জাপান-বাংলাদেশ অর্থনৈতিক অংশীদারিত্ব চুক্তি ইপিএ বাংলাদেশের পণ্য রপ্তানিতে সম্ভাব্য বাধা দূর করে দেশের বাণিজ্য খাতকে এগিয়ে নিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে বলে জানিয়েছেন বাণিজ্য উপদেষ্টা শেখ বশিরউদ্দীন।
সোমবার (৯ ফেব্রুয়ারি) বিকেলে সচিবালয়ে জাপান-বাংলাদেশ অর্থনৈতিক অংশীদারিত্ব চুক্তি সই নিয়ে আয়োজিত সাংবাদিক সম্মেলনে তিনি এসব কথা বলেন।
এসময় উপদেষ্টা বলেন, এতে বাংলাদেশের উৎপাদনশীল ও সেবা খাতে বিপুল সংখ্যক বাংলাদেশি কর্মী পাঠানোর নতুন সুযোগ তৈরি হয়েছে। বাংলাদেশের কর্মসংস্থান ও দক্ষতা উন্নয়নে ইতিবাচক প্রভাব পড়বে বলে জানান তিনি। এই চুক্তির ফলে এক হাজার ৩৯টি পণ্যের শুল্কমুক্ত প্রবেশাধিকার পাবে জাপান। বাংলাদেশ পাবে সাত হাজার ৩৭৯টি পণ্যের শুল্কমুক্ত প্রবেশাধিকার।
বাণিজ্য উপদেষ্টা বলেন, এলডিসির গ্রাজুয়েশনের কারণে নভেম্বরে থেকে যে সীমাবদ্ধতা তৈরি হতে যাচ্ছিলো তা কাটিয়ে ওঠা সম্ভব হবে।
এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, চট্টগ্রাম বন্দরে স্থবিরতার কারণে পণ্য খালাসে যে জটিলতা তৈরি হয়েছে, তার কিছু প্রভাব রমজানে থাকবে।
গত শুক্রবার জাপানের টোকিওতে বাংলাদেশ ও জাপানের মধ্যে এই ঐতিহাসিক চুক্তিটি সই হয়। এক হাজার ২৭২ পৃষ্ঠার এই চুক্তিতে মোট ২২টি অধ্যায় রয়েছে, যা দুই দেশের পণ্য ও সেবা বাণিজ্য, বিনিয়োগ এবং কৌশলগত অংশীদারত্বকে শক্তিশালী করবে।
অধ্যায়গুলো হলো-
- পণ্যের বাণিজ্য: শুল্ক কমানো ও বাজার প্রবেশাধিকার,
- উৎপত্তি বিধি: পণ্যের উৎস নির্ধারণের নিয়ম,
- শুল্ক প্রক্রিয়া ও বাণিজ্য সহজীকরণ: দ্রুত ও স্বচ্ছ শুল্ক ব্যবস্থা,
- স্যানিটারি ও ফাইটোস্যানিটারি ব্যবস্থা: খাদ্য নিরাপত্তা ও স্বাস্থ্যবিধি,
- কারিগরি বিধিমালা ও মান নিয়ন্ত্রণ: পণ্যের গুণগত মান নিশ্চিতকরণ,
- সেবার বাণিজ্য: সেবা খাতের লেনদেন ও সুযোগ,
- স্বাভাবিক ব্যক্তির চলাচল: পেশাজীবী ও ব্যবসায়ীদের যাতায়াত,
- বিনিয়োগ: বিনিয়োগ সুরক্ষা ও সুবিধা,
- ইলেকট্রনিক বাণিজ্য: ডিজিটাল ট্রেড ও অনলাইন নিরাপত্তা,
- সরকারি ক্রয়: সরকারি টেন্ডারে উভয় দেশের অংশগ্রহণ,
- মেধাস্বত্ব: কপিরাইট, পেটেন্ট ও ট্রেডমার্ক সুরক্ষা,
- প্রতিযোগিতা নীতি: বাজারে ন্যায্য প্রতিযোগিতা নিশ্চিত করা,
- ভর্তুকি: স্বচ্ছ ও সীমিত ভর্তুকি ব্যবস্থা,
