ফিফা যখন বিশ্বকাপের দলসংখ্যা বাড়িয়ে ৪৮ করার সিদ্ধান্ত নিয়েছিল, তখন ফুটবল বিশ্বের অনেক পণ্ডিতই নাক সিটকেছিলেন। কিন্তু গত শুক্রবার আমেরিকার হিউস্টন স্টেডিয়ামে যা ঘটল, তা যেন ফিফার সেই বর্ধিত বিশ্বকাপের স্বপ্নকে এক ফুঁৎকারে সার্থক করে দিল! মাঠের খেলা শেষে মাত্র ৫ লাখ জনসংখ্যার পুঁচকে দ্বীপরাষ্ট্র কেপ ভার্দের এক ঝাঁক ফুটবলার যখন ড্রেসিংরুমে একটিমাত্র মোবাইল ফোনের স্ক্রিনে চোখ রেখে স্পেন বনাম উরুগুয়ে ম্যাচের শেষ মুহূর্তের কাউন্টডাউন দেখছিলেন, আর ম্যাচ শেষ হতেই বুনো উল্লাসে ফেটে পড়লেন, সেই দৃশ্যই হয়ে রইল এই বিশ্বকাপের সবচেয়ে মধুর ও ঐতিহাসিক মুহূর্ত।
স্পেনের জয়ের সুবাদে সৌদি আরবকে ০-০ গোলে রুখে দিয়ে বিশ্বকাপের এইচ-গ্রুপ থেকে রূপকথার মতো শেষ ৩২ বা নকআউট পর্ব নিশ্চিত করেছে আফ্রিকার এই অদম্য দলটি। ৩ জুলাই মায়ামিতে বিশ্বচ্যাম্পিয়ন আর্জেন্টিনার বিরুদ্ধে মহাকাব্যিক লড়াইয়ে নামবে তারা।

হিউস্টনের গ্যালারিতে তখন কেপ ভার্দে সমর্থকদের নাচ, গান আর আনন্দের অশ্রু একাকার হয়ে গিয়েছিল। ম্যাচ শুরুর আগেই কেপ ভার্দের কোচ বুবিস্তা গর্জন করে বলেছিলেন, বিশ্বকাপ শুধু গুটিকয়েক এলিট বা পরাশক্তিদের জন্য নয়, বিশ্বকাপ সব জাতির জন্য। আর মাঠের পারফরম্যান্সে তাঁর ছেলেরা প্রমাণ করল, বুক চিতিয়ে লড়লে ফুটবল মাঠে যে কোনো অসাধ্য সাধন সম্ভব।
স্পেন, উরুগুয়ে আর সৌদি আরবের মতো পরাশক্তিদের গ্রুপে একটি ম্যাচও না হেরে, টানা তিনটি লড়াকু ড্র নিয়ে নকআউটে পা রাখা কেপ ভার্দের মাঝমাঠের জেনারেল ডেরয় দুয়ার্তে ম্যাচসেরা পুরস্কার জিতেছেন। নিজের আবেগ ধরে রাখতে না পেরে দুয়ার্তে বলেন, সত্যি বলতে, এটা পুরো পাগল করা একটা অনুভূতি! আমার মনে হচ্ছে আমি কোনো অবাস্তব স্বপ্নের মধ্যে বেঁচে আছি। ছোটবেলা থেকেই বিশ্বকাপে খেলার স্বপ্ন দেখতাম। কিন্তু ম্যাচের সেরা হওয়া আর দেশের হয়ে ইতিহাস গড়া, আমি কখনো কল্পনাও করতে পারিনি।

তিনি আরও যোগ করেন, প্রথমে আমাদের এই ঐতিহাসিক অর্জনটা মন ভরে উদযাপন করতে দিন। আমরা ভীষণ খুশি। আশা করি দেশের সব মানুষ আজ আনন্দে ভাসছেন। আগামীকাল থেকে আমরা পরবর্তী ম্যাচ নিয়ে ভাববো। ম্যাচটা আর্জেন্টিনার বিরুদ্ধে, তাই না? প্রচণ্ড কঠিন লড়াই হবে, তবে আমাদের বিশ্বাস রাখতে হবে। ফুটবলে যে কোনো কিছুই সম্ভব!
কাগজে-কলমে লিওনেল মেসির আর্জেন্টিনার বিরুদ্ধে পরের রাউন্ডে কেপ ভার্দের জিতে যাওয়ার সম্ভাবনা হয়তো ক্ষীণ, কিন্তু তারা ইতিমধ্যেই বিশ্ব ফুটবলের পাতায় এমন এক গল্প লিখে ফেলেছে যা চিরকাল মনে থাকবে। বিশেষ করে টুর্নামেন্টের উদ্বোধনী ম্যাচে বিশ্বসেরা স্পেনের বিরুদ্ধে তাদের যে দাঁতে দাঁত চাপা রক্ষণাত্মক লড়াই, তা বিশ্বজুড়ে লাখো ফুটবলপ্রেমীর মন জয় করে নিয়েছে। আর সেই ভালোবাসার জোয়ার এতটাই তীব্র ছিল যে, গত শুক্রবার হিউস্টন স্টেডিয়ামের গ্যালারি নীল-সাদা জার্সির বদলে কেপ ভার্দের জার্সিতে সয়লাব হয়ে গিয়েছিল।

মেসি-এনজোদের বিশ্বজয়ী আক্রমণভাগের সামনে কেপ ভার্দের এই রূপকথা মায়ামির মাঠে কতদূর ডানা মেলে, তা দেখার জন্য এখন চাতক পাখির মতো চেয়ে আছে পুরো ফুটবল দুনিয়া!
