লাইসেন্স নেই একটি ট্রলারেরও, জীবিকার সাগর যখন ‘মৃত্যুফাঁদ’

আপডেট : ১৬ জুলাই ২০২৬, ০৫:২৩ পিএম

‘মা, দোয়া কইরো। মাছ পাইলে দুই-তিন দিনের মধ্যে আমি আর আব্বা ফিরমু..."

গলাচিপা উপজেলার গজালিয়া ইউনিয়নের তরুণ জেলে আবু সাইমের শেষ ফোনালাপ ছিল এটিই। মায়ের কাছে করা সেই প্রতিশ্রুতির পর আর কোনো ফোন আসেনি। কয়েক ঘণ্টা পর খবর আসে, ঝড়ের কবলে পড়ে বঙ্গোপসাগরে ডুবে গেছে তাদের মাছ ধরার ট্রলারটি। কেউ কেউ সাতরে কিংবা অন্য ট্রলারে চড়ে অলৌকিকভাবে বেঁচে ফিরলেও, আবু সাইম আর তার বাবা ফোরকান সিকদারের খোঁজ মেলেনি আজও।

আজও সন্ধ্যা নামলে ঘাটের দিকে অপলক তাকিয়ে থাকেন সাইমের মা। প্রতিটি ট্রলার ভিড়লেই বুকটা ধক করে ওঠে—এই বুঝি ফিরে এলো তার কলিজার টুকরো। কিন্তু সেই অপেক্ষার শেষ হয় না। স্বামী আর বড়ো ছেলেকে হারিয়ে পরিবারটি এখন চরম অর্থনৈতিক সঙ্কটে। শোক, অভাব আর অনিশ্চয়তায় ভুগতে থাকা এই মা এখন নিজেই নানা রোগে আক্রান্ত, অথচ চিকিৎসা করানোর ন্যূনতম সামর্থ্যও নেই।

উপকূলের হাজারো পরিবারের কাছে বঙ্গোপসাগর শুধু একটি জলরাশি নয়; এটি তাদের জীবিকার একমাত্র অবলম্বন। কারও লক্ষ্য সংসারের খরচ চালানো, কারও ব্যাংক বা এনজিওর ঋণ শোধ, আবার কারও আশা—একটি ভালো মাছের মৌসুমেই বদলে যাবে ভাগ্য। কিন্তু একাত্তরের অনুসন্ধানে উঠে এসেছে এক ভয়ঙ্কর বাস্তব চিত্র: গলাচিপা উপজেলার একটি ট্রলারেরও গভীর সমুদ্রে মাছ ধরার বৈধ লাইসেন্স নেই! অথচ বছরের পর বছর এসব ট্রলার কোনো রকম নিরাপত্তা সরঞ্জাম ছাড়াই হাজারো জেলের জীবনকে ঝুঁকির মুখে ঠেলে দিয়ে সাগরে পাড়ি জমাচ্ছে।

আইনের কঠোর বিধান, বাস্তবতায় শুভঙ্করের ফাঁকি

বাংলাদেশের সামুদ্রিক মৎস্য আইন, ২০২০ অনুযায়ী গভীর সমুদ্রে বাণিজ্যিকভাবে মাছ ধরার জন্য নির্ধারিত লাইসেন্স, নিবন্ধন এবং সরকারের শর্ত পূরণ বাধ্যতামূলক। একই সঙ্গে সমুদ্রগামী প্রতিটি ট্রলারে লাইফ জ্যাকেট, লাইফ বয়া, জিপিএস ও রেডিওসহ জীবনরক্ষাকারী উপকরণ থাকা আইনি বাধ্যবাধকতা।

কিন্তু গলাচিপা উপজেলা মৎস্য অফিসের তথ্য অনুযায়ী, উপজেলার কোনো ট্রলারেরই গভীর সমুদ্রে মাছ ধরার লাইসেন্স নেই। বর্তমানে মৎস্য বিভাগ থেকে যে ১৯০টি অনুমতিপত্র দেওয়া হয়েছে, তা শুধুমাত্র উপকূলীয় (কাছাকাছি) এলাকায় মাছ ধরার জন্য প্রযোজ্য।

তাহলে গভীর সাগরে যাওয়ার বৈধ লাইসেন্স ছাড়া কীভাবে বছরের পর বছর এসব ট্রলার বুক ফুলিয়ে সমুদ্রে যাচ্ছে? সমুদ্রযাত্রার আগে ট্রলারগুলোর সক্ষমতা ও আইনি বৈধতা যাচাইয়ের দায়িত্ব আসলে কার?

