পুঁজিবাজারে ব্যাংকের মূলধনের যে ‘এক্সপোজার’ বা বিনিয়োগ সীমা রয়েছে, তার অতিরিক্ত বিনিয়োগ তুলে নিতে আগামী বছরের ডিসেম্বর পর্যন্ত সময় নির্ধারণ করে দিয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংক।
সোমবার কেন্দ্রীয় ব্যাংক এ বিষয়ে সার্কুলার জারি করে বাণিজ্যিক ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালকদের জানিয়েছে, গত ৩১ আগস্ট পর্যন্ত যে সকল ব্যাংকের সীমাতিরিক্ত বিনিয়োগ রয়েছে, সে সকল ব্যাংকের সীমাতিরিক্ত বিনিয়োগ নির্ধারিত সীমায় নামিয়ে আনতে ৩১ ডিসেম্বর ২০২৩ পর্যন্ত সময় প্রদানের সিদ্ধান্ত গ্রহীত হয়েছে।
সিকিউরিটিজ ধারনের ক্ষেত্রে সামষ্টিক বা এককভাবে কোন কোম্পানীর শেয়ারের বিষয়টি ধরতে হবে বলেও জানিয়েছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক।
পুঁজিবাজারে একটি ব্যাংক কতোটুকু বিনিয়োগ করতে পারবে তা ওই ব্যাংকের বিভিন্ন আর্থিক সূচকের উপর ভিত্তি করে একটি নীতি নির্ধারণ করে দিয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংক।
ব্যাংকের ওই বিনিয়োগকে যা ‘এক্সপোজার’ হিসেবে কেন্দ্রীয় ব্যাংকে জানাতে হয়। এর একটি উধ্তসীমা বা এক্সপোজার লিমিট রয়েছে।
পুঁজিবাজারে ব্যাংকের বিনিয়োগ বা এক্সপোজার হিসাব করতে হয় সিকিউরিটিজের ‘ক্রয়মূল্য ধরে গত ৪ অগাস্ট থেকে। এর আগে ‘বাজারমূল্য’ ধরে বিনিয়োগের পরিমাণ হিসাব করতে হতো।
অর্থমন্ত্রণালয়ের সিদ্ধান্তক্রমে বাংলাদেশ ব্যাংক জানিয়েছেন, ব্যাংক কোম্পানি আইন, ১৯৯১ এর ধারা ২৬ক এর উপ-ধারা (১) এর উদ্দেশ্য পূরণকল্পে ব্যাংক-কোম্পানি কর্তৃক অন্য কোনো কোম্পানির শেয়ারধারণের হিসাবায়নে পুঁজিবাজারে বিনিয়োগের ঊর্ধ্বসীমা (এক্সপোজার লিমিট) নির্ধারণের ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট ব্যাংক কর্তৃক ক্রয়কৃত মূল্যকেই ‘বাজারমূল্য’ হিসেবে বিবেচনা করতে হবে।”
এক্সপোজার লিমিট হিসাব করার এ নিয়ম পরিবর্তনের জন্য দীর্ঘদিন ধরেই বাংলাদেশ ব্যাংককে তাগিদ দিয়ে আসছিল পুঁজিবাজার নিয়ন্ত্রক সংস্থা।
কমিশনের যুক্তি, ক্রয়মূ্ল্যে এক্সপোজার লিমিট হিসাব করলে ব্যাংকের বিনিয়োগ সীমা বাড়ানোর সুযোগ থাকবে। আর হঠাৎ করেই ব্যাংকের কোনো সিকিউরিটিজ বিক্রি করার প্রয়োজন পড়বে না।
অবশ্য উল্টো মতও আছে ব্যাংকার ও অর্থনীতিবিদদের কারও কারও। তাদের মতে, নিয়মের এ পরিবর্তনে সুবিধা খুব একটা হবে না, বরং তাতে কারসাজির সুযোগ বাড়বে এবং দীর্ঘ মেয়াদে ব্যাংকের বিনিয়োগ ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে।
‘বাজারমূল্য’ থেকে ‘ক্রয়মূল্য’ হিসাব করার পর থেকে গোটা দশেক ব্যাংকের পুঁজিবাজারে বিনিয়োগের ‘এক্সপোজার লিমিট’ অতিরিক্ত করেছে।