- রাষ্ট্রীয় মালিকানাধীন প্রতিষ্ঠান: সরকারি প্রতিষ্ঠানের ব্যবসায়িক নিয়ম,
- ব্যবসা পরিবেশের উন্নয়ন: ব্যবসায়িক বাধা দূরীকরণ,
- শ্রম: শ্রমিক অধিকার ও কর্মপরিবেশ,
- পরিবেশ: টেকসই উন্নয়ন ও পরিবেশ রক্ষা,
- স্বচ্ছতা: নীতি ও তথ্যের সহজলভ্যতা,
- সহযোগিতা: দ্বিপক্ষীয় অর্থনৈতিক সহায়তা,
- বিরোধ নিষ্পত্তি: বিবাদ মিমাংসার আইনি কাঠামো,
- চূড়ান্ত বিধান: চুক্তির কার্যকারিতা ও মেয়াদ,
- ব্যতিক্রমসমূহ: বিশেষ পরিস্থিতিতে সুরক্ষা ব্যবস্থা।
প্রধান সুবিধাগুলো হলো-
শুল্কমুক্ত সুবিধা: বাংলাদেশের সাত ৩৭৯টি পণ্য জাপানের বাজারে শতভাগ শুল্কমুক্ত সুবিধা পাবে। এর বিপরীতে জাপান বাংলাদেশের বাজারে এক হাজার ৩৯টি পণ্যে অগ্রাধিকারমূলক সুবিধা পাবে।
বিনিয়োগ বৃদ্ধি: চুক্তির ফলে বাংলাদেশে জাপানি বিনিয়োগ বৃদ্ধি পাবে এবং একটি স্বচ্ছ ও সুরক্ষিত বিনিয়োগ পরিবেশ নিশ্চিত হবে।
রপ্তানি সক্ষমতা: বাংলাদেশের পণ্য বিশেষ করে তৈরি পোশাক, আইটি এবং সেবা খাতের জন্য জাপানের বিশাল বাজার উন্মুক্ত হবে। এছাড়া দক্ষ জনশক্তি চলাচলের সুযোগ তৈরি হবে।
প্রযুক্তি ও মানোন্নয়ন: জাপানি মানদণ্ড অনুযায়ী পণ্য উৎপাদনের ফলে বাংলাদেশের উৎপাদনশীলতা ও পণ্যের গুণগত মান বাড়বে।
চুক্তির গুরুত্বপূর্ণ দিক
ডিজিটাল অর্থনীতি: ই-কমার্স, অনলাইন লেনদেন এবং ব্যক্তিগত তথ্যের সুরক্ষাকে স্বীকৃতি দেওয়া হয়েছে।
মেধাস্বত্ব ও শ্রম অধিকার: কপিরাইট, পেটেন্ট এবং ট্রেডমার্ক রক্ষার পাশাপাশি শ্রমিকদের ন্যায্য মজুরি ও নিরাপদ কর্মপরিবেশ নিশ্চিত করার শর্ত রয়েছে।
সরকারি ক্রয়: জাপানের সরকারি কেনাকাটায় বাংলাদেশের যোগ্যতাসম্পন্ন কোম্পানিগুলোর অংশগ্রহণের সুযোগ তৈরি হয়েছে।
চ্যালেঞ্জ ও ঝুঁকি
রাজস্ব ক্ষতি: জাপানি পণ্যে শুল্ক কমানোর ফলে বাংলাদেশের আমদানি শুল্ক বাবদ রাজস্ব আয় কমতে পারে।
স্থানীয় শিল্পে প্রতিযোগিতা: সস্তা জাপানি পণ্যের চাপে দেশীয় কিছু 'ইনফ্যান্ট ইন্ডাস্ট্রি' বা বিকাশমান শিল্প চ্যালেঞ্জের মুখে পড়তে পারে।
কঠোর মানদণ্ড: কৃষি ও খাদ্যপণ্যের ক্ষেত্রে জাপানের কঠোর স্বাস্থ্য ও নিরাপত্তা বিধি মেনে চলা বাংলাদেশের জন্য ব্যয়বহুল ও জটিল হতে পারে।
মেধাস্বত্ব আইন: নির্দিষ্ট সময়ের পর মেধাস্বত্ব আইনের কঠোর বাস্তবায়ন বাংলাদেশের কিছু খাতের জন্য নীতিগত চাপ তৈরি করতে পারে।