২৫ বছর ধরে সাগরে মাছ ধরা জেলে বেল্লাল ঝামি বলেন, আমাদের ট্রলারে লাইফ জ্যাকেট, লাইফ বয়া, জিপিএস বা রেডিও—কোনোটিই নেই। আগে কখনো এসব যাচাই করা হয়নি, এখনও হয় না। আমরা মৎস্য বিভাগের অনুমতিপত্র নিয়েই গভীর সাগরে যাই, এটাকেই লাইসেন্স মনে করি।

একই সুর শোনা গেলো ট্রলার মালিক মো. আল মামুন মৃধার কণ্ঠেও। তিনি দাবি করেন, উপজেলা মৎস্য অফিস থেকে পাওয়া অনুমতিপত্রকেই আমরা দীর্ঘদিন লাইসেন্স মনে করে গভীর সমুদ্রে মাছ ধরতে গেছি। গভীর সমুদ্রে যাওয়ার জন্য যে আলাদা লাইসেন্স ও বড়ো ট্রলারের প্রয়োজন, তা অধিকাংশ মালিকই জানেন না। তবে নিয়মিত মনিটরিং হলে এক মাসের মধ্যেই সব ট্রলারে নিরাপত্তা সরঞ্জাম নিশ্চিত করা সম্ভব।

সরকারি তথ্যেও শুভঙ্করের ফাঁকি: নেই দুর্ঘটনার পূর্ণাঙ্গ হিসাব

সরকারি খাতায় সাগরে ট্রলারডুবির কোনো পূর্ণাঙ্গ তথ্য নেই। মৎস্য অফিসের নথি বলছে, গত পাঁচ বছরে সাগরে মাছ ধরতে গিয়ে ১৪ জন জেলে নিহত হয়েছেন এবং এ বছর নিখোঁজ রয়েছেন পাঁচজন। তবে এই তথ্য মূলত নিহতদের পরিবারকে দেওয়া সরকারি আর্থিক সহায়তার তালিকার ভিত্তিতে তৈরি। একই সময়ে কতোটি ট্রলারডুবির ঘটনা ঘটেছে, কতোজন আহত বা নিখোঁজ হয়েছেন—সে বিষয়ে তাদের কাছে কোনো সুনির্দিষ্ট ডাটা নেই।

অনুসন্ধানে গলাচিপা উপজেলা আদালত সূত্রে জানা যায়, সাগরে ট্রলারডুবির ঘটনায় এখন পর্যন্ত কোনো ফৌজদারি মামলা দায়েরের তথ্য পাওয়া যায়নি। ফলে গত পাঁচ বছরে ট্রলারডুবি ও প্রাণহানির প্রকৃত সংখ্যা নির্ভরযোগ্যভাবে জানার কোনো উপায় নেই।

উদ্ধার অভিযান নিয়ে প্রশ্ন ও কোস্ট গার্ডের অসহায়ত্ব

চলতি বছরের ট্রলারডুবিতে গজালিয়া ইউনিয়ন থেকে জীবিত ফিরে আসা জেলে আল আমিন দাবি করেন, দুর্ঘটনার পর তিনি টানা চার দিন সাগরে ভেসে ছিলেন। ক্ষোভ প্রকাশ করে তিনি বলেন, ওই চার দিন কোস্ট গার্ড বা নৌবাহিনীর কোনো উদ্ধারকারী জাহাজ আমাদের চোখে পড়েনি। সময়মতো কার্যকর উদ্ধার অভিযান চালানো হলে নিখোঁজ পাঁচ জেলেকে হয়তো জীবিত উদ্ধার করা সম্ভব হতো।

এই বিষয়ে বাংলাদেশ কোস্ট গার্ড দক্ষিণ জোনের রাঙ্গাবালী কন্টিনজেন্ট কমান্ডার (সিসি) মো. ইমরান কবির বলেন, আমরা খবর পাওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে জানাই এবং নির্দেশনা অনুযায়ী কাজ করি। তবে বিগত বছরগুলোর উদ্ধার অভিযানের কোনো তথ্য এই অফিসে নেই। আমি দায়িত্ব গ্রহণের পর এখন পর্যন্ত কোনো নৌকা বা জেলেকে উদ্ধার করা হয়নি। লাইসেন্স ছাড়া ট্রলার চলাচলের বিষয়ে তিনি জানান, যেসব ট্রলারকে সন্দেহ হয়, তারা কেবল সেগুলোতেই তল্লাশি চালান।

অন্যদিকে, গলাচিপা উপজেলা সিনিয়র মৎস্য কর্মকর্তা মো. জহিরুর নবী নিজের দায় এড়াতে বলেন, সমুদ্রে যাওয়ার আগে প্রতিটি ট্রলারের নিরাপত্তা সরঞ্জাম ও সমুদ্রগামী উপযোগিতা যাচাই করা মৎস্য অফিসের একার পক্ষে সম্ভব নয়। এসব বিষয় দেখার দায়িত্ব নৌবাহিনী ও কোস্ট গার্ডসহ সংশ্লিষ্ট সংস্থার।

তিনি আরও বলেন, দেশে ট্রলারডুবিতে নিহত বা নিখোঁজের ঘটনায় মামলা করার সংস্কৃতি এখনো গড়ে ওঠেনি।

সমাধানের পথ কোথায়?