তাদের বিনিয়োগ সীমায় নামিয়ে আনতে সুযোগ দিল বাংলাদেশ ব্যাংক। এখন ব্যাংকগুলোকে বিনিয়োগ সমন্বয় করতে হাতে থাকা সিকিউরিটজ বিক্রি বা ব্যাংকের মূলধন সক্ষমতা বাড়াতে হবে।
সিকিউরিটিজ বিক্রি করে বিনিয়োগ সন্বয় করতে বড় বাধা হচ্ছে পুঁজিবাজারের ‘ফ্লোর প্রাইস’। এর নিচে কোনো সিকিউরিটিজ বিক্রি করা যাবে না মূল বাজারে। শুধু ‘ব্লক’ এ বিক্রি করা যাবে ফ্লোর প্রাইসের চেয়ে কম দরে।
আবার ফ্লোর প্রাইসের চেয়ে কম দরে বিক্রি করতে অনেকের লোকসান গুনতে হবে জানিয়ে পুঁজিবাজার বিশেষজ্ঞ ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক শিক্ষক আবু আহমেদ বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেছেন, ‘‘দীর্ঘ এক বছর সময় পেয়েছে ব্যাংকগুলো, ততোদিন হয়তো ফ্লোর প্রাইস থাকবে না। যদি থাকে তাহলে ব্যাংকের জন সমস্যা।’’
দুটি ক্ষেত্রেই ব্যাংকগুলো সহসাই নতুন বিনিয়োগ যে করতে পারবে না তা নিশ্চিত বলা যায় বলে জানিয়েছেন আবু আহমেদ।
ব্যাংক কোম্পানি আইনে যা আছে
আইনের ২৬ ধারায় বলা আছে-
ব্যাংক কোম্পানি অন্য কোন কোম্পানির শেয়ার ধারণের ক্ষেত্রে নিম্ন বর্ণিত পরিমাণের অধিক শেয়ার ধারণ করিবে না, যথা-
(ক) ধারণকৃত শেয়ার বাজারমূল্যে উক্ত ব্যাংক-কোম্পানির আদায়কৃত মূলধন, শেয়ার প্রিমিয়াম, সংবিধিবদ্ধ সঞ্চিতি ও রিটেইন্ড আর্নিংস এর মোট পরিমাণের পাঁচ শতাংশ,
(খ) উক্ত কোম্পানির আদায়কৃত মূলধনের দশ শতাংশ
তবে শর্ত থাকে যে, উপরোক্ত দফা (ক) ও দফা (খ) এ শেয়ার ধারণের পরিমাণ আদায়কৃত মূলধনের দশ শতাংশের বেশি হইতে পারিবে না।
আরো শর্ত থাকে যে, এই আইন কার্যকর হইবার তিন বছরের মধ্যে প্রত্যেক ব্যাংক-কোম্পানি এমনভাবে উহার পুঁজিবাজার বিনিয়োগ কোষ পুনর্গঠন করিবে যাহাতে ধারণকৃত সকল প্রকার শেয়ার, কর্পোরেট বন্ড, ডিবেঞ্চার, মিউচুয়াল ফান্ড ও অন্যান্য পুঁজিবাজার নিদর্শনপত্রের মোট বাজারমূল্য এবং পুঁজিবাজার কার্যক্রমে প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে নিয়োজিত নিজস্ব সাবসিডিয়ারি কোম্পানি বা কোম্পানিসমূহ বা অন্য কোন কোম্পানি বা কোম্পানিসমূহে প্রদত্ত ঋণ সুবিধা এবং পুঁজিবাজারে বিনিয়োগের উদ্দেশ্যে গঠিত কোন প্রকার তহবিলে প্রদত্ত চাঁদার পরিমাণ সমষ্টিগতভাবে উহার আদায়কৃত মূলধন, শেয়ার প্রিমিয়াম, সংবিধিবদ্ধ সঞ্চিতি ও রিটেইন্ড আর্নিংস এর মোট পরিমাণের ২৫(পঁচিশ) শতাংশের অধিক না হয়।
এ বিধান লংঘন করলে বিশ লক্ষ টাকা পর্যন্ত জরিমানা করতে পারে বাংলাদেশ ব্যাংক। একাধিকবার নিয়ম লংঘনে প্রত্যেক দিনের জন্য অতিরিক্ত পঞ্চাশ হাজার টাকা পর্যন্ত জরিমানা করার সুযোগ রয়েছে।
একাত্তর/এআর
