাউসে তেল খাতের নির্বাহীদের সাথে ট্রাম্পের এই বৈঠকটি এমন এক সময়ে অনুষ্ঠিত হলো যখন দুই দেশের সংঘাত নিরসনে কয়েক দিনের স্থবিরতা বিরাজ করছে। ইরানকে আলোচনার টেবিলে বাধ্য করতে এবং হরমজ প্রণালী পুনরায় খুলে দেয়ার জন্য যুক্তরাষ্ট্র বর্তমানে নৌ-অবরোধের মাধ্যমে ইরানের তেল রপ্তানি বন্ধ করার চেষ্টা করছে।
এই অবরোধ দীর্ঘস্থায়ী হলে মার্কিন গ্রাহকদের ওপর যেন নেতিবাচক প্রভাব না পড়ে, তা নিশ্চিত করতেই এই বৈঠক। এদিকে, অবরোধ দীর্ঘায়িত হওয়ার খবরে বিশ্ববাজারে তেলের দাম প্রায় চার শতাংশ বেড়ে গেছে এবং ব্রেন্ট ক্রুড অয়েলের দাম গত এক মাসের মধ্যে সর্বোচ্চ পর্যায়ে পৌঁছেছে।

ইরানের অর্থনীতিতে ধস: যুদ্ধের প্রভাবে ইরানের অর্থনীতি চরম বিপর্যয়ের মুখে পড়েছে। বুধবার ইরানের মুদ্রা 'রিয়াল'-এর মান মার্কিন ডলারের বিপরীতে রেকর্ড সর্বনিম্ন ১,৮১০,০০০-এ নেমে এসেছে। গত দুই দিনেই মুদ্রার মান কমেছে প্রায় ১৫ শতাংশ। মুদ্রাস্ফীতির হারও আকাশচুম্বী, যা বর্তমানে প্রায় ৬৫.৮ শতাংশে দাঁড়িয়েছে। যদিও ইরানি কর্মকর্তারা দাবি করেছেন যে বিকল্প বাণিজ্য পথ ব্যবহার করে তারা এই অবরোধ মোকাবিলা করতে সক্ষম, তবে মুদ্রার এই ব্যাপক পতন সাধারণ মানুষের জীবনে নাভিশ্বাস তুলে দিচ্ছে।
পরমাণু ইস্যু ও কূটনৈতিক অচলাবস্থা: ট্রাম্পের প্রধান শর্ত হলো ইরানকে পরমাণু কর্মসূচি নিয়ে শুরুতেই আলোচনা করতে হবে। বিপরীতে ইরান প্রস্তাব দিয়েছে যে, আগে যুদ্ধের আনুষ্ঠানিক সমাপ্তি এবং জাহাজ চলাচল সংক্রান্ত বিবাদ মেটাতে হবে, এরপর পরমাণু ইস্যু নিয়ে আলোচনা হবে।
ট্রাম্প তাঁর সোশ্যাল মিডিয়া পোস্টে একটি বিতর্কিত ছবি শেয়ার করে হুঁশিয়ারি দিয়েছেন যে ইরান জানে না কীভাবে অ-পারমাণবিক চুক্তিতে সই করতে হয়। ইরান অবশ্য বরাবরই দাবি করে আসছে যে তাদের পরমাণু কর্মসূচি কেবল শান্তিপূর্ণ বেসামরিক উদ্দেশ্যে।

ঘরোয়া চাপে ট্রাম্প: ইরান যুদ্ধে বিপুল খরচ এবং তেলের দাম বেড়ে যাওয়ার কারণে নিজ দেশেও চাপের মুখে আছেন ডোনাল্ড ট্রাম্প। রয়টার্স/ইপসোস-এর সাম্প্রতিক জরিপ অনুযায়ী, তাঁর জনপ্রিয়তার হার কমে ৩৪ শতাংশে দাঁড়িয়েছে, যা এই মেয়াদে সর্বনিম্ন। অন্যদিকে, এশিয়ার দেশগুলো জ্বালানি সংরক্ষণে হিমশিম খাচ্ছে এবং ইউরোপীয় ইউনিয়নও ভর্তুকি দিয়ে পরিস্থিতি সামাল দেওয়ার চেষ্টা করছে।
ইরানের অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতেও বড় পরিবর্তন এসেছে। শীর্ষ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনিসহ গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিদের মৃত্যুর পর ক্ষমতার নিয়ন্ত্রণ এখন মূলত কট্টরপন্থী রেভোলিউশনারি গার্ড কমান্ডারদের হাতে। এই জটিল পরিস্থিতিতে ইরান কি ট্রাম্পের ভাষায় 'বুদ্ধিমান' হয়ে চুক্তিতে ফিরবে, নাকি সংঘাত আরও দীর্ঘায়িত হবে, সেদিকেই এখন তাকিয়ে আছে বিশ্ব।
