পটুয়াখালীর কলাপাড়ায় কুয়াকাটা-সংলগ্ন গভীর বঙ্গোপসাগরে জেলেদের জালে ধরা পড়েছে বিরল ও দৃষ্টিনন্দন প্রজাতির দুটি সামুদ্রিক ‘লায়ন ফিশ’ (সিংহ মাছ)। লম্বা কাঁটাযুক্ত পৃষ্ঠীয় পাখনা, পাখার মতো ছড়ানো বক্ষ-পাখনা আর লাল-কমলা ডোরাকাটা দেহের এই মাছ দুটি স্থানীয় জেলেদের কাছে ‘বাঘা মাছ’ বা ‘রাওয়া ফিশ’ নামে পরিচিত। এর ঠিক আগের দিন একই এলাকায় জেলেদের জালে ধরা পড়েছিল আরেকটি বিরল প্রজাতির ‘লাইন্ড সার্জন ফিশ’। তবে ‘লায়ন ফিশ’ এবারই প্রথম ধরা পড়েছে বলে দাবি করা হচ্ছে। যদিও এ ব্যাপারটি এখনও পুরোপুরি যাচাই করা যায়নি।
সম্প্রতি কুয়াকাটা সৈকত থেকে প্রায় ৭০ কিলোমিটার দক্ষিণে গভীর বঙ্গোপসাগরে ‘এফবি জাবের’ নামের একটি ট্রলারের জেলেদের জালে লায়ন ফিশ দুটি ধরা পড়ে।
মৎস্য বন্দর আলীপুরের ‘মায়ের দোয়া ফিশ’ আড়তে মাছ দুটি বিক্রির জন্য আনা হলে তা দেখতে স্থানীয় জেলে ও সাধারণ মানুষ ভিড় জমান। শরীরজুড়ে লম্বা লম্বা পাখনা ও বিষাক্ত কাঁটাযুক্ত সাড়ে ৭০০ গ্রাম ওজনের মাছ দুটি পাঁচ হাজার টাকা কেজি দরে মোট তিন হাজার ৭৫০ টাকায় কিনে নেন ছগির আকন নামের এক ব্যবসায়ী।
বিশেষজ্ঞরা জানান, দেখতে অত্যন্ত আকর্ষণীয় হলেও লায়ন ফিশের পাখনা ও কাঁটাগুলো অত্যন্ত বিষাক্ত। এই কাঁটার আঘাতে মানুষের শরীরে তীব্র ব্যথার সৃষ্টি হতে পারে।
কুয়াকাটায় লায়ন ফিশ ধরা পড়া প্রসঙ্গে শেরেবাংলা কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের সহকারী অধ্যাপক ও ওয়ার্ল্ড ফিশের গবেষক মীর মোহাম্মদ আলী বলেন, লায়ন ফিশ বঙ্গোপসাগর তথা ইন্দো-প্যাসিফিক অঞ্চলের একটি স্থানীয় প্রজাতি। এটি কোনো ‘আক্রমণাত্মক বহিরাগত’ বা ক্ষতিকর মাছ নয়। আটলান্টিক, ক্যারিবীয় ও ভূমধ্যসাগরে এটি আগ্রাসী প্রজাতি হিসেবে পরিচিত হলেও আমাদের জলসীমায় এটি নিজের প্রাকৃতিক আবাসেই রয়েছে। কাজেই কুয়াকাটায় এটি ধরা পড়া সমুদ্রের জন্য নতুন কোনো হুমকি নয়, বরং কম-দৃশ্যমান একটি স্থানীয় প্রজাতির নথিভুক্ত উপস্থিতি মাত্র। তবে নিশ্চিত প্রজাতি শনাক্তে এর ডিএনএ বারকোডিং প্রয়োজন।
সমুদ্রে গভীরতা কমে যাওয়া, জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব ও খাদ্য সঙ্কটের কারণে প্রায়ই এ ধরনের বিরল প্রজাতির মাছ কুয়াকাটা উপকূলে দেখা যাচ্ছে। তবে গভীর সাগরের মাছ এভাবে ধরা পড়াটা একদিক থেকে ভালো লক্ষণ বলে জানান কলপাড়া উপজেলার সিনিয়র মৎস্য কর্মকর্তা অপু সাহা।
লায়ন ফিশ ধরা পড়ার আগের দিন কুয়াকাটার গভীর সমুদ্রে জেলেদের জালে আটকে পড়েছিল আরেকটি বিরল মাছ ‘লাইন্ড সার্জন ফিশ’। হলুদ, নীল ও কালো রঙের সমান্তরাল ডোরাকাটা অত্যন্ত দৃষ্টিনন্দন এ মাছটি স্থানীয়দের কাছে ‘সুন্দরী মাছ’ নামে পরিচিত। মৎস্য কর্মকর্তারা জানান, কুয়াকাটা উপকূলে সচরাচর দেখা না মিললেও বঙ্গোপসাগরের উষ্ণ জলরাশিতে এই দুই প্রজাতির মাছের বিচরণ রয়েছে। এ ধরনের মাছ জালে উঠলে জেলেদের বিশেষ সতর্কতার সঙ্গে তা নাড়াচাড়া করার পরামর্শ দিয়েছেন তারা।

লায়ন ফিশ
এর বৈজ্ঞানিক নাম Pterois volitans। সাধারণভাবে এদের জেব্রা ফিশ, বাটারফ্লাই কডও বলা হয়। স্থানীয় জেলেরা একে ‘বাঘা মাছ’ বা ‘রাওয়া মাছ’ বলেন। এদের শরীরে জেব্রার মতো লাল, সাদা ও বাদামি রঙের ডোরাকাটা দাগ থাকে। সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য বিষয় হলো এদের পাখনাগুলো। এদের পিঠের ও বুকের পাখনাগুলো পাখার মতো ছড়ানো এবং লম্বা সুতোর মতো কাঁটাযুক্ত থাকে। লায়ন ফিশের এই সুন্দর কাঁটাগুলো আসলে অত্যন্ত বিষাক্ত। এই কাঁটায় নিউরোটক্সিন নামের বিষ থাকে। কোনো মানুষের শরীরে এই কাঁটা ফুটলে তীব্র ব্যথা, বমি বমি ভাব এবং শ্বাসকষ্ট হতে পারে। তবে এটি সাধারণত নিজে থেকে তেড়ে এসে আক্রমণ করে না, আত্মরক্ষার জন্য কাঁটা ব্যবহার করে।

লাইন্ড সার্জন ফিশ
এর বৈজ্ঞানিক নাম Acanthurus lineatus। সাধারণভাবে ব্লু-ব্যান্ডেড সার্জন ফিশও বলা হয়। স্থানীয়রা একে ‘সুন্দরী মাছ’ বলে ডাকেন। এটি অত্যন্ত রঙিন একটি মাছ। এর শরীরে সমান্তরালভাবে উজ্জ্বল নীল ও হলুদ রঙের চমৎকার ডোরাকাটা দাগ থাকে এবং পেটের দিকটা কিছুটা হালকা বেগুনি বা সাদাটে হয়। এই মাছের লেজের গোড়ায় একটি বা দুটি অত্যন্ত ধারাল কাঁটা বা স্ক্যালপেল থাকে, যা দেখতে সার্জনের ব্যবহৃত চাকুর মতো ধারাল। কোনো শত্রু আক্রমণ করলে এরা লেজ দিয়ে আঘাত করে শরীর কেটে দিতে পারে। এ কারণেই এদের নাম ‘সার্জন ফিশ’।