প্রতিবছর একই ধরনের দুর্ঘটনা, একই স্বজন হারানোর আর্তনাদ এবং তদন্তের একই চর্বিতচর্বণ প্রতিশ্রুতি—কিন্তু বাস্তব পরিবর্তনের চিত্র শূন্য।

এই চরম অব্যবস্থাপনা নিয়ে ঢাকা শেরেবাংলা কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের ফিশারিজ অ্যান্ড মেরিন সায়েন্স অনুষদের সহকারী অধ্যাপক ও গবেষক মীর মোহাম্মদ আলী জানান, শুধু ঝড়ের পূর্বাভাস প্রচার করলেই সমুদ্রের এই অকাল মৃত্যু কমবে না। বাধ্যতামূলক নিরাপত্তা সরঞ্জাম নিশ্চিত করা, ঘাটগুলোতে নিয়মিত আইনি পরিদর্শন, জেলেদের আধুনিক প্রশিক্ষণ, উন্নত যোগাযোগ ব্যবস্থা এবং দ্রুত উদ্ধার সক্ষমতা বৃদ্ধির পাশাপাশি মৎস্য আইনের কঠোর বাস্তবায়ন করতে হবে।

বঙ্গোপসাগর বাংলাদেশের অর্থনীতির অন্যতম চালিকাশক্তি। কিন্তু যতোক্ষণ না পর্যন্ত সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলোর মধ্যে সমন্বয় ঘটবে এবং লাইসেন্সবিহীন ট্রলারের সমুদ্রযাত্রা বন্ধে কঠোর পদক্ষেপ নেওয়া হবে, ততোক্ষণ জীবিকার এই নীল সমুদ্র উপকূলের হাজারো অসহায় জেলে পরিবারের কাছে কেবলই এক অন্ধকার ‘মৃত্যুফাঁদ’ হয়ে থাকবে।

একাত্তর/এসি
পটুয়াখালীর রাঙ্গাবালীতে মাছ ধরতে গিয়ে বজ্রপাতে ট্রলার থেকে পড়ে নিখোঁজ হওয়ার দুইদিন পর ট্রলার মাঝি রুবেল হাওলাদারের (২৮) মরদেহ উদ্ধার করা হয়েছে।
কক্সবাজারের কুতুবদিয়া চ্যানেলে ট্রলারডুবির ঘটনায় নিখোঁজ পাঁচ জেলের মধ্যে চারজনের মরদেহ উদ্ধার করা হয়েছে। 
পটুয়াখালীর গলাচিপায় উলানিয়া হাট স্কুল অ্যান্ড কলেজের শিক্ষিকা দীপা রানী দাসের (৫১) রহস্যজনক ও অস্বাভাবিক মৃত্যুর সুষ্ঠু তদন্ত, প্রকৃত ঘটনা উদ্‌ঘাটন এবং দোষীদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবিতে...
পটুয়াখালীর কলাপাড়ায় কুয়াকাটা-সংলগ্ন গভীর বঙ্গোপসাগরে জেলেদের জালে ধরা পড়েছে বিরল ও দৃষ্টিনন্দন প্রজাতির দুটি সামুদ্রিক ‘লায়ন ফিশ’ (সিংহ মাছ)। লম্বা কাঁটাযুক্ত পৃষ্ঠীয় পাখনা, পাখার মতো ছড়ানো...
আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমগুলো এই ম্যাচকে ২০২৬ বিশ্বকাপের ‘স্বপ্নের ফাইনাল’ হিসেবে আখ্যা দিয়েছে। একদিকে শিরোপাধারী আর্জেন্টিনা, অন্যদিকে ইউরো ২০২৪ চ্যাম্পিয়ন স্পেন।
হবিগঞ্জের আজমিরীগঞ্জ উপজেলায় তিনটি মোটরসাইকেলের মুখোমুখি সংঘর্ষে তিন যুবক নিহত হয়েছেন। এ ঘটনায় আরও দুইজন গুরুতর আহত হয়েছেন।
প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান দায়িত্ব গ্রহণের পর বাংলাদেশি শিক্ষার্থীদের জন্য প্রতি বছর ৫০০টি শিক্ষাবৃত্তি দেওয়ার ঘোষণা দিয়েছে সৌদি আরব।
পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী শামা ওবায়েদ ইসলাম বলেছেন, তিনি বাংলাদেশে ফিরলে আইন অনুযায়ী তাকে তাৎক্ষণিকভাবে গ্রেপ্তার করা হবে। তবে তাকে দেশে ফিরিয়ে আনতে ভারতের রাজনৈতিক ও কূটনৈতিক সহযোগিতা প্রয়োজন।
লোডিং...
সর্বশেষপঠিত

এলাকার খবর